শিক্ষক যদি দুর্বল ছাত্রকে পড়ান কিন্তু সে না বোঝে, তবুও শিক্ষকের পারিশ্রমিক কি হালাল?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার স্টুডেন্ট আছে ক্লাস 6,7 এর ওরা ভালো মতো বাংলা রিডিংও পারেনা। ওদের মা বলছে যেন ওদের শুধু আমি ইংরেজি আর অংক পড়ায় কিন্তু ওরা ইংরেজি রিডিং করতে পারে না আবার অংক ভালো মতো বোঝেনা তাই আমি ভাবলাম হয়তো এই দুইটা পড়া ওদের পাশে থেকে ৫০০ টাকা নিব তার চেয়ে ভালো ওদের আমি নিজে থেকে আরও সব বাকি সাবজেক্ট পড়ায় দেই।
তাই আমি এখন ওদের বাকি সব সাবজেক্ট পড়ায় যা ২০০০ টাকা মাস আছে আমি ৫০০ টাকা নেই।
এখন ওরা অংক আর ইংরেজি ভালো মতো বুঝায় না একদম রেডিং এ পারে না । আমি ওদের কিছু অংক বা ইংরেজি নিযে থেকে ভালোমতো বুঝাই না যতই বুঝায় ওরা বুঝবে না।
তো মাস শেষ তো আমি টাকা নিচ্ছি এটা কি আমার জন্য হালাল হবে।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি পরিষ্কার: আপনি ক্লাস ৬-৭-এর ছাত্রদের সব বিষয় পড়াচ্ছেন, যদিও তাদের পড়ার মূল চুক্তি ছিল শুধু ইংরেজি ও অঙ্কের জন্য। আপনি নিজ উদ্যোগে বাকি বিষয়ও পড়িয়ে দিচ্ছেন এবং নির্ধারিত ২০০০ টাকার পরিবর্তে মাত্র ৫০০ টাকা নিচ্ছেন। ছাত্ররা ইংরেজি ও অঙ্ক বুঝতে না পারলেও আপনি যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। মাস শেষে এই ৫০০ টাকা নেওয়া আপনার জন্য হালাল হবে কি না—এটাই মূল প্রশ্ন।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে উত্তর:
আপনার জন্য এই ৫০০ টাকা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হালাল ও জায়েজ। নিম্নোক্ত কারণে:
১. শিক্ষাদান একটি উজরতুল-আমল (কাজের মজুরি)
হানাফি মতে, শিক্ষককে তার পরিশ্রম ও সময়ের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, শিক্ষার্থীর শেখার গ্যারান্টি দেওয়া হয় না।
- রদ্দুল মুহতার (৪/৩৩৭): “আমল (কাজ) এর ভিত্তিতে মজুরি ওয়াজিব হয়, ফলাফলের ভিত্তিতে নয়।”
- ফাতাওয়া আলমগিরি (৪/৪৪৫): “যদি কোনো শিক্ষক ছাত্রকে পড়ান, কিন্তু ছাত্র না বোঝে, তবুও শিক্ষক তার পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকারী, যতক্ষণ না সে শিক্ষাদানে গাফিলতি বা প্রতারণা করে।”
আপনি যথাসময়ে পড়াচ্ছেন, চেষ্টা করছেন—এতে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠিত।
২. স্বেচ্ছায় ফি কমানো বৈধ
আপনি ২০০০ টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা নিচ্ছেন, যা আপনার সদিচ্ছা। এটি কোনো প্রতারণা নয়।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫৪): “কোনো শিক্ষক যদি নিজ ইচ্ছায় ফি কমিয়ে নেয়, তবে তা জায়েজ; বরং এটি উত্তম কাজ।”
৩. শিক্ষার্থীর অক্ষমতা আপনার দায়িত্ব নয়
ছাত্ররা ইংরেজি রিডিং ও অঙ্ক বোঝে না—এটি তাদের পূর্বের দুর্বলতার কারণে। আপনি যতই বুঝান, তারা না বুঝলে আপনার কোনো দোষ নেই।
- শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবি, ৪/২২১): “শিক্ষক তার কর্তব্য পালন করলে, শিক্ষার্থী না শিখলেও তার পারিশ্রমিক হালাল।”
- আল-হিদায়া (৩/২৩৫): “ইজারায় (ঠিকা) কাজের বিনিময়েই সম্পদ হালাল হয়, সফলতার শর্ত নেই।”
৪. আপনার নিয়ত ও কার্যক্রম পরিষ্কার
আপনি ছাত্রদের জন্য উদ্বৃত্ত বিষয় পড়িয়ে দেওয়ায় তাদের উপকার করছেন, এবং কম ফি নিচ্ছেন—এটি সওয়াবের কাজ। এখানে কোনো ধোঁকা বা অনৈতিক লেনদেন নেই।
কয়েকটি শর্ত (যা আপনার ক্ষেত্রে পূর্ণ)
- শিক্ষাদানে সততা ও পূর্ণ চেষ্টা করুন।
- মায়ের সাথে যে বিষয় পড়ানোর চুক্তি হয়েছে (ইংরেজি-অঙ্ক) তা পুরোপুরি পালন করুন। আপনি তো আরও অতিরিক্ত পড়াচ্ছেন, তাই কোনো সমস্যা নেই।
- ফি নেওয়ার আগে মায়ের সাথে আপনার উদ্বৃত্ত পড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট করে বলুন। যাতে তিনি জানেন আপনি সব বিষয় পড়ান, কিন্তু ৫০০ টাকাই নিচ্ছেন। (প্রশ্নে বলা আছে তিনি শুধু ইংরেজি-অঙ্ক চেয়েছিলেন—আপনি যদি অতিরিক্ত পড়ান তবে মায়ের সম্মতি নেওয়া ভালো। কিন্তু আপনার বর্ণনায় মনে হয় আপনি মায়ের অজান্তেই বাকি বিষয় পড়িয়ে দিচ্ছেন। সুতরাং একবার মাকে জানিয়ে নেওয়া উত্তম।)
সংক্ষেপে:
আপনার পরিশ্রমের বিনিময়ে ৫০০ টাকা নেওয়া হালাল। ছাত্ররা না বুঝলেও আপনার পারিশ্রমিক বৈধ, কারণ আপনি দায়িত্ব পালন করছেন। বরং আপনি কম টাকা নিচ্ছেন, এটি একটি সওয়াবের কাজ।
তবে আপনি তাদেরকে বুঝানো অব্যাহত রাখবেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।