কা‘ব বিন আশরাফ হত্যার ঘটনার ফিকহী শিক্ষা কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নে উল্লেখিত কা‘ব বিন আশরাফ এর ঘটনা (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪০৩৭) হতে ফুকাহায়ে কিরাম ও মুহাদ্দিসীন যে মাসআলা গ্রহণ করেছেন, তা মূলত জিহাদের ক্ষেত্রে ছলনা ও কৌশল অবলম্বনের বৈধতা সংক্রান্ত। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, শত্রুর ক্ষতি করা বা ইসলামের শত্রুকে নিঃশেষ করার জন্য প্রতারণা ও ধোঁকা দেওয়া জায়েয। রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন এবং বলেছেন: “যুদ্ধ হলো প্রতারণা।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৩৯)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফী ইমামদের মতে, জিহাদের ময়দানে কাফিরদের বিরুদ্ধে যে কোনো বৈধ কৌশল (যেমন: মিথ্যা আশ্বাস, গোপনে আক্রমণ, নিজের শক্তি গোপন রাখা) অবলম্বন করা জায়েয। তবে এখানে কুফর গ্রহণ করা বা কুফরী কালেমা বলা কোনো অনুমতি নেই। কারণ কুফর গ্রহণ করা কুফরী, এবং ইখতিয়ার (স্বেচ্ছায়) অবস্থায় তা কখনো জায়েয নয়।
মূল মাসআলা: কেবল জিহাদের ক্ষেত্রে, নাকি সর্বত্র?
উক্ত ঘটনা থেকে গৃহীত মাসআলা শুধুমাত্র জিহাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ উম্মতের উপকার বা কুফরের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য কুফর গ্রহণ করার অনুমতি এটি নয়। বরং, কুফর থেকে বাঁচার জন্য তাকিয়্যা (প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাহ্যিকভাবে কুফরী শব্দ বলা) শুধুমাত্র জোরপূর্বক অবস্থায় (ইকরাহ) জায়েয, তবে তা শর্তসাপেক্ষে এবং অন্তর ঈমানের উপর স্থির থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন:
مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ “যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরী করে—তবে যে বাধ্য হয় (জোরপূর্বক) এবং তার অন্তর ঈমানে প্রশান্ত—তা ভিন্ন।” (সূরা আন-নাহল ১৬:১০৬)
হানাফী ফিকহের বিস্তারিত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার এবং ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে যে, জোরপূর্বক অবস্থায় প্রাণ রক্ষার জন্য কুফরী শব্দ বলা জায়েয, কিন্তু তা শুধুমাত্র সীমিত পরিস্থিতিতে। আর স্বেচ্ছায় উম্মতের সাধারণ উপকারের জন্য কুফরী করা কখনো জায়েয নয়।
কা‘ব বিন আশরাফের ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় মাসআলা:
১. জিহাদে ছলনা ও কৌশল বৈধ। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩০২৮; সহীহ মুসলিম ১৭৩৯) ২. ইসলামের প্রকাশ্য শত্রুকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পদ্ধতি অবলম্বন করা জায়েয। ৩. এই ঘটনা থেকে তাকিয়্যা বা কুফর গ্রহণের বৈধতা প্রমাণিত হয় না। বরং এটি একটি বিশেষ পরিস্থিতি যেখানে সাহাবীরা কা‘ব বিন আশরাফের নিকট বন্ধুত্বের ভান করেছিলেন, কিন্তু তারা কখনো ইসলাম ত্যাগ করেননি বা কুফরী কথা বলেননি।
সারসংক্ষেপ:
- কা‘ব বিন আশরাফের ঘটনা থেকে গৃহীত মাসআলা শুধুমাত্র জিহাদের ক্ষেত্রে ছলনা করার জন্য প্রযোজ্য।
- উম্মতের সাধারণ উপকার বা কুফরের অত্যাচার থেকে বাঁচতে কুফর গ্রহণ করার অনুমতি এটি নয়। বরং কুফরী শব্দ বলা শুধুমাত্র জোরপূর্বক অবস্থায় (ইকরাহ) এবং তাও নির্দিষ্ট শর্তে জায়েয, যা তাকিয়্যা নামে পরিচিত।
- কোনো অবস্থাতেই স্বেচ্ছায় কুফরী কথা বলা বা কুফরী ধর্ম গ্রহণ করা জায়েয নয়।
হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (كتاب السير، باب المرتد، فصل في أحكام البغاة) – ج ৬، ص ৪৩৮
- ফাতাওয়া আলমগীরী (كتاب السير، الباب السادس في أحكام أهل الحرب) – ج ২, ص ১৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (জিহাদ ও তার সম্পর্কিত বিষয়) – মুফতী আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানী (জিহাদ অধ্যায়) – মুফতী তাকী উসমানী
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)