মুখ দিয়ে শিশ বাজানোর হুকুম
Faith and Belief · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
মুখ দিয়ে শিশ বাজানো কি জায়েজ?
উত্তর
মুখ দিয়ে শিশ (শিস) বাজানো ইসলামী শরীয়তে জায়েজ নয়। এটি নিষিদ্ধ (হারাম) কাজগুলোর অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে এর প্রমাণ ও কারণ উল্লেখ করা হলো:
কুরআন ও হাদীসের দলিল
১. কুরআনের দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ" "আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ (অর্থহীন) কথার বিনিময় ক্রয় করে, যাতে মানুষকে বিনা জ্ঞানে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে পারে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।" (সূরা লোকমান: ৬)
এই আয়াতে "لَهْوَ الْحَدِيثِ" (অর্থহীন কথা) দ্বারা অধিকাংশ তাফসীরকারক গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রকে বুঝিয়েছেন। ইমাম ইবনে আব্বাস (রাঃ), ইবনে মাসউদ (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবীগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এটি গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রকে নির্দেশ করে। (তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে ইবনে কাসীর)
২. হাদীসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ" "আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৯০)
এই হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বাদ্যযন্ত্রকে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং যারা তা হালাল মনে করবে তাদের নিন্দা করেছেন।
শিশ (শিস) বাজানো কেন নিষিদ্ধ?
মুখ দিয়ে শিশ বাজানো বা শিস দেওয়া নিম্নলিখিত কারণে নিষিদ্ধ:
১. এটি বাদ্যযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত: মুখ দিয়ে যে শব্দ উৎপন্ন হয় তা একটি বাদ্যযন্ত্রের মতো গণ্য হয়। ইসলাম সাধারণভাবে বাদ্যযন্ত্র ও গান-বাজনাকে নিষিদ্ধ করেছে।
২. এটি কাফিরদের রীতি: কাফির ও মুশরিকরা তাদের ইবাদত-উপাসনায় শিস ও তালি ব্যবহার করত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ إِلَّا مُكَاءً وَتَصْدِيَةً" "আর বাইতুল্লাহর নিকট তাদের সালাত (ইবাদত) শিস ও তালি ছাড়া কিছুই ছিল না।" (সূরা আনফাল: ৩৫)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: "মুশরিকরা তাদের ইবাদতের সময় শিস দিত ও তালি বাজাতো। আল্লাহ তাআলা তাদের এই কাজ নিন্দা করেছেন।" (ইগাসাতুল লাহফান)
৩. অযথা সময় নষ্ট ও মনের বিকৃতি: শিস বাজানো সাধারণত অযথা সময় কাটানো, বিনোদন ও অহেতুক কাজের সাথে জড়িত। ইসলাম মুমিনদের সময়ের মূল্য দিতে এবং অর্থপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে।
সালাফি স্কলারদের মতামত
শায়খ ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: "মুখ দিয়ে শিস দেওয়া ও তালি বাজানো মুশরিকদের ইবাদতের পদ্ধতি। আল্লাহ তাআলা তাদের এই কাজ নিন্দা করেছেন।" (ইগাসাতুল লাহফান, ১/২৫৮)
শায়খ আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহ.) কে শিস বাজানো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন: "এটি হারাম। কারণ এটি বাদ্যযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং এর মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১০/৪৩)
শায়খ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.) বলেন: "মুখ দিয়ে শিস বাজানো জায়েজ নয়, বিশেষ করে যখন এটি ইবাদতের সময় বা গানের সাথে মিলিত হয়। এটি মুশরিকদের রীতি।" (শারহুর রিয়াদুস সালিহীন)
শায়খ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রহ.) বলেছেন: "সমস্ত বাদ্যযন্ত্র হারাম, যার মধ্যে শিস, বাঁশি, তবলা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। শুধুমাত্র দাফ (স্ত্রীলোকদের জন্য ঈদ ও বিয়েতে) অনুমোদিত।" (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা)
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "মুখ দিয়ে শিস বাজানো ও তালি দেওয়া নিষিদ্ধ, কারণ এটি কাফিরদের কাজ এবং ইবাদতকে বিকৃত করে।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান)
ব্যতিক্রম
১. ক্রীড়া বা প্রয়োজনীয় কাজে: খুব প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে, যেমন কোনো সংকেত দেওয়ার জন্য বা পশু-পাখি ডাকতে শিস ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি তা গান-বাজনা বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে না হয়। তবে উত্তম হলো অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করা।
২. ছোট শিশুদের জন্য: ছোট শিশুদের অভ্যাস বা খেলাধুলার জন্য শিস বাজানো সাধারণত নিষিদ্ধ নয়, তবে অভিভাবকদের উচিত শিশুদেরকে এ অভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে দূরে রাখা।
উপসংহার
মুখ দিয়ে শিশ (শিস) বাজানো ইসলামী শরীয়তে জায়েজ নয়। এটি বাদ্যযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআন ও হাদীস দ্বারা নিষিদ্ধ। বিশেষ করে যখন এটি গান-বাজনা, বিনোদন, অযথা সময় নষ্ট, বা কাফিরদের অনুকরণের উদ্দেশ্যে হয় তখন নিষিদ্ধ হওয়া আরও স্পষ্ট। মুমিনের উচিত সময়কে মূল্যবান মনে করে আল্লাহর ইবাদত ও ভালো কাজে ব্যয় করা এবং নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।