আখেরাতে জালিমের উপর গোনাহের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার নিয়তে মজলুমের গোনাহ করা কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
একজনের উপর এত জুলুম হয়েছে যে মানসিক ভারসাম্য প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। মজলুম সেই জুলুমের ক্ষতস্বরূপ PTSD বয়ে বেড়াচ্ছেন। যিনি মজলুম তিনি জানেন যে আখিরাতের দিন জালিমের সব সওয়াব মজলুমকে দেওয়া হবে। সওয়াব শেষ হয়ে গেলে মজলুমের গুনাহ জালিমের ঘাড়ে চাপানো হবে। এখন যিনি মজলুম তিনি যদি ইচ্ছাকৃত খারাপ কাজ করেন(যাতে অন্যের হক নষ্ট না হয়) এই ভেবে যে এতে তো মজলুমের উপর কোন প্রভাব পড়বে না বরং জালিমকেই এই গুনাহর বোঝা বহন করতে হবে আর মজলুম ঐ জালিমের নেকীগুলো সব পেয়ে যাবে। এটা কি জায়েজ হবে?
Answer
উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—যে ব্যক্তি মারাত্মক জুলুমের শিকার হয়েছে, সে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করে (অন্যের হক নষ্ট না করে) এই চিন্তায় যে, আখিরাতে তার এই গুনাহ জালিমের ওপর চাপানো হবে এবং জালিমের নেকী সে পেয়ে যাবে, তাহলে এটা কি জায়েজ?
উত্তর: না, এটি জায়েজ নয়; বরং এটি নিজেই একটি মারাত্মক গুনাহ।
কারণ ও ব্যাখ্যা
১. কিয়ামতে সওয়াব-গুনাহের স্থানান্তর একটি বাস্তবতা, কিন্তু তা ইচ্ছাকৃত গুনাহের অনুমতি দেয় না।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ» “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়, আগে যেদিন কোন দীনার-দিরহাম থাকবে না। যদি তার নেক আমল থাকে, তাহলে তার থেকে জুলুমের পরিমাণ অনুযায়ী নেকী নিয়ে মজলুমকে দেওয়া হবে। আর যদি তার নেকী না থাকে, তাহলে মজলুমের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১)
এই হাদিস সত্য। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, মজলুম ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করতে পারে এবং ভাবে যে জালিমই তার বোঝা বহন করবে। কারণ:
২. ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করলে তা মজলুমের নিজের আমলনামায় লেখা হয় এবং সে তার জন্য জিজ্ঞাসিত হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ “আর কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।” (সূরা আল-আন‘আম ৬:১৬৪; সূরা ফাতির ৩৫:১৮)
আয়াতটি দুনিয়ার বিচার ও পার্থিব কর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর আখিরাতে জুলুমের প্রতিশোধ হিসেবে স্থানান্তর আল্লাহর বিশেষ বিধান। তবে মজলুম যদি ইচ্ছাকৃত গুনাহ করে, তাহলে সে দুনিয়াতেই গুনাহগার। তার এই গুনাহ কেবল এই কারণে ক্ষমা হবে না যে সে ভাবে এটি জালিমের ওপর চাপানো হবে। বরং তার ইচ্ছা ও কর্মের ভিত্তিতে সে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।
৩. এই চিন্তা গুনাহকে হালাল করার শয়তানি কৌশল।
ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেন যে, গুনাহকে বৈধ মনে করে করা কোনো গুনাহ কুফরি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যদিও তা শুধু মনে না করে অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া কাবিরা গুনাহ। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪০৪, কিতাবুল হুদুদ)
এখানে মজলুম মনে করছে যে, তার গুনাহের বোঝা জালিমের ওপর পড়বে—এটি একটি ভুল ও বিভ্রান্তিকর চিন্তা। কেননা হাদিসে বলা হয়েছে, নেকী শেষ হয়ে গেলে মজলুমের গুনাহ জালিমের ওপর চাপানো হবে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে মজলুম ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ বাড়িয়ে দেবে। বরং মজলুমের দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর নিকট প্রতিশোধ চাওয়া।
৪. এই কাজ ধৈর্যের বিপরীত এবং জালিমের মতো আচরণে পরিণত হতে পারে।
মজলুম যদি মনে করে যে “আমি গুনাহ করলেও জালিমের ঘাড়ে পড়বে”, তাহলে সে নিজেও জালিমের মতোই গুনাহ করছে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এর জন্য শাস্তি পাবে। আর তাকে যদি জালিমের নেকী দেওয়া হয়, তা তো তার পূর্বের জুলুমের ক্ষতিপূরণ; এটি ইচ্ছাকৃত গুনাহের অনুমতি নয়।
৫. ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হারাম।
হানাফি ফুকাহারা বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি জানে যে তার ওপর জুলুম করা হয়েছে, তার প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার আছে (কিসাস বা আইনি পথে)। কিন্তু সে নিজে গুনাহ করে (যেমন মিথ্যা বলা, গিবত করা, হারাম কাজ করা) আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করতে পারে না। (ফতোয়া আলমগীরী, ৫/৩৬১; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৮৩-৮৫)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ‘জাওহারুল ফিকাহ’-এ বলেন: “জুলুমের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজে জুলুম করা বা গুনাহ করা জায়েজ নয়, বরং সওয়াব ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রতিফল কামনা করাই উত্তম।” (জাওহারুল ফিকাহ, ২/৪০০)
৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসের দিকনির্দেশনা
রাসূল (সা.) বলেছেন:
«اتَّقِ اللَّهَ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ» “যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো, আর গুনাহের পর নেক আমল করো যা তাকে মুছে দেবে, আর মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করো।” (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৭; সহিহ)
মজলুমের উচিত গুনাহ না করে বরং অধিক নেক আমল করা, যাতে জালিমের নেকী কমে এবং তার নিজের নেকী বাড়ে। তাহলে আখিরাতে তার জন্য উত্তম প্রতিদান হবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
মজলুমের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করা জায়েজ নয়, যদিও সে এ চিন্তা করে যে গুনাহ জালিমের ওপর চাপানো হবে। এটি আল্লাহর দ্বীনে প্রতারণা করার শামিল। মজলুমের কর্তব্য হলো:
- ধৈর্য ধরা,
- আল্লাহর কাছে ন্যায় বিচার চাওয়া,
- সম্ভব হলে আইনি প্রতিকার নেওয়া,
- জালিমের জন্য দোয়া করা (সঠিক পথের জন্য) অথবা তার ক্ষমা চাওয়া,
- নিজের নেক আমল বৃদ্ধি করা, যাতে জালিমের নেকী কমে।
আশা করি উত্তরটি স্পষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মজলুমকে ধৈর্য দান করুন এবং জালিমদের জবাব দিন। আমিন।
সূত্র ও তথ্যসূত্র:
- সহিহ বুখারি: ২৪৪৯; সহিহ মুসলিম: ২৫৮১
- সূরা আল-আন‘আম: ১৬৪; সূরা ফাতির: ১৮
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন): ৬/৪০৪
- ফতোয়া আলমগীরী: ৫/৩৬১
- ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/৮৩-৮৫
- জাওহারুল ফিকাহ (মুফতি মুহাম্মদ শফি): ২/৪০০
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): গুনাহের পরিচ্ছেদ
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): সূরা ফাতিরের তাফসির