অভিভাবক ছাড়া বিয়ে জায়েজ কি? হানাফি মাজহাবের ফতোয়া অনুযায়ী বিবাহের শর্ত, পরিবারের অমত হলে করণীয়

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2145
Questioner: mahamuda mumu
Question Asked: 29 Jun 2026, 04:45 PM
Reviewed & Published: 29 Jun 2026, 04:52 PM
Views: 90
Tokens: 5,360
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাকে একটা ছেলে পছন্দ করে সে আমার থেকে চার বছরের ছোট আমি তার থেকে বড়। আমি ও তাকে পছন্দ করি। তারপর দুই ফেমিলিকে বিষয়টা জানানো হইসে যে আমিও তাকে পছন্দ করি সেও আমাকে পছন্দ করে।কিন্তু দুই ফেমিলির এক ফেমিলিও বিয়ের জন্য রাজি হচ্ছে না। আমি বহুবার বলসি আমার বাসায় সেও বহুবার বলসে তার বাসায়।কিন্তু রাজি হচ্ছেনা।সে গত ১৬ তারিখ চিল্লায় গিয়েছে। ওখানে গিয়ে ওনাদের খেদমতের থেকে এক হুজুরের সাথে মাশওয়ারা করসে আমার আর তার ব্যাপারে সব কিছু বলসে সেই হুজুর নাকি তাকে বলেছে যদি রাজি না হয় হারাম থেকে বাঁচতে চাও তাহলে পালায় বিয়ে করতে হুজুর নাকি বিয়ে করিয়ে দিবে। কিন্তু আমি পড়েছি যে আমাদের নবীজি বলেছেন মেয়েদের অভিভাবক ছাড়া বিয়ে করা জায়েজ হবে না।এখন আমার জন্য করনীয় কি? সে আমার সাথে কথা বলা ছাড়া থাকতে পারবে না দেখা করা ছাড়া থাকতে পারবে না। এখন আমি কি করতে পারি একটু যদি বলতেন? মিন ফাদল্বিক

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
উত্তর:

প্রিয় প্রশ্নকারী বোন, আপনার আবেগ ও বাস্তব অবস্থা বুঝতে পারছি। তবে ইসলামী শরিয়তের আলোকে বিবাহের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে, যা মানা জরুরি। নিচে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:

১. অভিভাবক ছাড়া বিবাহের বিধান (হানাফি মাজহাব)

আপনি ঠিকই পড়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"لا نكاح إلا بولي"
অর্থ: "অভিভাবক ছাড়া কোনো বিবাহ নেই" (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)।

হানাফি মাজহাবের ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতানুসারে, প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মেয়ে নিজে বিবাহ পড়ালে তা যদি সমকক্ষ কেউ হয় এবং অভিভাবক আপত্তি না করে তাহলে বিবাহ সহীহ হয়। তবে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) এবং ঝগড়া-বিবাদের কারণ হয়। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, অভিভাবকের অনুমতি শর্ত, তাই সব হানাফি ফকিহদের মতে অভিভাবক ছাড়া বিবাহ জায়েজ নয় এবং যদি কেউ পালিয়ে বিয়ে করে, তাহলে তা ফেতনা ও অনৈতিকতার দিকে নিয়ে যায়।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/২৮০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮)

২. ‘পালিয়ে বিয়ে’র প্রস্তাব কেন ভুল?

আপনার সাথে কথা বলা ছেলেটিকে যে হুজুর বলেছেন "পালিয়ে বিয়ে করতে", তা শরিয়তসম্মত নয়। কারণ:

  • এতে অভিভাবকের অধিকার লঙ্ঘন হয়।
  • সমাজে অশান্তি ও কলঙ্ক সৃষ্টি হয়।
  • ভবিষ্যতে এই বিবাহ সহীহ হলেও পরিবারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয় এবং বৈবাহিক জীবন অশান্তিময় হয়।
  • রাসূল (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল" (তিরমিজি, হাদিস: ১১০১)।

৩. আপনার করণীয় কী?

ক. ধৈর্য ও দোয়া:
দুই পরিবার যদি রাজি না হয়, তাহলে জোরাজুরি না করে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যে তিনি ভালোবাসাকে হালাল পথে পরিণত করুন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন" (সূরা আনফাল: ৪৬)।

খ. পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যান:
-"আমরা দুজন পছন্দ করি, কিন্তু হারাম সম্পর্ক থেকে বাঁচতে চাই" - এই কথাটি নরম ভাষায় পরিবারকে বোঝান।
-বিবাহের জন্য ছেলেটির দ্বীনদারি ও চরিত্রের প্রশংসা করুন।
-একজন বিজ্ঞ আলেম বা পরিবারের মান্যবর ব্যক্তিকে মধ্যস্থতা করতে বলুন।

গ. হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকুন:
যেহেতু বিয়ে হচ্ছে না, তাই দেখা-সাক্ষাৎ, একান্তে কথা বলা, ফোনে গভীর আলাপ ইত্যাদি হারাম। রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন কোনো অপরিচিত (নামাহরাম) নারীর সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ না করে। কারণ তৃতীয়জন থাকে শয়তান" (তিরমিজি)।

ঘ. বিচ্ছিন্নতা অপরিহার্য:
যদি বিয়ে সম্ভব না হয়, তাহলে সম্পর্ক ছিন্ন করা ফরজ। আপনি চাইলেও "তার সাথে কথা না বলে থাকতে পারব না" বা "দেখা না করে থাকতে পারব না" - এটি শয়তানের প্ররোচনা। প্রকৃত ভালোবাসা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে, হারাম পথে নয়। মনে রাখবেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন" (মুসনাদে আহমদ)।

৪. বিশেষ সতর্কতা

-ছেলেটির বয়স আপনার থেকে ৪ বছরের ছোট – শরিয়তে বিবাহের জন্য বয়সের ব্যবধান কোনো বাধা নয়, তবে পরিবারের সম্মতি জরুরি। -চিল্লায় গিয়ে হুজুরের কাছে পরামর্শ করাটা ভালো উদ্যোগ, কিন্তু তিনি যদি "পালিয়ে বিয়ে" বলেছেন, তাহলে সেই পরামর্শ মানবেন না। বরং অন্য কোনো বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন।

উপসংহার

পরিবারের অনুমতি ছাড়া বিবাহ জায়েজ নয়।
আপনার উচিত:
১. আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
২. পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
৩. আপাতত সম্পূর্ণ সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া।
৪. যদি পরিবার কখনো রাজি হয়, তাহলে আইনসম্মত ও শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ সম্পন্ন করা।

তদুপরি আপনারা যদি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষীর সামনে শরীয়তের বিধান মেনে ইজাব কবুল করেন, সে ক্ষেত্রে আপনারা উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকলে আপনাদের বিবাহ শরীয়াহ মোতাবেক শুদ্ধ হয়ে যাবে।

আল্লাহ আপনাদের উভয়কে হালাল পথের তাওফিক দান করুন এবং পরিবারের মন গলিয়ে দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.