হারাম সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা অবস্থায় বিয়ে করার উদ্দেশ্যে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করা কি সঠিক? এক্ষেত্রে ছেলে নিজের ক্ষতি করলে কি মেয়েটি দায়ী হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على خاتم النبيين محمد وآله أجمعين
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আপনি যে কাজটি করেছেন—তা পুরোপুরি শরিয়তসম্মত ও প্রশংসনীয়। অমুসলিম বা অমাহরাম ছেলের সঙ্গে বিয়ের আগে কোনো প্রকার যোগাযোগ (মোবাইল, ফেসবুক, সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ) হারাম। তাই আপনি ঠিকই করেছেন যে, তাঁর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন এবং বিষয়টি তাকে বুঝিয়ে বলেছেন। এটি আপনার ঈমান ও পরহেজগারির পরিচায়ক।
এখন আপনার উদ্বেগ: “ছেলেটি যদি আমার দূরত্বের কারণে নিজের ক্ষতি করে (যেমন আত্মহত্যা, মাদক সেবন ইত্যাদি), তাহলে কি আমি দায়ী হব? আমার ওপর কি আল্লাহর গজব আসবে?”
এর উত্তর এককথায়: না, আপনি দায়ী হবেন না এবং আপনার ওপর কোনো গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ আমলের জন্য দায়ী। কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
“আর কোনো বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না।”
(সূরা আল-আন‘আম ৬:১৬৪, সূরা ফাতির ৩৫:১৮)
এই আয়াতের ভিত্তিতে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও অন্যান্য ফকীহগণ স্পষ্ট বলেছেন——কেউ যদি তার স্বাধীন ইচ্ছায় কোনো পাপ করে, তবে সেই পাপের দায়িত্ব শুধু তার উপরেই বর্তায়, অন্য কারো উপর নয়। (আল-হিদায়া, কিতাবুল হুদুদ; রদ্দুল মুহতার ৬/৪০২)
এক্ষেত্রে আপনি তাকে পরোক্ষভাবে কিছু করতে বলেননি, বরং আপনি নিজের ইমানি দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যদি তার প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে হারাম কাজ করেন, তবে তা তার নিজের পছন্দ ও দায়িত্ব। এর জন্য আপনি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জবাবদিহি করবেন না।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
“নিয়ত অনুযায়ীই কাজের ফল হয়।” (বুখারী, মুসলিম)
আপনার নিয়ত ছিল হালাল পথে বিয়ে করা। তাই আপনি যদি বৈধ উপায়ে (অভিভাবকের মাধ্যমে) বিয়ের চেষ্টা করেন এবং ছেলেটি নিজেকে ধ্বংস করে, তাহলে আপনার ওপর কোনো অপরাধের বোঝা চাপানো হবে না।
পালিয়ে বিয়ে (কোর্ট ম্যারেজ) প্রসঙ্গে
আপনি যে কথা বলেছেন— “বাড়ির লোক না মানলে পালিয়ে যাব”— এটি শরিয়তসম্মত নয়। কেননা ইসলামী শরিয়তে মেয়ের বিয়ের জন্য অভিভাবকের (ওয়ালী) অনুমতি আবশ্যক। হানাফী মাযহাবে ওয়ালী ছাড়া বিয়ে সহীহ না-ও হতে পারে; যদিও কিছু শর্তে অন্য মতে সহীহ হয়, তবুও পালিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি কখনোই উচিত নয়। কারণ এতে পরিবার ও সমাজে অশান্তি ও ফিতনা সৃষ্টি হয়। আপনি নিজেও বিভিন্ন ক্লাস শুনে বুঝতে পেরেছেন যে এটা শরিয়তসম্মত নয়, তাই আপনার এই উপলব্ধি সঠিক।
আপনার কর্তব্য হলো— নিজের পরিবার ও ছেলের পরিবারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনা করা। ছেলেটি যদি দাঁড়ি-টুপি, সুন্নতী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয় এবং দ্বীনদার হয়, তবে আপনার পরিবারও হয়তো একদিন রাজি হবে। আপনি দু‘আ করতে থাকুন এবং তাহাজ্জুদে কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে বিয়ে সহজ করে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করুন।
ছেলের মাদক সেবন বা নেশা করলে আপনার গুনাহ হবে?
না, হবে না। কারণ তিনি নিজের ইচ্ছায় ওই কাজ করবেন। আপনি তো তাকে বলেননি— “তুমি নেশা কর” বরং আপনি বরং তাকে হারাম সম্পর্ক থেকে বিরত রেখেছেন। তাই যদি সে নেশায় আসক্ত হয়, তা তার নিজের পছন্দের ফল। আল্লাহ তাআলা ন্যায়পরায়ণ, তিনি কাউকে অন্যের অপরাধের বোঝা দেবেন না।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে রাখবেন— যদি আপনি কাউকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেন যে তাঁর জন্য পাপ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না, তাহলে আপনি দায়ী হতে পারেন। কিন্তু এখানে সেটি নয়। এখানে আপনার পক্ষ থেকে বিকল্প হালাল পথ (বিয়ের প্রস্তাব) দেওয়া হয়েছে এবং আপনি তাকে দূরবর্তী রেখে চলছেন। তিনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না—এটা তার দুর্বলতা, আপনার কৃত্রিম তৈরি পরিস্থিতি নয়।
ইমাম ইবনু আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ লিখেছেন—
لَا يَضْمَنُ الْمُكْرَهُ إِذَا فَعَلَ الْمُكْرَهُ مَا يُؤَدِّي إِلَى تَلَفٍ
“যে ব্যক্তি কাউকে জোর করে কিছু করায়, সে ক্ষতির জন্য দায়ী হয় না যদি জোরপূর্বক কাজটি ক্ষতির কারণ হয়।”
(রদ্দুল মুহতার ৫/৪৯৬)
আপনি তো তাকে জোর করেননি, বরং তার ভালোর জন্যই এ কাজ করেছেন। তাহলে দায়িত্ব তো আপনার ওপর আসার প্রশ্নই ওঠে না।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
- আপনি সম্পূর্ণ সঠিক পথে আছেন—হারাম সম্পর্ক ছেড়ে দেওয়া জরুরি ছিল, আপনি তা করেছেন।
- ছেলের কোনো আত্মক্ষতি বা নেশা করলে তার গুনাহ তার নিজের, আপনার নয়। আল্লাহর কাছে আপনি এর জন্য জবাবদিহি করবেন না।
- পালিয়ে বিয়ে করবেন না—বরং নিজ পরিবার ও তার পরিবারের সঙ্গে দ্বীনদারি ও ভদ্রতা করে বিয়ের চেষ্টা চালিয়ে যান।
- দু‘আ ও ইস্তিগফার বেশি করুন। আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের জন্য উত্তম পথ বের করে দেন।
- ছেলেটির জন্য আপনি দায়ী নন, তবে আপনি যদি তাকে উৎসাহিত করে থাকেন যে “তুমি এটা করো” তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু আপনি তো তা করেননি।
আল্লাহ তাআলা আপনার ইমানি সতর্কতাকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য উত্তম পাত্র সহজ করে দিন। আমীন।
তথ্যসূত্র
- কুরআন: সূরা আল-আন‘আম ৬:১৬৪, সূরা ফাতির ৩৫:১৮
- হাদীস: “নিয়ত অনুযায়ী কাজের ফল” (বুখারী ১, মুসলিম ১৯০৭)
- রদ্দুল মুহতার: ৬/৪০২, ৫/৪৯৬ (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪২১ (হারাম সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার গুরুত্ব)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/১৮৩ (অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে)
- আল-হিদায়া: কিতাবুল হুদুদ (নিজ দায়িত্ব নিজের ওপর)
- বিহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): বিয়ের আগে সম্পর্কের বিধান
আল্লাহু আলাম (সর্বজ্ঞ সত্য আল্লাহই ভালো জানেন)