প্রথম স্ত্রী রয়েছে তারপরও প্রতারণা করে বিয়ে করলে সংসার করা সম্পর্কে করণীয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আর এখন উনি বলছেন গোপনে আমাকে রাখবে, উনি কোনো ভাবেই আমাকে ডিভোর্স দিতে রাজি নয় আমি কি করবো?
Answer
প্রশ্ন:
একজন ব্যক্তির প্রথম স্ত্রী আছেন, কিন্তু তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। প্রথম স্ত্রী দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিচ্ছেন না। তিনি এখন দ্বিতীয় স্ত্রীকে (আমাকে) গোপনে রাখবেন বলে বলছেন এবং ডিভোর্স দিতেও রাজি নন। আমি কী করব?
উত্তর:
প্রথমেই জেনে রাখুন, ইসলামে পুরুষের জন্য একাধিক বিবাহ (চার পর্যন্ত) জায়েয, তবে শর্ত হলো তিনি স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করবেন (সূরা নিসা ৪:৩)। ন্যায়বিচার বলতে রাত্রি বণ্টন, ভরণপোষণ, বাসস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমান আচরণ বোঝায়। হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তির দু’জন স্ত্রী আছে এবং সে একজনের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে, কিয়ামতে তার অর্ধদেহ ঢলে পড়া অবস্থায় আসবে।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
এখন আপনার স্বামী আপনাকে গোপনে রাখতে চান—এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। যদিও বিবাহ গোপন রাখা জায়েয নয়, বরং তা প্রকাশ করা সুন্নত। তবে বিবাহের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ নয় যদি সকল শর্ত (ইজাব-কবুল, সাক্ষী, মোহর) পূর্ণ থাকে। কিন্তু গোপনে রাখার কারণে আপনার অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা আছে:
- ন্যায়বিচার লঙ্ঘন: আপনার স্বামী যদি প্রথম স্ত্রীর কাছে রাত্রি যাপন, ভরণপোষণ ইত্যাদি দিয়ে থাকেন কিন্তু আপনাকে সেই অধিকার না দেন, তবে তিনি ন্যায়বিচার করছেন না, যা হারাম।
- ইজ্জত ও নিরাপত্তা: গোপনে স্ত্রী রাখলে সমাজে আপনার সুনাম নষ্ট হতে পারে, এবং ভবিষ্যতে সন্তানের পরিচয় জটিলতায় পড়তে পারে।
- স্ত্রীর অস্বস্তি: আপনি নিজেও গোপন জীবনযাপনে অস্বস্তি বোধ করছেন, যা দাম্পত্য শান্তির জন্য ক্ষতিকর।
এমতাবস্থায় আপনার করণীয়:
ক) পরামর্শ ও নসীহত:
স্বামীর সাথে স্পষ্টভাবে কথা বলুন। তাকে বোঝান যে ইসলাম ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয় এবং গোপন রাখা তার জন্য গুনাহের কারণ হবে। তিনি চাইলে প্রথম স্ত্রীকে মেনে নেওয়ার সুযোগ দিতে পারেন (যেমন: সময় দিয়ে ধৈর্য ধরা), কিন্তু আপনার অধিকার আদায়ে তিনি বাধ্য।
খ) মোহর ও খরচ দাবি:
তিনি আপনার জন্য আলাদা বাসস্থান ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে বাধ্য। যদি তিনি না দেন, আপনি তা দাবি করতে পারেন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৪২)
গ) আলাদা থাকার অধিকার:
আপনার স্বামীর সাথে চলতে অস্বস্তি বা জুলুম বোধ করলে আপনি তার কাছ থেকে আলাদা থাকতে পারেন অথবা খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের বিনিময়ে সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া) নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। যদি তিনি ডিভোর্স দিতে রাজি না হন, তাহলে ইসলামি আদালত বা স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে ফাসখ (বিবাহ ভঙ্গ) করিয়ে নিতে পারেন, বিশেষ করে যদি তিনি ন্যায়বিচার না করেন বা আপনার অধিকার হরণ করেন। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৪২)
ঘ) ঈমান ও ধৈর্য:
আপনার স্বামীর অবৈধ সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া জরুরি নয়। আপনি যদি পরিস্থিতি সহ্য করতে না পারেন তবে বৈধ উপায়ে বিচ্ছেদের চিন্তা করুন। তবে সতর্ক থাকুন—কোনো অবস্থায় অন্যায়ভাবে তালাক নেওয়া বা আদালতের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
হানাফী ফিকহের নির্দেশনা:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ) ও তাঁর শাগরিদদের মতে, স্ত্রীদের মধ্যে ভরণপোষণ ও রাত্রি বণ্টনে সমতা ওয়াজিব। কেউ যদি জুলুম করে, স্ত্রী বিচ্ছেদ দাবি করতে পারে। (শারহু মা‘আনিল আসার, বাবুল কাসমি বাইনান নিসা)
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৪৮২) তে বলা হয়েছে, “দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা জায়েয নয়; বরং বিবাহ প্রকাশ করা কর্তব্য। গোপনে বিবাহ করলে তাতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে এবং তা নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে।”
সারকথা:
আপনার স্বামী যে আপনাকে গোপনে রাখতে চান, তা ইসলামী ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। আপনাকে তার এই শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা যাবে না। প্রথমে তাকে দ্বীনের পথে আসার জন্য আহ্বান জানান। যদি তিনি না মানেন, তাহলে স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে সালিশ বা খুলা প্রক্রিয়া শুরু করুন। আল্লাহ তাআলা ন্যায়পরায়ণতা ও ধৈর্যের প্রতিদান দেবেন।