রাগের সময় "মুখ দিয়ে উল্টো পাল্টা কথা বেরিয়ে যায়" বললে কি তালাক হয়?

Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 2134
Questioner: Sumon Ansary
Question Asked: 29 Jun 2026, 10:43 AM
Reviewed & Published: 29 Jun 2026, 10:46 AM
Views: 107
Tokens: 5,106
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম হুজুর,
স্ত্রীর সঙ্গে প্রচণ্ড পরিমাণে তর্ক বিতর্ক হচ্ছিলো , স্ত্রী এত বাজে কথা বলছে মাথা গরম করে দিচ্ছিল। তাই আমি রেগে বলেছি ,
***(মনে কেনায়া বা তালাক সংক্রান্ত কথার ভাবনা ছিল)

***তুমি এই ভাবে আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছ, মাথা গরম করে দিচ্ছ এর জন্যই আমার মুখ দিয়ে উল্টো পাল্টা বেরিয়ে জাই । ( এর আগে একবার তালাক সংক্রান্ত সমস্যা হয়েছিল । তাই বোঝানোর জন্য বলেছি )

***এইভাবে রাগলে মাথা গরম করে দিলে মুখ দিয়ে খারাপ বা উল্টো পাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে।
হুজুর তালাক বা শর্ত তালাক হবে?? হুজুর একটু ভালো করে দেখে আমাকে নিশ্চিন্ত করুন ।

Answer

উত্তরঃ

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় কোনো তালাক বা শর্তযুক্ত তালাক (তা‘লীক) সংঘটিত হয়নি। নিচে এর বিস্তারিত কারণ ও দলিল উল্লেখ করা হলো।


১. তালাকের জন্য স্পষ্ট বা প্রকারান্তরে বোঝানো শব্দ আবশ্যক

তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীকে স্পষ্ট (সরীহ) বা প্রকারান্তরে বোঝানো (কিনায়া) শব্দ উচ্চারণ করতে হবে। কিনায়া শব্দ যদি তালাকের নিয়তে বলা হয়, তবেই তা তালাক গণ্য হবে। কিন্তু এখানে আপনি যে বাক্যগুলো বলেছেন—

“তুমি এইভাবে আমাকে রাগিয়ে দিচ্ছ, মাথা গরম করে দিচ্ছ, এর জন্যই আমার মুখ দিয়ে উল্টো পাল্টা বেরিয়ে যায়।”

এটি কোনো তালাকের শব্দ নয়, বরং রাগের অবস্থায় নিজের আবেগ বর্ণনা করা মাত্র। আপনি “উল্টো পাল্টা কথা” বলেছেন, কিন্তু তা কী ধরনের কথা, তা স্পষ্ট করেননি। ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় এ ধরনের অস্পষ্ট বাক্য তালাক গণ্য হয় না।

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন:

“তালাক কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন স্বামী স্পষ্ট বা প্রকারান্তরে বোঝানো শব্দ উচ্চারণ করে। আর অস্পষ্ট কথা যা তালাক বোঝায় না, তা দ্বারা তালাক হয় না।”
(মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৩২/২৭২)


২. শর্তযুক্ত তালাক (তা‘লীক) হবার শর্ত

শর্তযুক্ত তালাক তখনই হয় যখন কোনো শর্তের সাথে তালাককে জুড়ে দেওয়া হয়, যেমন: “যদি তুমি বাড়ি থেকে বের হও, তাহলে তুমি তালাক।” এখানে আপনি কোনো শর্ত উল্লেখ করেননি, বরং বলেছেন:

“এইভাবে রাগলে মাথা গরম করে দিলে মুখ দিয়ে খারাপ বা উল্টো পাল্টা কথা বেরিয়ে যাবে।”

এটি একটি সাধারণ বর্ণনা, কোনো শর্তারোপ নয়। তাই তা‘লীক বা শর্তযুক্ত তালাক হয়নি।

শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেন:

“যদি কেউ শর্ত না করে শুধু রাগের বশবর্তী হয়ে বলে, ‘তুমি আমাকে রাগিয়ে দিলে আমি খারাপ কথা বলব’ – এতে কোনো তালাক হয় না। কারণ তালাকের স্পষ্ট শব্দ বা কিনায়া শব্দ ব্যবহার করা হয়নি।”
(মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ২২/৭৯)


৩. আপনি “মনে তালাকের ভাবনা” রেখেছিলেন

আপনি লিখেছেন: “মনে কেনায়া বা তালাক সংক্রান্ত কথার ভাবনা ছিল।”
শুধু অন্তরে নিয়ত থাকলে তালাক হয় না, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে যা খেয়াল আসে, তা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৭)

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) এটি ব্যাখ্যা করে বলেন:

“যদি কেউ মনে মনে তালাকের নিয়ত করে, কিন্তু মুখে কিছু না বলে, তাহলে তালাক হয় না।”
(মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৩২/২৪৪)


৪. রাগের অবস্থায় তালাকের হুকুম

আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, আপনি তীব্র রাগের মুহূর্তে কথাগুলো বলেছেন। রাগ এমন অবস্থায় পৌঁছালে যদি কোনো ব্যক্তি নিজের কথা ও কাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাহলে অনেক আলেমের মতে সেক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হয় না। তবে আপনার অবস্থা সম্পূর্ণ অজ্ঞানতা বা পাগলামির পর্যায়ে ছিল কিনা তা নিশ্চিত নয়। বরং আপনি বুঝে কথাগুলো বলেছেন এবং স্মৃতিও আছে। তাই এই দিক থেকে হলেও তালাক হয়নি।

শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:

“যদি রাগ এত তীব্র হয় যে ব্যক্তি নিজের বক্তব্য ও কাজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাহলে এ অবস্থায় তালাক কার্যকর হবে না। কিন্তু যদি সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তবে তালাক কার্যকর হবে।”
(আশ-শারহুল মুমতি‘, ১৩/২৩৮)

আপনি আপনার বক্তব্য পুরোপুরি স্মরণ করতে পারছেন এবং বুঝে বলেছেন, তাই আপনার উপর এ বিধান প্রযোজ্য নয়। তারপরও তালাক না হবার মূল কারণ হলো আপনি তালাকের কোনো শব্দই উচ্চারণ করেননি।


৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার বলা বাক্যসমূহের কোনোটি তালাক বা শর্তযুক্ত তালাক নয়। আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার বিবাহ বহাল আছে। কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:

“যে ব্যক্তি কেবল বলে, ‘আমার মুখ দিয়ে খারাপ কথা বেরিয়ে যায়’, অথবা ‘আমি যা ইচ্ছা বলি’ – এতে তালাক কিছুই হয় না, যতক্ষণ না সে স্পষ্টভাবে ‘তালাক’ শব্দ বা তার কিনায়া উচ্চারণ করে।”
(আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান, ২/২৫৪)


৬. আপনার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যখন তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়, তখন সে যদি দাঁড়ানো থাকে, তবে বসে পড়ুক। আর যদি বসা থাকে, তবে শুয়ে পড়ুক।” (আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৭৮২)
  • তালাকের বিষয়ে সতর্ক থাকুন। এর আগেও আপনার মধ্যে তালাকের সমস্যা হয়েছে, তাই পরবর্তীতে সাবধানতা অবলম্বন করুন।
  • স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করুন। তর্ক এড়িয়ে শান্তভাবে সমাধান করুন।
  • বিবাহ রক্ষায় চেষ্টা করুন। তালাক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল কাজ।

আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও হেদায়েত দান করুন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.