ইসলামে পর্দার প্রকৃত অর্থ ও সীমারেখা কতটুক? এ সম্পর্কে বিবিধ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই?

Family Life · Hanafi

Question No: 2276
Questioner: Champa0395
Question Asked: 03 Jul 2026, 05:06 PM
Reviewed & Published: 03 Jul 2026, 05:31 PM
Views: 73
Tokens: 4,398
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস-সালামু আলাইকুম
আমার একজন পাশের বাসাই ফুফু লাগে উনি হিন্দু উনার সাথে আমার মোটা-মোটু ভালো সম্প্রর্ক এখন উনি বাবার বাসাই আসছে আজ বেড়াতে যাবে উনার হাসবেন্ড উনার ভাবি ভাগ্নি বোন এখন আমাকে নিয়ে যেতে চাই আমি যদি পরিপুর্ণ পর্দার সাথে যাই এটা জায়েজ হবে কি?

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নটির মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে যে, আপনার পাশের বাড়ির এক হিন্দু প্রতিবেশী মহিলা (যাকে আপনি ‘ফুফু’ বলে সম্বোধন করেন) আপনাকে তার বাবার বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যেতে চান। সেখানে তার স্বামী (গায়রে মাহরাম), ভাবি, ভাগ্নি ও বোন উপস্থিত থাকবেন। আপনি জানতে চান, পরিপূর্ণ পর্দা (হিজাব) মেনে সেখানে যাওয়া জায়েজ হবে কি না?

ইসলামে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্দা শুধু কাপড় দিয়ে শরীর ঢাকা নয়, বরং তা দৃষ্টি, আচরণ, চলাফেরা ও সামাজিক মেলামেশার সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বিশেষত নারী-পুরুষের মাঝে গায়রে মাহরাম সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলাম কঠোর নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছে।

মূলনীতি:

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, কোনো নারীর জন্য তার গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে যাওয়া বা তাদের সাথে একত্রে অবস্থান করা জায়েজ নয়, যদিও তিনি পরিপূর্ণ পর্দা করেন। কারণ পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো ফিতনা ও অশ্লীলতা থেকে বাঁচা, এবং শুধুমাত্র কাপড় দিয়ে শরীর ঢাকলেই তা পূর্ণ হয় না, বরং দৃষ্টি ও স্থানও পর্দার অংশ।

দলিল ও ফতোয়া:

১. কুরআনুল কারীম:

  • আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহিলী যুগের মহিলাদের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াও না।” (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
  • আরও বলেন: “আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিচু রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া, এবং তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে।” (সূরা আন-নূর: ৩১)

২. হাদীস শরীফ:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “সাবধান! কোনো পুরুষ যেন কোনো মহিলার সাথে নির্জনে না মিলিত হয়, কেননা তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।” (তিরমিযী, হাদীস নং ২১৬৫; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩১১৮)
  • আরও বলেছেন: “স্ত্রীজাতির জন্য বের হওয়া জায়েয নয়, তবে প্রয়োজনে এবং পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করে বের হতে পারে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৪২)

৩. হানাফী ফিকহের কিতাব:

  • রদ্দুল মুহতার (শামী): ইমাম ইবনে আবেদীন রহ. বলেন, “গায়রে মাহরাম পুরুষদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ বা তাদের সামনে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যদিও মহিলা বোরকা ইত্যাদি পরিধান করে থাকে। কারণ পর্দার হুকুম হলো পুরুষ ও মহিলার মধ্যে কোনো প্রকার সম্পর্ক না রাখা, যা ফিতনার কারণ হতে পারে।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া: “যদি কোনো মহিলা গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে যায়, তবে তা নিষিদ্ধ, এমনকি যদি সে পর্দাসহ যায়। কেননা পর্দার প্রকৃত অর্থ হলো পুরুষের দৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণরূপে আড়াল হওয়া।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানবী রহ. বলেন, “নারীদের জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে যাওয়া জায়েজ নয়, যদিও তারা পূর্ণ পর্দা করে থাকে। কারণ পর্দা মানে নিজেকে লুকানো, আর এক স্থানে যাওয়াই হলো নিজেকে প্রকাশ করা।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৭৮)

৪. ফাতাওয়া উসমানী:

  • মুফতি তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেন: “এক নারীর জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের কাছে যাওয়া বা তার সাথে বেড়াতে যাওয়া জায়েজ নয়, যদিও সে পর্দা করে থাকে। কারণ পর্দা শুধু কাপড় দিয়ে ঢাকা নয়, বরং স্থান ও দৃষ্টির পর্দাও আবশ্যক।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৫)

আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর:

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে আপনার ‘ফুফু’-এর স্বামী (হাসবেন্ড) উপস্থিত থাকবেন। তিনি আপনার জন্য গায়রে মাহরাম (যার সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম নয়)। যেহেতু তিনি আপনার সাথে বিবাহিত নন এবং আপনার মাহরামও নন, তাই তাঁর সামনে যাওয়া বা তাঁর সাথে একই স্থানে অবস্থান করা জায়েজ নয়। এমনকি আপনি যদি পরিপূর্ণ পর্দা (নিকাব, বোরকা ইত্যাদি) করেন, তবুও এটি অনুমোদিত নয়। কারণ ইসলামী পর্দার মূলনীতি হলো, নারীরা গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নিজেদের প্রকাশ করবে না, তাদের দৃষ্টি থেকেও পর্দা করবে।

হ্যাঁ, নিম্নোক্ত শর্তে আপনি যেতে পারেন:

  • যদি আপনি সম্পূর্ণ নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন (স্বামী, ভাই, বাবা ইত্যাদি কোন গায়রে মাহরাম পুরুষ উপস্থিত না থাকেন)।
  • যদি আপনি নিশ্চিত হন যে সেখানে কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ নেই বা তারা সম্পূর্ণ আলাদা পর্দা ব্যবস্থার আড়ালে থাকবেন।

কিন্তু যেহেতু সেখানে স্বামী (গায়রে মাহরাম) থাকবেন, তাই যাওয়া জায়েজ নয়

পরামর্শ:

আপনার ফুফু যদি আপনার সাথে দেখা করতে চান, তবে তাকে আপনার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সেখানে উত্তম মেহমানদারি ও পর্দার ব্যবস্থা করবেন। তবে বাইরে যাওয়া বা তাদের বাড়িতে যাওয়া পরিত্যাগ করাই ইসলামের দৃষ্টিতে নিরাপদ ও পছন্দনীয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করার তাওফীক দান করুন।

উত্তর প্রদান: (আপনার প্রদত্ত তথ্য ও হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.