নিজের উপর কৃত অত্যাচার অন্যর কাছে বর্ণনা করলে কি গিবত হবে?

Family Life · Hanafi

Question No: 2090
Questioner: Sumaiya
Question Asked: 27 Jun 2026, 05:56 PM
Reviewed & Published: 27 Jun 2026, 06:02 PM
Views: 99
Tokens: 5,209
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার আম্মু প্রায় তার সাথে করা অত্যাচার এর গল্প অর্থাৎ কষ্টের কথা বলে( আমার দাদি, ফুফু) উনার আম্মুর সাথে যে ব্যবহার করেছে বা করে এইগুলোর জন্য আম্মু অনেক কষ্ট পাই এবং আমার সাথে সেইটা share করে। এইটা কি গীবত হবে?
এবং আমার শাশুড়ি ও উনার সাথে উনার শশুর বাড়ির লোকেরা যা যা খারাপ করেছে উনি মাঝে মাঝে সেই দুঃখের কথা share করে? এইগুলো কি শুনা উচিত হবে? এইটা শুনলে কি গীবতের গুনাহ হবে? এমন অবস্থায় আমার করণীয় কী? কিংবা তাদেরকে কি বলে শান্তনা দিতে পারি?.

এছাড়া ও আমি মাঝে মধ্যে আমার স্বামীর সাথে অনেক কিছু share করে থাকি, আমাদের সাথে কে কি খারাপ করলো এইগুলো নিয়ে, স্বামীকে বলে মন হালকা হয়। স্বামীকে বললেও কি গীবতের গুনাহ হবে?

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রশ্নের বিভিন্ন অংশের উত্তর নিম্নে দেওয়া হলো। আশা করি এটি আপনার জন্য সহায়ক হবে।


১. গীবত কী?

গীবত হলো অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে—তা সত্য হলেও।
প্রমাণ:

  • কুরআন: “তোমাদের কেউ যেন কারো গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?” (সূরা হুজুরাত: ১২)
  • হাদীস: “গীবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা সে অপছন্দ করে।” (মুসলিম)

তবে কিছু বৈধ কারণে গীবত জায়েজ হয়, যেমন:

  1. নিজের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ জানানো – যাতে অন্যায়কারীর থেকে সাহায্য চাওয়া যায়।
  2. পরামর্শ নেওয়া – যেমন বিয়ে বা ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে।
  3. কারো অন্যায় প্রতিরোধ – যাতে অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
    (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫৩৪)

২. আপনার আম্মু নিজের কষ্টের কথা বললে তা কি গীবত হবে?

না, এটি গীবত হবে না যদি নিচের শর্তগুলো থাকে:

  • তিনি নিজের ওপর অত্যাচারের কথা বলছেন—অন্যায়কারীর নাম উল্লেখ না করে শুধু ঘটনা বর্ণনা করছেন।
  • উদ্দেশ্য মন হালকা করা বা সাহায্য চাওয়া—অন্যদের কাছে অত্যাচারীকে ছোট করা নয়।
  • তবে অযথা বিস্তারিত বর্ণনা বা অন্যায়কারীর নাম উল্লেখ করে অহেতুক গালাগালি করলে তা গীবত হতে পারে।

আপনার করণীয়:

  • ধৈর্য ধরে শুনুন, সহানুভূতি জানান।
  • উনাকে বলুন: “আপনার কষ্ট আমি বুঝি। আল্লাহ আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দেবেন।”
  • উনাকে ক্ষমা করার উপদেশ দিন এবং আল্লাহর কাছে প্রতিশোধ চাওয়ার তাগিদ দিন।
  • অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলে (যেমন উপদেশ দেওয়া) তা করুন।

৩. আপনার শাশুড়ি তার দুঃখের কথা শেয়ার করলে তা শোনা কি গুনাহ?

শোনা জায়েজ, তবে শর্ত সাপেক্ষে:

  • আপনি যদি শুধু সহানুভূতি জানাতে শোনেন, এবং মনে গ্লানি বা ঘৃণা পোষণ না করেন, তাহলে আপনার গুনাহ হবে না।
  • তবে যদি আপনি অন্যদের কাছে তা ছড়িয়ে দেন বা আপনার মনেও শাশুড়ির শ্বশুরবাড়ির লোকদের প্রতি বিদ্বেষ জন্মায়, তবে তা গীবতের অংশে গণ্য হবে।

আপনার করণীয়:

  • শুনুন, কিন্তু বিশ্বাস না করেই (কেননা একপক্ষের কথা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়)।
  • উনাকে বলুন: “আপনার কষ্টের জন্য আমি দুঃখিত। আল্লাহর কাছে ধৈর্যের প্রতিদান চাই।”
  • উনাকে ইসলাহের পরামর্শ দিন—যেমন সরাসরি সংশ্লিষ্টদের সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করা।

হাদীসের নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের গীবত শোনে এবং তা প্রতিরোধ করে না, সে নিজেও গীবতের অংশীদার হয়।” (মুসনাদে আহমদ)
তাই যদি গীবত হয় (অর্থাৎ অযথা কারো দোষ বর্ণনা), তাহলে শুনবেন না বা বাধা দিন


৪. আপনি নিজে স্বামীর কাছে অন্যদের খারাপ ব্যবহারের কথা বললে কি গীবত হবে?

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক গোপনীয়তা ভাগাভাগি সাধারণত গীবতের আওতায় পড়ে না যদি:

  • উদ্দেশ্য মন হালকা করা বা পরামর্শ নেওয়া হয়।
  • আপনি অন্যায়কারীর নাম উল্লেখ করে তাকে ছোট করার জন্য না বলেন।
  • আপনি শুধু ঘটনা বর্ণনা করেন—অতিরঞ্জন বা গালি না দেন।

শর্ত:

  • স্বামীও গোপন রাখবেন—অন্য কাউকে তা বলবেন না।
  • যদি স্বামী সেই ব্যক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট হন (যেমন শ্বশুর-শাশুড়ি), তবে সতর্ক থাকুন—যাতে সম্পর্ক নষ্ট না হয়।

ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মত:
“যদি কেউ নিজের ওপর জুলুমের অভিযোগ জানাতে বলে, তবে তা গীবত নয়।” (শরহু মাআনিল আছার)

তবে উত্তম হলো বেশি না বলা এবং ধৈর্যের সাথে বিষয়টি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা। ইমাম গাযযালী বলেন: “যে ব্যক্তি অন্যের অন্যায় সম্পর্কে শুধু এতটুকু বলে যতটুকু তার সমস্যা সমাধানের জন্য জরুরি, সে গুনাহগার হবে না।” (ইহইয়া উলুমিদ্দীন)

আপনার করণীয়:

  • স্বামীকে বলার পর মন হালকা হলে শুকরিয়া আদায় করুন।
  • তবে ক্ষতিকর আলোচনা বা অহেতুক বদনাম থেকে বিরত থাকুন।
  • স্বামীর সাথে গীবত করে ফেললে তওবা করুন এবং নিজেকে সংযত করুন।

৫. সাধারণ উপদেশ ও শান্তনার দোয়া

আপনার আম্মু ও শাশুড়িকে আপনি নিচের কথাগুলো বলতে পারেন:

  • “আল্লাহ বলেন: ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তার সাথে আছেন।’ (সূরা বাকারা: ১৫৩)
  • “আপনার প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ জান্নাতে নেকি দেবেন।”
  • “রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি অত্যাচার সহ্য করে এবং আল্লাহর কাছে প্রতিশোধ চায়, আল্লাহ তার প্রতিশোধ নেন।’ (মুসলিম)”
  • “আমি আপনার জন্য দুআ করি—আল্লাহ যেন আপনার শত্রুর হৃদয় নরম করেন।”

আপনার জন্য দুআ:
“হে আল্লাহ, আমার আম্মু ও শাশুড়ির কষ্ট দূর করুন। তাদের ধৈর্যের বিনিময়ে জান্নাত দান করুন। আর আমার মুখ ও কানকে গীবত থেকে হেফাজত করুন।”


৬. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া

| পরিস্থিতি | গীবত হবে কি? | করণীয় | |--------------|-----------------|-----------| | আম্মু নিজের কষ্টের কথা বলেন | না, যদি উদ্দেশ্য সহানুভূতি লাভ হয় | শুনে সান্ত্বনা দিন, ক্ষমা করতে উৎসাহ দিন | | শাশুড়ি নিজের কষ্টের কথা বলেন | না, যদি আপনি না ছড়ান | ধৈর্য সহকারে শুনুন, গীবত হলে বাধা দিন | | আপনি স্বামীকে অপরের খারাপ ব্যবহারের কথা বলেন | জায়েজ, যদি পরামর্শ বা মন হালকা করার জন্য হয় | অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত এড়িয়ে চলুন |


৭. গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের রেফারেন্স

  • রদ্দুল মুহতার: গীবতের ব্যতিক্রম হিসেবে অত্যাচারের অভিযোগ উল্লেখ আছে।
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): গীবতের সংজ্ঞা ও ব্যতিক্রম বিশদে বর্ণিত।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): গীবত শ্রবণকারীর দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা।
  • বেহেশতী জেওর: গীবত সম্পর্কিত ব্যবহারিক নির্দেশনা।

মোটকথা: আপনি যদি শুধু সহানুভূতি জানান এবং নিজে গীবত না ছড়ান, তবে আপনার গুনাহ হবে না। তবে সর্বোত্তম হলো ক্ষমা ও দুআ—যেমন আল্লাহ বলেন: “ক্ষমা করো, আল্লাহ ক্ষমাশীল।” (সূরা নূর: ২২)

و الله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.