বারবার বায়ু নির্গত হলে কুরআন স্পর্শ করে কিভাবে তিলাওয়াত করবো?

Taharah Purity · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 2221
Questioner: oneway paradise
Question Asked: 02 Jul 2026, 02:40 PM
Reviewed & Published: 02 Jul 2026, 03:25 PM
Views: 140
Tokens: 5,182
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম মুহতারাম,আমি অযু বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারি না।আমার বারবার বায়ু চলে আসে।স্বলাত পড়া শেষে এর কিছুক্ষনের মধ্যেই আমার অযু ভেঙে যায়।আমি এই অবস্হায় কুরআন কীভাবে পড়তে পারি মুহতারাম।যার কারণে আমি বেশির ভাগ সময় এপস থেকে কুরআন পড়ি।কিন্তু কুরআন সরাসরি পড়তে চাই।এই অবস্হায় আমার করণীয় কি মুহতারাম? আমাকে কি বারবার অযু করতে হবে?

Answer

উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার সমস্যা হলো বারবার বায়ু নির্গত হওয়া (যা ওযু ভঙ্গের কারণ) এবং এর ফলে দীর্ঘ সময় ওযু ধরে রাখতে না পারা। আপনি কুরআন সরাসরি (মুসহাফ/কাগজের কুরআন) স্পর্শ করে পড়তে চান। নিচে আপনার করণীয় ও বিস্তারিত দলিল দেওয়া হলো।


১. আপনার অবস্থার ফিকহি বিধান

যে ব্যক্তি অবিরাম বা অধিকাংশ সময় বায়ু নির্গত হয়, তাকে ফিকহের পরিভাষায় মা’যূর (অর্থাৎ ক্রমাগত ওযুভঙ্গের কারণযুক্ত ব্যক্তি) বলা হয়। আপনার ক্ষেত্রে যদি প্রতি ওয়াক্তের নামাজের সময়ের মধ্যে বারবার বায়ু চলে আসে এবং কিছুক্ষণের জন্য হলেও বন্ধ না থাকে, তাহলে আপনি মা’যূর হিসেবে গণ্য হবেন।

দলিল :
রাসূলুল্লাহ ﷺ মুস্তাহাদা (ক্রমাগত রক্তস্রাব) নারীকে বলেছেন :

«توضيئي لكل صلاة»
“প্রত্যেক নামাজের জন্য ওযু কর।” (বুখারী, হাদিস : ২২৮; মুসলিম, হাদিস : ৩৩৪)

একইভাবে যাদের প্রস্রাব বা বায়ু ক্রমাগত নির্গত হয়, তাদের জন্যও একই হুকুম প্রযোজ্য। ইমাম আহমাদ, শাফেঈ ও হানাফী মাযহাবের অভিমত এবং সালাফী বিদ্বানগণ (শায়খ ইবন বায, শায়খ আলবানী, ইবন উসাইমীন) এই মত দিয়েছেন।

শায়খ ইবন উসাইমীন (রহঃ) বলেন :

“যে ব্যক্তির ওযু ক্রমাগত ভেঙে যায় (যেমন প্রস্রাবের বেগ ধরে রাখতে না পারা বা বায়ু চলে আসা), সে প্রত্যেক ফরজ নামাজের জন্য একবার ওযু করবে এবং ওই ওযু দ্বারা যতগুলো নফল নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত ইচ্ছা করতে পারবে, যতক্ষণ না সে ওই ফরজ নামাজের সময় অতিক্রম করে।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৪/২১৯)


২. কুরআন স্পর্শ ও তিলাওয়াতের বিধান

(ক) কুরআনের মুশাফ স্পর্শ করা

মুশাফ (কাগজের কুরআন) স্পর্শ করার জন্য ওযু থাকা জরুরি। আল্লাহ বলেন :

﴿لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ﴾ [الواقعة: 79]
“এটা পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া স্পর্শ করতে পারে না।” (সূরা ওয়াকিয়া : ৭৯)

হাদিসে এসেছে :

«لا يمس القرآن إلا طاهر»
“পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না।” (মালিক, মুওয়াত্তা; দারাকুতনী; সহীহ আল-বানী হাদিস : ১১৯৪)

তবে মা’যূর ব্যক্তি উপরে উল্লেখিত বিধানের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ আপনি প্রত্যেক ফরজ নামাজের ওয়াক্তের শুরুতে ওযু করবেন এবং সেই ওযু দ্বারা ওয়াক্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো সময় কুরআনের মুশাফ স্পর্শ করতে পারবেন—এমনকি মাঝে বায়ু নির্গত হলেও। শায়খ ইবন বায (রহঃ) বলেন :

“যার ওযু ক্রমাগত ভেঙে যায়, সে প্রত্যেক ওয়াক্তে একবার ওযু করবে এবং তারপর সারা ওয়াক্ত জুড়ে সে মুশাফ স্পর্শ করতে পারবে, কারণ শরিয়ত তার জন্য এটাই সহজ করেছে।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায ১০/১৬২)

(খ) মোবাইল বা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস থেকে কুরআন পড়া

মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটার ইত্যাদি থেকে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য ওযু শর্ত নয়, কারণ এসব ডিভাইসকে কুরআনের মুশাফ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ডিভাইসটি পবিত্র থাকা বাঞ্ছনীয়। অধিকাংশ বিদ্বান (শায়খ আলবানী, ইবন উসাইমীন, ফাওযান) এই মত পোষণ করেন। শায়খ ইবন উসাইমীন (রহঃ) বলেন :

“মোবাইল ফোনে থাকা কুরআন মুশাফের হুকুম রাখে না; তাই বিনা ওযুতে তা স্পর্শ করা জায়েজ। তবে সম্মানার্থে ওযু অবস্থায় স্পর্শ করা উত্তম।” (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দরব)


৩. আপনার করণীয় সংক্ষেপে

| কাজ | বিধান | মন্তব্য | |---------|-----------|-------------| | ফরজ নামাজের ওযু | প্রত্যেক ওয়াক্তের শুরুতে একবার ওযু করুন | মাঝে বায়ু চলে গেলেও ওই ওযু বৈধ থাকবে ওয়াক্ত শেষ পর্যন্ত | | কুরআন মুশাফ স্পর্শ | ওযু অবস্থায় স্পর্শ করুন; ওয়াক্ত শেষে নতুন ওযু ছাড়া পরবর্তী ওয়াক্তে স্পর্শ করবেন না | মা’যূর হিসেবে ওয়াক্ত ভিত্তিক ওযু যথেষ্ট | | মোবাইল/ট্যাব থেকে কুরআন | ওযু ছাড়াই পড়তে পারবেন | উত্তম হলো ওযু করে পড়া | | নামাজের পর বায়ু চলে গেলে | ওযু ভাঙবে না, কারণ আপনি মা’যূর | নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না |


৪. গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

  • সতর্কতা : যদি বায়ু নির্গত হওয়া এমন পর্যায়ে হয় যে, নামাজের কোনো রুকন আদায়ের সময়ও বায়ু চলে আসে, তাহলে আপনি মা’যূর গণ্য হবেন এবং নামাজ সহীহ হবে। কিন্তু যদি আপনি নিশ্চিত হন যে, অল্প সময়ের জন্য বায়ু বন্ধ থাকতে পারে (যেমন ওযু করার পর ২-৩ মিনিট কোনো বায়ু যায় না), তাহলে ওই সময়ের মধ্যে কুরআন স্পর্শ ও নামাজ আদায় করে নিন।
  • উপচিকিৎসা : দয়া করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। পেটের গ্যাস, IBS (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম) ইত্যাদি কারণ থাকতে পারে।
  • অভ্যাস : বারবার ওযু করতে কষ্ট হলে, প্রত্যেক ফরজ নামাজের জন্য একবার ওযু করে নিন এবং সেই ওযু দিয়েই কুরআন তিলাওয়াত করুন। অতিরিক্ত ওযু না করাই সুন্নত।

৫. উল্লেখযোগ্য সালাফী বিদ্বানদের বক্তব্য

  • শায়খ ইবন তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন :

    “যে ব্যক্তির ক্রমাগত ওযু ভেঙে যায়, সে প্রত্যেক ফরজ সালাতের জন্য ওযু করবে এবং তারপর যে কোনো সময় কুরআন স্পর্শ করতে পারবে।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২১/২২৪)

  • শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন :

    “মোবাইল ও ট্যাব থেকে কুরআন পড়ার জন্য ওযু জরুরি নয়। আর মুশাফ পড়ার জন্য মা’যূর ব্যক্তি প্রত্যেক ওয়াক্তে একবার ওযু করলে যথেষ্ট।” (সিলসিলাহ ফাতাওয়া, অডিও)

  • শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন :

    “যে ব্যক্তি বায়ু ধরে রাখতে পারে না, তার জন্য প্রত্যেক ওয়াক্তে একবার ওযু করাই যথেষ্ট। ওই ওযু দ্বারা সে কুরআন স্পর্শ করতে পারে এবং নামাজ পড়তে পারে।” (আল-মুন্তাকা ১/১১২)


উপসংহার

আপনি মা’যূর হিসেবে গণ্য হবেন। তাই:

  1. প্রত্যেক ফরজ নামাজের সময় শুরুতে একবার ওযু করুন।
  2. ওই ওযু দ্বারা আপনি যেকোনো সময় কুরআনের মুশাফ স্পর্শ ও তিলাওয়াত করতে পারেন।
  3. বায়ু চলে গেলেও ওযু ভাঙবে না, যতক্ষণ ওই ওয়াক্ত বিদ্যমান।
  4. মোবাইল থেকে কুরআন পড়তে ওযুর প্রয়োজন নেই।

আল্লাহ আপনার কষ্ট লাঘব করুন এবং আপনার ইবাদত কবুল করুন।

ওয়াল্লাহু তা‘আলা আ‘লাম।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.