বিবাহের উদ্দেশ্যে একজন পুরুষ কি একসাথে কয়েকজন নারীর সাথে কথা বলতে পারবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন পুরুষ এর যখন সত্যিকার অর্থেই বিবাহের উদ্দেশ্য থাকে,সেক্ষেত্রে সেই উদ্দেশ্যে একাধিক নারীর সাথে শরীয়তের গন্ডির মধ্যে থেকে পৃথক পৃথক ভাবে মাহরামের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন, তবে তা কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও আদবের সাপেক্ষে।
একসঙ্গে (একই মজলিসে) কয়েকজন নারীর সাথে সরাসরি কথা বলার অনুমতি নেই, কারণ এতে ফিতনা ও অশালীনতার আশঙ্কা থাকে। তবে পৃথক পৃথকভাবে, পর্দা ও শালীনতার সাথে বেশ কিছু শর্ত স্বাপেক্ষে কথা বলা জায়েজ আছে
মূলনীতি ও দলিল
বিবাহের প্রস্তাবের জন্য অপরিচিত নারীর সাথে কথা বলা ও দেখা করা ইসলামে অনুমোদিত, তবে তা নির্ধারিত সীমার মধ্যে হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُمْ بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ أَوْ أَكْنَنْتُمْ فِي أَنْفُسِكُمْ"
(তবে ইঙ্গিতে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া বা মনে মনে সঙ্কল্প করা, এতে তোমাদের কোনো পাপ নেই) — (সূরা আল-বাকারা, ২:২৩৫)
এ আয়াতের ভিত্তিতে ফকিহগণ বলেছেন, বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য নারীর সাথে কথা বলা জায়েজ, কিন্তু তা ইঙ্গিতপূর্ণ ও শালীন হতে হবে।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ، فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ مِنْهَا إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ"
(তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, যদি সে তার এমন অঙ্গ দেখতে পারে যা তাকে বিবাহে উদ্বুদ্ধ করে, তবে সে যেন তা করে) — (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮২)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, প্রস্তাবের জন্য নারীর সাথে সরাসরি কথা বলা ও দেখা করা জায়েজ, তবে তা একান্ত প্রয়োজন ও শালীনতার সীমার মধ্যে হতে হবে।
হানাফি ফিকহের বিস্তারিত
হানাফি মাযহাবের কিতাবে উল্লেখ আছে:
-
রদ্দুল মুহতার (২/৪৩-৪৪):
"বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য নারীর সাথে কথা বলা জায়েজ, তবে তা ফিতনার আশঙ্কামুক্ত হতে হবে। একাধিক নারীর সাথে একই সময়ে কথা বলা নাজায়েজ নয়, কিন্তু তা যদি অশ্লীলতা বা ফিতনার কারণ হয় তবে তা মাকরূহ।" -
বাহিশতি জেওয়ার (১/২২০):
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন:
"বিবাহের উদ্দেশ্যে মেয়ের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলা জায়েজ, কিন্তু একটি মেয়ের সাথে কথা বলার সময় অন্য মেয়ের কথা মনে করিয়ে দেওয়া বা তাদের সামনেই অপর মেয়ের প্রসঙ্গ আনা উচিত নয়।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩০০):
"একই সময়ে কয়েকজন সম্ভাব্য পাত্রীর সাথে সরাসরি কথা বলা বা তাদেরকে একত্রে ডেকে আনা সংগত নয়। বরং প্রত্যেকের সাথে পৃথকভাবে ও শালীনতার সাথে কথা বলা উচিত।"
শর্তসমূহ
১. পর্দা ও শালীনতা: কথাবার্তা পর্দার আড়ালে বা পর্দার মাধ্যমে হওয়া চাই (যেমন ফোন বা পর্দার আড়াল থেকে)। সরাসরি দেখা ও কথা বলার ক্ষেত্রে দৃষ্টি ও কথার শালীনতা বজায় রাখতে হবে।
২. গোপনে একান্তে নয় (খালওয়াত নয়): কোনো নারীর সাথে একান্তে (খালওয়াত) কথা বলা নাজায়েজ। তবে পরিবারের উপস্থিতি বা উন্মুক্ত স্থানে কথা বলা জায়েজ।
৩. প্রতারণা নয়: যদি কোনো নারী ইতিমধ্যে কোনো পুরুষের প্রস্তাব গ্রহণ করে ফেলে (এবং সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার না হয়), তবে তার প্রতি অন্য পুরুষের প্রস্তাব দেওয়া নাজায়েজ। (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৫১৪২)
৪. একাধিক নারীর প্রতি সম্মান: একসাথে কয়েকজন নারীর সামনে তাদেরকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া বা তাদের মান-সম্মানে আঘাত আসে—এমন কথা বলা উচিত নয়।
উপসংহার
একটি পুরুষ বিবাহের উদ্দেশ্যে একাধিক নারীর সাথে কথা বলতে পারেন, কিন্তু একসাথে (একই মজলিসে) কয়েকজন নারীর সাথে সরাসরি কথা বলা নয়। বরং তিনি পৃথক পৃথকভাবে, পর্দা রক্ষা করে এবং আল্লাহর বিধানের সীমার মধ্যে থেকে পাত্রীর মাহরামের উপস্থিতিতে প্রত্যেকের সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন।
তবে নিয়ম হলো তিনি যার সাথে বিবাহের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চান, শুধু তার সাথেই মাহরামের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় আলোচনা করবেন এবং অন্যান্য প্রস্তাবের ব্যাপারে সৎ ও স্বচ্ছ থাকবেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।