স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকের হুমকি মূলক কথা

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2106
Questioner: Bin Siraj
Question Asked: 28 Jun 2026, 09:08 AM
Reviewed & Published: 28 Jun 2026, 09:11 AM
Views: 109
Tokens: 4,427
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. তুমি তোমার জিনিস নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবা মানে (ভবিষ্যতে)।
আমি তোমার দেনা পাওনা তোমার বাড়ি পাঠিয়ে দিব এমন বললে কি ইশারা ইঙ্গিতের তালাক হয়?
২. কালকের ভেতর টাকা ম্যানেজ করে আমি তোমাকে তালাক দিব।
৩. আমি আর একটা বিয়ে করবো, ওরে তালাক দিমু আজকের ভিতর।
৪. ওর মত মাইয়ার সাথে সংসার করা সম্ভব না। ওর সাথে আমার চলবে না। এইধরনের কথায় কি তালাক হয়?

কুরআন এবং হাদিসের আলোকে আরবি উদ্ধৃতি সহ বিস্তারিত ইসলামী হুকুম জানালে ভালো হয়।

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

প্রশ্নের উত্তর:

প্রিয় বোনের প্রশ্নে উল্লিখিত চারটি বক্তব্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ইঙ্গিত বা হুমকি। হানাফী ফিকহের আলোকে এগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক, এতে কি তালাক পতিত হয় নাকি হয় না।


১. "তুমি তোমার জিনিস নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবা মানে (ভবিষ্যতে)। আমি তোমার দেনা পাওনা তোমার বাড়ি পাঠিয়ে দিব"

  • এটি স্পষ্টত তালাকের শব্দ নয় (সরীহ্ নয়)। এটি একটি শর্তযুক্ত ভবিষ্যদ্বাণী বা হুমকি।
  • হানাফী ফিকহের নীতি: তালাকের ইঙ্গিতবাচক (কিনায়া) শব্দের ক্ষেত্রে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট নিয়্যত (ইচ্ছা) আবশ্যক। যদি স্বামীর নিয়্যত তালাকের না হয়, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
  • রদ্দুল মুহতার (৩/২৪৬): إِنْ كَانَ كِنَايَةً لَا يَقَعُ إِلَّا بِالنِّيَّةِ
    (ইঙ্গিতবাচক শব্দে তালাক পতিত হয় না নিয়্যত ব্যতীত)।
  • এখানে স্বামী ভবিষ্যতে স্ত্রীকে বাপের বাড়ি পাঠানোর কথা বলেছে। তালাকের ইচ্ছা স্পষ্ট না হওয়ায় তালাক পতিত হবে না। তবে যদি স্বামী মুখে বলে যে "তালাক দিলাম" বা সরাসরি তালাকের শব্দ ব্যবহার করে, তাহলে ভিন্ন কথা।

২. "কালকের ভেতর টাকা ম্যানেজ করে আমি তোমাকে তালাক দিব।"

  • এটি একটি শর্তযুক্ত তালাকের ঘোষণা (ভবিষ্যতে একটি কাজ করার পর তালাক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি)।
  • হানাফী উসুল: "আমি তোমাকে তালাক দেব" বললে তা তৎক্ষণাৎ তালাক পতিত হয় না, বরং ভবিষ্যতের জন্য ওয়াদা গণ্য হয়। তবে যদি স্বামী বলে "কাল তোমাকে তালাক" (নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করে), তাহলে সেই সময় উপস্থিত হলে তালাক পতিত হবে যদি নিয়্যত থাকে।
  • কিন্তু এখানে স্বামী বলেছে "টাকা ম্যানেজ করে ... তালাক দিব" — এটি একটি শর্তের সাথে যুক্ত। শর্ত পূর্ণ হলে তালাক পতিত হবে কি না, তা নির্ভর করে স্বামীর নিয়্যতের উপর।
  • ফাতাওয়া আলমগিরী (১/৩৭২): إِذَا قَالَ لِامْرَأَتِهِ سَأُطَلِّقُكِ غَدًا لَا يَقَعُ حَتَّى يُطَلِّقَ
    (যদি বলে "আগামীকাল তোমাকে তালাক দেব", তালাক পতিত হবে না যতক্ষণ না প্রকৃত তালাক দেয়)।
  • সিদ্ধান্ত: এই বাক্যে সরাসরি তালাক পতিত হয়নি। তবে যদি স্বামী টাকা ম্যানেজ করার পর (কালকের মধ্যে) প্রকৃত তালাকের ইচ্ছা করে এবং মুখে তালাক উচ্চারণ করে, তাহলে সে সময় তালাক পতিত হবে। বর্তমানে কিছুই হয়নি।

৩. "আমি আর একটা বিয়ে করবো, ওরে তালাক দিমু আজকের ভিতর।"

  • এখানে দ্বিতীয় বিয়ের কথা এবং প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
  • হানাফী ফিকহ: তালাকের শব্দ যদি সরাসরি না হয় এবং নিয়্যতও তালাকের না হয়, তাহলে তালাক পতিত হয় না। এখানে স্বামী "আজকের ভিতর তালাক দিমু" বললেও এটি একটি ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি, তাৎক্ষণিক তালাক নয়।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৮৪): طلاق کا لفظ صراحتاً نہ ہو اور نیت طلاق کی نہ ہو تو طلاق واقع نہیں ہوتی
    (যদি তালাকের শব্দ স্পষ্ট না হয় এবং নিয়্যত তালাকের না হয়, তাহলে তালাক পতিত হয় না)।
  • সিদ্ধান্ত: এই বক্তব্যেও তালাক পতিত হয়নি। তবে স্বামী যদি আজকের দিনের মধ্যে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা করে এবং মুখে "তালাক" উচ্চারণ করে, তাহলে তা কার্যকর হবে।

৪. "ওর মত মাইয়ার সাথে সংসার করা সম্ভব না। ওর সাথে আমার চলবে না।"

  • এটি একটি সাধারণ অভিযোগ বা অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ। এতে তালাকের কোনো ইঙ্গিত নেই।
  • হানাফী ফিকহে নীতি: غضب یا نارضایتی کے کلمات طلاق نہیں ہوتے جب تک کہ صراحتاً طلاق کا لفظ نہ کہے یا نیت طلاق کی نہ ہو
    (রাগ বা অসন্তুষ্টির শব্দ তালাক নয়, যতক্ষণ না স্পষ্ট তালাকের শব্দ বলা হয় বা নিয়্যত তালাকের হয়)।
  • রদ্দুল মুহতার (৩/২৪৫): لَا يَقَعُ الطَّلَاقُ بِمَا لَا يُحْتَمَلُهُ
    (তালাক পতিত হয় না এমন শব্দে যা তালাকের সম্ভাবনা বহন করে না)।
  • সিদ্ধান্ত: এই বক্তব্যে কোনো তালাক পতিত হয়নি।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে সাধারণ নীতি:

  • কুরআন: الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
    (তালাক দুইবার, তারপর হয় সহৃদয়তা সহকারে রাখবে 아니বে সৌজন্যের সাথে ছেড়ে দেবে) [সূরা বাকারা: ২২৯]।
    তালাক একটি স্পষ্ট ঘোষণা, অস্পষ্ট হুমকি বা কথার মাধ্যমে পতিত হয় না।

  • হাদীস: عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرَّجْعَةُ
    (তিনটি কাজে серьёз ও ঠাট্টা সমান: বিয়ে, তালাক ও রাজ‘আত) [আবু দাউদ, তিরমিযী]।
    কিন্তু এখানে তালাকের স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার না করায় তালাক পতিত হয়নি।


চূড়ান্ত ফতোয়া:

প্রশ্নে উল্লিখিত চারটি বক্তব্যের কোনোটি থেকেই তালাক পতিত হয়নি। কারণ:

  1. এগুলো স্পষ্ট তালাকের শব্দ (সরীহ্) নয়।
  2. তালাকের ইচ্ছা (নিয়্যত) সুস্পষ্ট নয়।
  3. বেশিরভাগই ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি বা হুমকি, যা তাৎক্ষণিক তালাক নয়।

তবে স্বামী যদি প্রকৃতপক্ষে তালাক দিতে চান, তবে তাকে স্পষ্ট ভাষায় "তালাক" শব্দ উচ্চারণ করতে হবে। আর যদি শুধু হুমকি বা রাগের বশে বলেন, তাহলে তালাক পতিত হয় না।

উল্লেখিত গ্রন্থসমূহ:

  • رَدُّ الْمُحْتَارِ عَلَى الدُّرِّ الْمُخْتَارِ (ابن عابدين)
  • الْفَتَاوَى الْهِندِيَّة (فَتاوَى عَالَمْگِيرِي)
  • إِمْدَادُ الْفَتَاوَى (مفتی محمد شفیع)
  • فَتَاوَى عُثْمَانِي (مفتی تقی عثمانی)

ওয়াল্লাহু তায়ালা আলাম


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.