পিতার ইনকাম হারাম হলে সেক্ষেত্রে একজন অবিবাহিতা মেয়ের জন্য করণীয় কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি আগে জানতাম আমার বাবার ইনকাম হালাল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে দ্বীনে ফেরার পর আমি খোঁজ করি আদৌও কি আমাদের ইনকাম হালাল কি-না..
তখন জানতে পারি ব্যাংকে অনেক টাকা ঋণ এবং সেগুলোর সুদ দিতে হয়।সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনে ভীষণ ভয় পেয়ে যাই, আব্বুকে আম্মুকে বুঝাই সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে। কিন্তু এতো টাকা ঋণ যে তা পরিশোধ করা সম্ভব না। এতে জমি বিক্রি করতে হবে। আর এইটা তারা কখনই করবে না। আব্বু আম্মুর ইসলাম সম্পর্কে তেমন জ্ঞান না থাকায় তারা এটাকে নরমাল মনে করে। আমি অনেক বুঝাই আমার মা'কে।
সহজ ভাষায়, কঠিন ভাষায় কান্না কান্না মুখ করে ইত্যাদি..
আমার আবার আব্বু পলিটিক্সের সাথে জড়িত। আমি সবসময় নিষেধ করি যেন পলিটিক্স ছেড়ে দেয়। তিনি এমনভাবে নাকি জড়িত চাইলেই এখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন না। আমি বুঝাতে গেলে আমাকে বাচ্চা ভেবে কথা না শোনার ভান করে থাকেন। আমাকে এড়িয়ে চলেন আব্বু।
সাপোজ কোথাও কোনো কাজ পেল সেখান থেকে লুকিয়ে ৩০,৪০ হাজার নিজের কাছে রেখে দিল। এমনকি মসজিদের জন্য টাকা এসেছিল সেখান থেকেও লুকিয়ে ১৫ হাজার টাকা নিজের জন্য রেখেছে। আমি যখন জেনেছি এসব আমার চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে, কষ্টে, দুঃখে বুক ফেটে যাচ্ছে। আমি কিভাবে এখান থেকে বের হবো? আমি বুঝি জীবনেও হালাল খাবার খেতে পারবো না!
আমি অবিবাহিতা মেয়ে। নিজের ইনকামের সামর্থ নেই। আমি কি করবো..?
এভাবে যে আব্বু অন্যেক হক নষ্ট করে টাকা নেয় এসব কথা আমাকে কেউ বলে না।
আমি এসব বিষয়ে সাপোর্ট করি না জন্য। সবসময় আমার থেকে এসব লুকিয়ে রাখে আমার আব্বু আম্মু।
আমি জিজ্ঞেস করলে মা এমনভাবে মিথ্যা বলে আমি একদম সত্যি মনে করি।
এরপর আমার ছোট ভাই আমাকে এসে সবকিছু বলে যে কোথা থেকে টাকা আসলো। এবং এটাও বলে মা আব্বু ওকে নিষেধ করছে আমাকে যেন না বলে। আম্মু পুরো সাপোর্ট করে আব্বুকে।
আমার পরিবার, আমি পুরো হারাম খাই। এখন আমি কি করবো?
নিজের নফসে বুঝাতে পারি না। আমি এতটুকু খাদ্য গ্রহণ করতে চাই যতটুকু খেলে আমার মেরুদণ্ড সোজা থাকবে। কিন্তু ২,১ দিন এমনভাবে চললে আমি অসুস্থ হয়ে যাই দুর্বল হয়ে যাই, প্রেসার লো হয়ে যাই। তখন আবার ঠিকমতো খাবার খাই আর সুস্থ হয়ে যাই। জামা কাপড় ইত্যাদি লাগলে নেই। যখন যা খেতে ইচ্ছে করে রান্না করে খাই। আমি আমার নফসকে মাঝে মাঝে কন্ট্রোল করতে পারি কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই পারি না। আরামসে হারাম খেয়ে যাই, পড়ে যাই।
এ হারাম থেকে আমি বুঝি আজীবনও বের হতে পারবো না।
আমার আব্বুকে বুঝালেও বুঝে না, বলে আমি নাকি বেশি বকি, আব্বু সবকিছু জানেন কোনটা হারাম কোনটা হালাল। তিনি বলেন এতো মানা যায় না। সবাই তো এসবের সাথে জড়িত এসব করে।
আমি হাদিস, কুরআন দিয়ে বুঝাই তবুও তারা বুঝে না। উল্টা আমাকে না বলে আমার থেকে লুকিয়ে এসব করে। আর আমি কিছু বললে আমাকে বকাবকি শুরু করে।
এই অবস্থায় এখন আমি কি করতে পারি..? আমাকে কিছু নসিহা করুন উস্তায।
যদিও ভালো কোনো ছেলেকে বিয়ে করি যার ইনকাম হালাল। এরপর উনি যখন আমাদের বাসায় আসবেন, উনার পরিবারের লোকজন আসবেন। তাদেরও তো হারাম খেতে হবে। এখন কিভাবে আমি সবকিছু জেনেও আমার জাওযকে, তার পরিবারকে হারাম খেতে দিতে পারি?
আবার আমার আব্বু যদি আমার বিয়ের পর জিনিসপত্র দেয়, গিফট দেয় সেগুলো কি গ্রহণ করা যাবে না..? আর না গ্রহণ করলে আব্বু কি বলবে? আমি কি বিয়ের পর বাবার বাড়ি আর আসবো না..? এমন করলে তো আব্বু আম্মু আমার সাথে সম্পর্কই রাখবেন না। তাদেরকে তো আমি চিনি।
আর আব্বুকে কিভাবেই বা এমন কথা বলবো তিনি যেন আমাকে কিছু না দেয়..?
আমার যখন সন্তান হবে আমি তো তাকে ১ পয়শাও হারাম খেতে দিতে চাই না। তার রক্তে হারাম থাকবে এটা তো চাইনা। তাকেই বা কিভাবে মানুষ করবো তার নানু বাড়ি ছাড়া। আমার আব্বু তো নরমালি আমার সন্তানকে শখ করে জিনিসপত্র কিনে দিবেন, খাওয়াবেন।
আমি এখন এই অবস্থায় কি করতে পারি..?
আমি কি করবো উস্তায? আমাকে কিছু নসীহা করুন। আমি যে অসহায়!
এসব চিন্তা করলে আমার এই দুনিয়াতে আর থাকতে ইচ্ছে করে না, পরকালেও তো মুক্তি নেই।জানি না আল্লাহ আমায় মাফ করবেন কি-না!
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনার আবেগ ও কষ্ট আমরা বুঝতে পারছি। আপনার দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা এবং হারাম থেকে বাঁচার আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ আপনাকে এই সংকটময় অবস্থায় ধৈর্য ও হিকমত দান করুন। আমীন।
১. আপনার ব্যক্তিগত অবস্থা: বাবার ঘরে হারাম খাওয়া
যেহেতু আপনি অবিবাহিতা এবং নিজের আয় নেই, তাই আপনি বর্তমানে বাবার খাওয়া-পরা ও অন্যান্য প্রয়োজনে নির্ভরশীল। ইসলামী বিধান অনুযায়ী:
- পিতা-মাতার অবৈধ উপার্জন থেকে সন্তান যদি নিজের ইচ্ছায় ও সমর্থন দিয়ে অংশগ্রহণ না করে, বরং তার বিরোধিতা করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে না। তবে প্রয়োজন মতো খাওয়া জায়েয আছে, কিন্তু তা হারাম জেনে স্বাচ্ছন্দ্যে ও চেয়ে খাওয়া উচিত নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪; ফাতাওয়া উসমানী, ৪/৪৩২)
- আপনি যদি অন্য কোনো হালাল উপায়ে খাবার জোগাড় করতে পারেন, তাহলে তা করুন। আর যদি একেবারেই না পারেন, তাহলে আপনার অবস্থা বিবেচনায় এতটুকু খাওয়া জায়েয যতটুকু না খেলে আপনার শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে সর্বদা অন্তরে হারামের প্রতি ঘৃণা রাখবেন এবং আল্লাহর কাছে তওবা করতে থাকবেন।
কুরআন ও হাদীসের দিকনির্দেশনা:
لَا تُكَلَّفُ نَفْسٌ إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন এবং তাকে অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক দান করেন।" (সূরা তালাক: ২-৩)
২. পিতা-মাতাকে বোঝানো ও আপনার করণীয়
- আপনি ইতিমধ্যে কুরআন-হাদীস দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা না শুনলে আপনি নিরুৎসাহিত হবেন না। নরম ভাষায়, সময়-সময় ধৈর্য ধরে বলতে থাকুন। তাদের দোয়া করুন।
- পিতার পলিটিক্স ও দুর্নীতির বিষয়ে আপনার কর্তব্য হলো সংক্ষেপে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি বলা। এর বেশি কিছু করার সামর্থ্য আপনার নেই। আপনি তাদের জন্য ইস্তিগফার ও দোয়া করতে পারেন।
- যদি পিতা আপনার কথায় রাগ করেন বা উপেক্ষা করেন, তাহলে আপনি চুপ থাকবেন। কিন্তু হারাম কাজে আপনার সমর্থন নেই—এটা জানিয়ে রাখবেন।
৩. বিয়ের ক্ষেত্রে করণীয়
- আপনি ইনশাআল্লাহ একজন দ্বীনদার ও হালাল রোজগারকারী ছেলেকে বিয়ে করুন। বিয়ের সময় তাকে আপনার পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে বুঝিয়ে বলবেন। তিনি যদি প্রকৃত দ্বীনদার হন, তাহলে বুঝবেন এবং আপনাকে সহায়তা করবেন।
- বিয়ের পর স্বামীর সাথে আলাদা থাকার চেষ্টা করুন। আপনার পিতার বাড়িতে আসলে স্বামী ও তার পরিবারকে যতটা সম্ভব হারাম খাবার থেকে বিরত রাখবেন। যদি কোনো উপায় না থাকে, তাহলে ব্যাপারটি স্বামীকে জানিয়ে তার সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিন।
৪. পিতার পক্ষ থেকে উপহার ও জিনিসপত্র গ্রহণ
- পিতার উপার্জনের অধিকাংশ যদি হারাম হয় (যেমন সুদ, আত্মসাৎ ইত্যাদি), তাহলে তার দেওয়া উপহার গ্রহণ করা মাকরুহ ও অপছন্দনীয়। তবে যদি তা প্রত্যাখ্যান করায় পারিবারিক সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে গ্রহণ করে দান করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহার না করে অমুসলিম বা প্রয়োজনমুক্তভাবে খরচ করার অনুমতি আছে কিছু হানাফী উলামার মতে। (ফাতাওয়া শামী, ৬/৩৮৪ কিতাবুল কারাহিয়া)
- তবে সবচেয়ে উত্তম হলো: বিনা দ্বিধায় না বলার চেয়ে নরম ভাষায় বুঝিয়ে বলা, "আব্বু, আমি চাই আপনার সবকিছু হালাল হোক। আপনার দয়া, কিন্তু আমি যদি নিই, তাহলে আমার জন্য অস্বস্তি হয়।" এরপর তিনি বুঝলে ভালো, না বুঝলে ধৈর্য ধরবেন।
৫. ভবিষ্যতের সন্তান ও নানু-বাড়ি
- আপনার সন্তানকে হারাম খাওয়ানো যাবে না। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু আপনার পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয় (সিলাতুর রাহিম ওয়াজিব), তাই আপনি আপনার নিজের ঘরে সন্তানের খাবার হালাল রাখবেন। নানু-বাড়ি গেলে বাবা-মাকে আগেই জানিয়ে রাখবেন: "আপনাদের ভালোবাসা মানি, কিন্তু আমার সন্তানকে আমি হালাল খাবার ছাড়া কিছু দিতে চাই না। আপনি যদি হালাল উপায়ে কিছু দেন, তাহলে নেব।" নরম অথচ দৃঢ়ভাবে বলবেন।
৬. হতাশা ও আত্মহত্যার চিন্তা থেকে সাবধান
- আপনি লিখেছেন: "এসব চিন্তা করলে আমার এই দুনিয়াতে আর থাকতে ইচ্ছে করে না..." দয়া করে কখনো আত্মহত্যার চিন্তা করবেন না। এটি কবীরা গুনাহ। আপনার জীবনের মূল্য অপরিসীম। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
"তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।" (সূরা নিসা: ২৯)
- আপনার বর্তমান অবস্থা একটি পরীক্ষা। মহিলা সাহাবীদের জীবন দেখুন—তারা কীভাবে কঠিন পরিস্থিতিতেও দ্বীন ধরে রেখেছিলেন।
৭. চূড়ান্ত নসীহা
- দোয়া করতে থাকুন: اللَّهُمَّ اجْعَلْ لِي مَخْرَجًا وَارْزُقْنِي مِنْ حَيْثُ لَا أَحْتَسِبُ
- চেষ্টা করুন নিজে কিছু হালাল আয়ের ব্যবস্থা করতে (অনলাইনে টিউশনি, হাতের কাজ, সেলাই ইত্যাদি)।
- পিতার মসজিদের টাকা আত্মসাৎ—এটি মারাত্মক গুনাহ। আপনি যদি প্রমাণ পান, তাহলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মসজিদ কমিটিকে জানাতে পারেন, তবে নিজে সরাসরি না করে বুদ্ধিমত্তার সাথে করুন।
- সর্বোপরি, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আপনার আন্তরিক তওবা ও সংকল্প গ্রহণযোগ্য ইনশাআল্লাহ।
আমার প্রার্থনা
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দিন, সঠিক পথ দেখান এবং আপনার পরিবারকে হিদায়াত দান করুন। আপনার মতো অসংখ্য দ্বীনদার মেয়ে এই পথ পাড়ি দিয়ে আজ সুখী ও হালাল জীবনে ফিরেছে। আপনিও পারবেন। হারাম থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতে থাকুন—আল্লাহ কখনো বান্দাকে ছেড়ে দেন না।
والله أعلم بالصواب