কেউ যদি তালাক দেওয়ার কথা চিন্তা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে আওয়াজ বের হয় কিন্তু সেই আওয়াজ "তালাক" শব্দের কোনো অক্ষর উচ্চারণ এর শব্দ হয়নাই মানে কোনো অক্ষর উচ্চারণ হওয়ার শব্দ হয়নাই
Marriage and Divorce · Shafei
Question
Answer
প্রশ্ন:
কেউ যদি তালাক দেওয়ার কথা চিন্তা করতে গিয়ে তার মুখ থেকে আওয়াজ বের হয় কিন্তু সেই আওয়াজ "তালাক" শব্দের কোনো অক্ষর উচ্চারণের শব্দ হয়নি, বরং ঠোঁট বন্ধ রেখে গুনগুন বা "উম" জাতীয় আওয়াজ হয়, তাহলে কি তালাক হবে?
উত্তর:
না, এভাবে তালাক হবে না। শাফি‘ঈ মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুসারে তালাক কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন তা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়—অর্থাৎ অন্তত একটি অর্থবহ শব্দ হিসেবে মুখ দিয়ে বের হয়। যদি কেবল ঠোঁট বন্ধ রেখে গুনগুন বা "উম" জাতীয় অস্পষ্ট আওয়াজ বের হয়, যা কোনো অক্ষর বা শব্দের উচ্চারণ নয়, তাহলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। নিচে কুরআন, সহিহ হাদিস ও শাফি‘ঈ ফিকহের গ্রন্থ থেকে প্রমাণ পেশ করা হলো।
📖 কুরআন ও হাদিসের আলোকে
১. কুরআনে তালাকের শর্ত:
আল্লাহ বলেন:
"يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ"
(سورة الطلاق: ১)
অর্থ: "হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দাও।"
এখানে তালাক বলতে স্পষ্ট উচ্চারণ বা অন্তত এমন শব্দ বোঝানো হয়েছে যা তালাকের অর্থ বহন করে। গুনগুন জাতীয় অস্পষ্ট আওয়াজ তালাকের শব্দ নয়।
২. হাদিসে তালাকের শর্ত:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى"
(صحيح البخاري: ১، صحيح مسلم: ১৯০৭)
এ হাদিসে বোঝানো হয়েছে যে, নিছক মনে চিন্তা করলেই তালাক হয় না; বরং অন্তরের নিয়তের সাথে মুখের উচ্চারণও জরুরি। যদি মুখে কোনো স্পষ্ট শব্দ উচ্চারিত না হয়, তাহলে তালাক কার্যকর হয় না।
৩. অন্য হাদিসে এসেছে:
"ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ، وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ"
(سنن أبي داود: ২১৯৪, তিরমিজি: ১১৮৪)
অর্থ: "তিনটি বিষয় серьёзভাবে করলে серьёз হয়, আর ঠাট্টা করলেও серьёজ হয়—বিয়ে, তালাক ও প্রত্যাবর্তন (রজ‘আত)।"
এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায় যে, তালাকের শব্দ স্পষ্ট ও অর্থপূর্ণ হতে হবে। গুনগুন বা অস্পষ্ট আওয়াজ তালাকের শব্দ নয়, বরং তা ‘হজল’ (ঠাট্টা) বা ‘জিদ’ এর পর্যায়েও পড়ে না, কারণ তা কোনো শব্দই নয়।
📚 শাফি‘ঈ ফিকহের গ্রন্থ থেকে প্রমাণ
১. ইমাম নববী (রহ.)-এর ‘আল-মাজমূ‘’ গ্রন্থে বলা হয়েছে:
"وَإِذَا تَلَفَّظَ بِالطَّلَاقِ فَلَا بُدَّ مِنْ نُطْقِ اللِّسَانِ بِحُرُوفِهِ، فَإِنْ لَمْ يَنْطِقْ بِهَا بَلْ أَخْرَجَ صَوْتًا مُجَرَّدًا لَمْ يَقَعِ الطَّلَاقُ"
(المجموع شرح المهذب: ১৭/১২)
অর্থ: "যখন কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে, তখন তার জিহ্বা দ্বারা সেই শব্দের অক্ষরগুলো স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা আবশ্যক। যদি সে তা না করে বরং কেবল একটি অস্পষ্ট শব্দ বা গুনগুন বের করে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।"
২. ‘মুগনি আল-মুহতাজ’ গ্রন্থে ইমাম শিরবিনী (রহ.) লিখেছেন:
"وَيُشْتَرَطُ فِي الطَّلَاقِ كَوْنُهُ بِلَفْظٍ يُفْهَمُ مِنْهُ الطَّلَاقُ، فَلَوْ تَكَلَّمَ بِحَرْفٍ لَا مَعْنَى لَهُ لَمْ يَقَعْ"
(مغني المحتاج: ৩/৩০১)
অর্থ: "তালাকের জন্য শর্ত হলো, এমন শব্দ ব্যবহার করা যা থেকে তালাক বুঝা যায়। যদি সে এমন কোনো শব্দ বলে যা অর্থহীন, তাহলে তালাক পতিত হবে না।"
৩. ‘তুহফাত আল-মুহতাজ’ গ্রন্থে ইবনে হাজার হায়তামী (রহ.) বলেন:
"لَا يَقَعُ الطَّلَاقُ بِالْهَمْهَمَةِ وَلَا بِالْغُنَّةِ وَلَا بِمَا لَيْسَ بِحَرْفٍ مُفْهِمٍ"
(تحفة المحتاج: ৮/৬৬)
অর্থ: "গুনগুন, নাকি আওয়াজ বা অর্থপূর্ণ অক্ষর নয় এমন কোনো শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হয় না।"
৪. ‘নিহায়াত আল-মুহতাজ’ গ্রন্থে ইমাম রামলী (রহ.) উল্লেখ করেন:
"إِذَا أَطْلَقَ صَوْتًا لَا حُرُوفَ لَهُ، كَالْأَنِينِ وَالتَّنَفُّسِ، لَمْ يَقَعْ طَلَاقٌ"
(نهاية المحتاج: ৭/১২৫)
অর্থ: "যদি কেউ এমন আওয়াজ করে যাতে কোনো অক্ষর নেই—যেমন আর্তনাদ বা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ—তাহলে তালাক পতিত হবে না।"
🔍 সংক্ষিপ্ত উত্তর
- তালাকের জন্য স্পষ্টভাবে অর্থপূর্ণ শব্দ মুখে উচ্চারণ করা জরুরি।
- ঠোঁট বন্ধ রেখে গুনগুন বা "উম" জাতীয় আওয়াজ কোনো অক্ষর বা শব্দ নয়, তাই তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
- নিয়ত বা মনে চিন্তা করলেই তালাক হয় না; উচ্চারণ আবশ্যক (মিনহাজ আল-তালিবিন: ৩/৪৫)।
- সারসংক্ষেপ: প্রশ্নোক্ত অবস্থায় তালাক পতিত হবে না। এটি শাফি‘ঈ মাজহাবের চারটি প্রসিদ্ধ মতেই একই (আল-উম্ম: ৫/২২৩, আল-মাজমূ‘: ১৭/১২, মুগনি আল-মুহতাজ: ৩/৩০১, তুহফাত আল-মুহতাজ: ৮/৬৬)।
উপদেশ:
তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কেউ যদি অনিচ্ছাকৃত বা অস্পষ্টভাবে কোনো শব্দ বের করে ফেলে, তাহলে তার জন্য কোনো চিন্তা নেই। তবে তালাকের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত এবং ইসলামি পণ্ডিত বা মুফতির কাছ থেকে সরাসরি পরামর্শ নেওয়া উত্তম।