বিপদমুক্তির শর্তে ১০০-১০০০ বার শুকরিয়া সিজদা দেওয়ার মানত করা কি জায়েয ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন:
আমি যদি আল্লাহর কাছে এমন কসম দিই যে, আমাকে অমুক বিপদ বা সমস্যা থেকে আল্লাহ মুক্তি দিলে আমি ১০০ থেকে ১০০০ বার শুকরিয়া আদায়ের নিয়তে সিজদা দেব, যতদিন লাগুক ১-৩টি করে দিতে দিতে। এটা কি জায়েয হবে?
উত্তর:
না, এ ধরনের মানত (নযর) বা কসম করা জায়েয নয় এবং তা পূর্ণ করা ওয়াজিবও নয়। বরং এটি একটি অপছন্দনীয় ও বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে তার কারণ ও বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. শুকরিয়া সিজদা একটি স্বতন্ত্র ইবাদত নয়
শরী‘আতে শুকরিয়া আদায়ের জন্য একটি সিজদা করা সুন্নত (মুস্তাহাব) এবং তা যেকোনো সময় করা যায়। কিন্তু একাধিক সিজদা নির্দিষ্ট সংখ্যায় মানত করা বা কসম করা ইসলামি বিধানে স্বীকৃত নয়।
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্ট উল্লেখ আছে:
-
রদ্দুল মুহতার (৫/৪৮৫):
“وَلَوْ نَذَرَ سَجْدَةَ الشُّكْرِ لَا يَلْزَمُهُ؛ لِأَنَّ السَّجْدَةَ لَيْسَتْ بِصَلَاةٍ وَلَا صِيَامٍ وَلَيْسَتْ بِعِبَادَةٍ مَقْصُودَةٍ”
“যদি কেউ শুকরিয়া সিজদার মানত করে, তবে তা তার উপর ওয়াজিব হয় না, কারণ সিজদা (দাঁড়িয়ে পড়া) না সালাত, না সিয়াম, আর এটি একটি স্বতন্ত্র ইবাদতও নয়।” -
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/২৮৯):
“وَمَنْ نَذَرَ سَجْدَةً لِلشُّكْرِ لَا تَلْزَمُهُ”
“যে ব্যক্তি শুকরিয়া সিজদার মানত করে, তা তার উপর আবশ্যক হয় না।”
২. নির্দিষ্ট সংখ্যা ও বিন্যাস বিদ‘আত
১০০ থেকে ১০০০ বার সিজদা দেওয়া এবং তা ১-৩টি করে ভাগে ভাগে আদায় করা রাসূলুল্লাহ ﷺ বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত নয়। এটি একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা, যা বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত।
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৪৪)-এ মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. লিখেছেন:
“এ ধরনের মানত (যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক সিজদা) জায়েয নয়; বরং বিদ‘আত।”
-
ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৭৫)-এ উল্লেখ আছে:
“শুকরিয়া আদায়ের জন্য এক সিজদা বা দুই রাক‘আত নফল সালাত যথেষ্ট। এর বেশি কোনো নির্ধারিত সংখ্যা বা পদ্ধতি শরী‘আতে নেই।”
৩. শর্তযুক্ত মানত (নযর মু‘আল্লাক) মাকরূহ
কোনো বিপদ দূর করার শর্তে মানত করা নবীজি ﷺ-এর নিকট অপছন্দনীয়। তিনি বলেছেন:
“إِنَّ النَّذْرَ لَا يَأْتِي بِخَيْرٍ، وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ” (بخاری: ৬৬০৮)
“মানত কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং তা কৃপণের কাছ থেকে কিছু বের করার উপায় মাত্র।”
মানত পূর্ণ করা তো দূরের কথা, মানত করাই উত্তম নয়।
৪. বিকল্প পদ্ধতি
যদি আল্লাহ তাআলা আপনার বিপদ দূর করেন, তাহলে নিম্নোক্ত পন্থায় শুকরিয়া আদায় করুন:
- একটি সিজদা (সিজদায়ে শুকর) করা।
- বা দুই রাক‘আত নফল সালাত পড়া।
- বা দান-সাদকাহ করা।
- বা অধিক পরিমাণে “আলহামদুলিল্লাহ” ও “সুবহানাল্লাহ” পড়া।
এগুলোই শরী‘আতসম্মত ও সহজ পদ্ধতি।
৫. ইতিমধ্যে মানত করে ফেললে করণীয়
যেহেতু এই মানত শরী‘আতসম্মত নয়, তাই তা পূর্ণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং আপনার উচিত:
- তওবা ও ইস্তিগফার করা, ভুল বুঝে ভবিষ্যতে এ ধরনের মানত না করা।
- নিরাপদ থাকার জন্য একটি কাফফারায়ে ইয়ামীন (একজন গোলাম আযাদ করা বা দশজন মিসকিনকে দু’বেলা খাওয়ানো বা তাদের পোশাক দেওয়া, অথবা সামর্থ্য না থাকলে তিনদিন রোযা) আদায় করা যেতে পারে (যদিও এই মানত ওয়াজিব নয়, তথাপি কসমের লাফজ ব্যবহার করায় কাফফারা ইহতিয়াত হিসেবে দেয়া ভালো)।
তবে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, অগ্রহণযোগ্য মানত ভঙ্গ করায় কোনো কাফফারা নেই; বরং শুধু তওবা যথেষ্ট। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮৯)
সারসংক্ষেপ:
- অমুক বিপদ দূর হলে ১০০-১০০০ বার সিজদা দেওয়ার মানত করা জায়েয নয়।
- এটি বিদ‘আত ও অপছন্দনীয়।
- বরং শুকরিয়া আদায়ের জন্য এক সিজদা, দুই রাক‘আত নফল বা দান-সাদকাহ সুন্নত।
- ইতিমধ্যে করে ফেললে তওবা করুন এবং তা পূর্ণ করবেন না।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ ও আমল করার তাওফীক দান করুন।
উত্তর প্রদান:
(মুফতি)
ইসলামিক ফিকাহ বিভাগ
দারুল ইফতা, দেওবন্দ
উল্লিখিত হানাফি কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (كتاب النذر)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (كتاب النذر)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৪৪)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৭৫)
- সহীহ বুখারী (হাদিস: ৬৬০৮)