কাফিরদের জন্য শাস্তির আয়াত দিয়ে মুসলমানকে দাওয়াত দেওয়া কি যাবে?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
যেমন সাকার নামক জাহান্নাম কাফিরদের জন্য, এখন আমি কি এউ আয়াত দিয়ে বেনামজিকে নামাজের জন্য সত্ররক করতে পারব?
সূরা আলাতে আছে, "তোমরা দুনিয়াকে প্রাধান্য দাও।এর তাফসিরে দেখলাম : ইসলামের দোষত্রুটি খোজা! এখন এই আয়াত দিয়ে দুনিয়া প্রিতিতে না জড়ানোর নসিহহা করা যাবে?
Answer
উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনের আয়াতগুলো সাধারণত দু’ধরনের হয়:
১. সরাসরি মুমিনদের উদ্দেশ্য করে বলা আয়াত।
২. কাফির-মুশরিক বা অমুসলিমদের উদ্দেশ্য করে বলা আয়াত।
কিন্তু কুরআনের শিক্ষা সার্বজনীন। কোনো আয়াত যদি কাফিরদের শাস্তির কথা বলে, তবে তার অন্তর্নিহিত উপদেশ মুসলমানদের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে, যদি তারা সেই গুনাহে লিপ্ত হয়। তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, যাতে কাউকে কাফির না বলা হয়।
১. কাফিরদের জন্য শাস্তির আয়াত দিয়ে মুসলমানদের দাওয়াত
কুরআনে যেমন ‘সাকার’ (সূরা মুদ্দাসসির, ২৬-২৭) জাহান্নামের নাম কাফিরদের জন্য উল্লেখিত হয়েছে, তেমনি আয়াত যেমন—
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا
“যারা আমার আয়াত অস্বীকার করে, অচিরেই আমি তাদের আগুনে নিক্ষেপ করব।” (সূরা নিসা, ৪:৫৬)
এই জাতীয় আয়াত সরাসরি কাফিরদের শাস্তি বুঝালেও, ইসলামী শরীআতের বিধান হলো—যে কোনো মুসলমান যদি কুফরী কাজ না করে, তবে তাকে কাফির বলা যাবে না। তবে সতর্কতা হিসেবে এ আয়াত ব্যবহার করা জায়েজ, যদি উদ্দেশ্য হয় তাকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনা।
ইমাম ইবনে আবেদিন শামী (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ বলেন:
“কোনো মুসলমানকে কাফিরদের মতো শাস্তির আয়াত পড়ে ভয় দেখানো জায়েজ, তবে শর্ত হলো—এতে তাকে কাফির সাব্যস্ত করা যাবে না। বরং বলা চাই, ‘এ কাজ করলে আল্লাহর শাস্তি আসতে পারে’।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২)
অতএব, ‘সাকার’ বা জাহান্নামের আয়াত দিয়ে বেনামাজিকে সতর্ক করা জায়েজ, বরং উত্তম। তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, তাকে কাফির বলা যাবে না। বরং বলবেন:
"হে ভাই! নামাজ না পড়লে তোমার ঈমান বিপদে পড়বে। মনে রেখো, কাফিরদের জন্য যে জাহান্নাম তৈরি, বেনামাজিও তার শিকার হতে পারে—যদি তাওবা না করো।"
২. সূরা আলা (উঠতি সূরা)-এর আয়াত দিয়ে দুনিয়াপ্রীতি থেকে বিরত রাখা
প্রশ্নে উল্লিখিত আয়াতটি সূরা আলা’র ১৬ নম্বর আয়াত:
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا
“বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দাও।”
এ আয়াতের তাফসিরে মুহাম্মদ শফী (রহ.) ‘মাআরিফুল কুরআনে’ লিখেছেন:
“এখানে ‘তোমরা’ বলে সমগ্র মানবজাতিকে বুঝানো হয়েছে, বিশেষ করে যারা দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর অগ্রাধিকার দেয়।”
(মাআরিফুল কুরআন, ৮/৬০১)
অতএব, এ আয়াত মুসলমানদের জন্যও প্রযোজ্য। সুতরাং দুনিয়াপ্রীতি ও পরকালভুলে যাওয়া থেকে মুসলমানদের সতর্ক করতে এই আয়াত ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ। এটি কোনো ত্রুটি খোঁজার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নসীহত ও উপদেশ।
৩. দাওয়াতের মূলনীতি
হানাফী ফিকহে দাওয়াতের ক্ষেত্রে কয়েকটি মূলনীতি আছে:
- হিকমত (জ্ঞান) ও সুন্দর উপদেশ অবলম্বন করতে হবে।
- ভয় দেখানোর পাশাপাশি আশা দেওয়া (তারগীব ও তারহীব) উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
- কাউকে কাফির বা ফাসিক বলে গালি দেওয়া নিষিদ্ধ।
- আয়াতের আসল অর্থ ও প্রয়োগ বুঝে বলা জরুরি।
মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) ‘ফাতাওয়া উসমানী’তে বলেন:
“যে আয়াত কাফিরদের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছে, তা কোনো মুসলমানকে তার বদঅভ্যাসের জন্য ভয় দেখাতে ব্যবহার করা জায়েজ। তবে তা বলতে হবে এভাবে: ‘আল্লাহ কাফিরদের এমন শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন, আর তুমিও যদি এ কাজ করো, তাহলে তোমার শাস্তি হবে’।”
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/১৫০)
সারসংক্ষেপ
- হ্যাঁ, কাফিরদের শাস্তির আয়াত (সাকার ইত্যাদি) দিয়ে বেনামাজি বা গুনাহগার মুসলমানকে দাওয়াত দেওয়া জায়েজ, যদি সঠিক পদ্ধতি ও শিষ্টাচার বজায় রাখা হয়।
- হ্যাঁ, সূরা আলা’র আয়াত “তোমরা দুনিয়াকে প্রাধান্য দাও” দিয়ে দুনিয়াপ্রীতি থেকে বিরত রাখতে নসীহত করা জায়েজ।
- তবে সতর্ক থাকতে হবে—যেন কাউকে কাফির বা মুশরিক বলা না হয়; বরং তাদেরকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনার সুন্দর উপায় বের করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।
রেফারেন্স (Reference):
- রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/১৫০
- মাআরিফুল কুরআন, ৮/৬০১
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০
- তাহতাবী আলাল মারাকি, ১/২৮৫