হস্তমৈথুনের পর ফরজ গোসল না করে ১০-১৫ বছর নামাজ ও রোজা কাযা করা হয়েছে, এখন করণীয় কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমি একজন বোনের পক্ষ থেকে এই প্রশ্নটি করছি, এটি আমার ব্যক্তিগত ঘটনা নয়।
তিনি বিগত বহু বছর অর্থাৎ ১০/১৫ বছর জানতেন না যে হস্তমৈথুনের ফলে অর্গাজম/বীর্যপাত হলে ফরজ গোসল করা আবশ্যক।
এ কারণে তিনি ফরজ গোসল না করেই নিয়মিত নামাজ ও রোজা পালন করেছেন। বিষয়টি তিনি একেবারেই জানতেন না।
বর্তমানে তিনি বিষয়টি জেনেছেন, আন্তরিকভাবে তওবা করেছেন এবং ভবিষ্যতে এ বিধান মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কিন্তু তিনি মনে করতে পারছেন না তিনি কবে বালেগ হয়েছেন, কতবার এমন ঘটনা ঘটেছে বা কত নামাজ এভাবে পড়েছেন।
জানতে চাই:
১. তার পূর্বের নামাজগুলোর হুকুম কী?
২. এত নামাজের হিসাব জানা না থাকলে কী করণীয়?
৩. তার পূর্বের রোজাগুলো কি সহিহ হয়েছে?
৪. কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে তার করণীয় কী?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
প্রশ্নের শিরোনাম: ফরজ গোসল ও পূর্বের নামাজ সম্বন্ধে প্রশ্ন
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি একজন বোনের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, যিনি দীর্ঘ ১০-১৫ বছর জানতেন না যে হস্তমৈথুনের ফলে বীর্যপাত হলে ফরজ গোসল করা আবশ্যক। এই অজ্ঞতাবশত তিনি ফরজ গোসল না করেই নামাজ ও রোজা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিষয়টি জেনেছেন, তাওবা করেছেন এবং ভবিষ্যতে সঠিক আমল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু তিনি স্মরণ করতে পারছেন না কবে বালেগ হয়েছেন, কতবার এমন ঘটনা ঘটেছে বা কত নামাজ এভাবে পড়েছেন। নিম্নে তার করণীয় সম্পর্কে হানাফি ফিকহ এর আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. পূর্বের নামাজগুলোর হুকুম কী?
হানাফি মাজহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য পবিত্রতা (তাহারত) অন্যতম শর্ত। কেউ যদি জানাবাত (ফরজ গোসল ওয়াজিব হওয়া) অবস্থায় নামাজ আদায় করে, তবে সেই নামাজ আদৌ শুদ্ধ হয় না (বাতিল গণ্য হবে)। কারণ নামাজের জন্য বড় নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জন করা ফরজ। (আল-হিদায়া, কিতাবুল তাহারাত; রদ্দুল মুহতার, ১/৩০২)
এক্ষেত্রে বোনটি অজ্ঞতার কারণে ভুল করেছেন, তাই তিনি গুনাহগার হবেন না, কিন্তু তার পড়া নামাজগুলো আদায় হয়নি। তাই সেগুলোর ক্বাযা (পুনরায় আদায়) করা ফরজ। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৮৫; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৫৪)
২. নামাজের সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলে কী করণীয়?
যেহেতু তিনি স্মরণ করতে পারছেন না কবে বালেগ হয়েছেন, কতবার জানাবাত হয়েছে এবং কতগুলো নামাজ পড়েছেন, তাই তাকে আনুমানিক হিসাব করে ক্বাযা পড়তে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি:
- তিনি যখন বালেগ হয়েছেন (মেয়েদের বালেগ হওয়ার সাধারণ বয়স ৯ থেকে ১৫ বছর) তা ধরে নিবেন। যদি নিশ্চিত না হন, তবে যতোটুকু সম্ভব নিকটতম বয়স অনুমান করবেন।
- তিনি যতবার জানাবাত হয়েছে মনে করতে পারেন, ততবার গোসল ছাড়া পড়া নামাজের সংখ্যা বের করবেন। কিন্তু স্মৃতি না থাকলে সর্বনিম্ন সম্ভাব্য সংখ্যা ধরার চেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।
- হানাফি ফিকহের নীতি: “اليقين لا يزول بالشك” (সন্দেহ দ্বারা নিশ্চিত জ্ঞান দূর হয় না)। তাই তিনি নিশ্চিত যে কিছু নামাজ নষ্ট হয়েছে, কিন্তু সংখ্যা জানেন না। এমতাবস্থায় তিনি যতোটুকু নামাজ নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত বা প্রবল ধারণা করেন, ততোটুকুর ক্বাযা পড়বেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২৫; শামী, ২/৯৭)
ব্যবহারিক সমাধান: তিনি প্রতিদিনের ফরজ নামাজের পাশাপাশি কিছু ক্বাযা নামাজ পড়তে পারেন। যেমন: প্রতিদিন ২ রাকাত করে ক্বাযা পড়তে থাকুন, যতক্ষণ না মনে হয় সব ক্বাযা আদায় হয়ে গেছে। অথবা এক মাসে সব ওয়াক্তের ক্বাযা পড়ে ফেলার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা নেক নিয়তের কারণে সহজ করে দেবেন। (বেহেশতি জেওর, ২/৩২)
৩. পূর্বের রোজাগুলো কি সহিহ হয়েছে?
হ্যাঁ, তার রোজাগুলো সহিহ হয়েছে। কারণ রোজা বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শুধু সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত করা এবং দিনের বেলায় পানাহার ও রোজা ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। জানাবাত অবস্থায় দিন কাটালেও রোজা শুদ্ধ হয়, যদিও গোসল করে নেওয়া উত্তম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯২৬; রদ্দুল মুহতার, ২/৪০৩)
সুতরাং তার অতীতের রোজাগুলোর ক্বাযা করতে হবে না।
৪. কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে তার করণীয় কী?
- আন্তরিক তাওবা: তিনি ইতিমধ্যে তাওবা করেছেন, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করবেন, ইনশাআল্লাহ। তাওবার শর্ত হলো: কাজটি ছেড়ে দেওয়া, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প। (সূরা আত-তাহরিম: ৮)
- ক্বাযা নামাজের ব্যবস্থা করা: উপরে বর্ণিত পদ্ধতিতে যতদূর সম্ভব ক্বাযা নামাজ আদায় করতে থাকুন।
- অতিরিক্ত নফল নামাজ: নফল নামাজও ক্বাযার নেকির পরিমাণ বাড়াবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৫)
- গুনাহ থেকে বিরত থাকা: হস্তমৈথুন (ইস্তিমনা) হারাম কাজ – তা ছেড়ে দেওয়া এবং বিয়ে বা রোজা ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেকে সংযত রাখা কর্তব্য। (সূরা আল-মুমিনুন: ৫-৭)
- ভবিষ্যতে সতর্কতা: এখন থেকে জানাবাতের পর গোসল করা বা ওজু করে তায়াম্মুম (যদি অসুস্থতার কারণে পানি ব্যবহার ক্ষতিকর হয়) করে নামাজ পড়ার অভ্যাস করবেন।
উল্লেখযোগ্য দলিল ও রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (কিতাবুত তাহারাত)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ১/৩০২, ২/৪০৩
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি) – ১/১২৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি) – ১/২৮৫
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী) – ১/৫৪
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – ২/৩২
- সহিহ বুখারি ও মুসলিম (হাদিস: ১৯২৬, ১১৫)
والله أعلم بالصواب