এক স্ত্রী তার স্বামীর গুনাহ, খোরপোষ না দেওয়া ও প্রতারণার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত,এমতাবস্থায় তালাক দেওয়ার বিধান ও করণীয় জানুন
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
সে বলে আমি তোমার সাথে ভালব্যবহার করি হক পালন করলেই হলো।বাকি আমি যা করি তোমার অত দেখতে হবেনা।
কিন্তু সে আমাকে ইসলামিকভাবে সবসময় রাখতে চায়।আমি উলটাপাল্টা কিছু করলে রাগ হয়।
এখন তার এসব আচরনে আমি মানসিক ট্রমাটাইজ হয়ে যাচ্ছি।
উল্লেখ্য সে আমাকে কোন খরচপাতি দেয়না। সবকিছু আমার মা চালায়।
একন এমন অবস্তায় কি করনীয়?
ডির্ভোস দিবো?
আমার ভয় হয় বেকার অবস্তা চলে গেলে সে জব লাইফে যেয়ে পরকিয়া না করে
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الجواب: وبالله التوفيق
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তা সত্যিই কষ্টদায়ক। নিম্নে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
প্রথমত: স্বামীর দায়িত্ব ও আপনার অধিকার
ইসলামে স্বামীর ওপর স্ত্রীর বহু অধিকার রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি মৌলিক অধিকার হলো:
-
ভরণপোষণ (খোরপোষ) : স্বামী চাকরিজীবী হোক বা বেকার, তার সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ফরজ। (সূরা আত-তালাক: ৭; আল-হিদায়া, ২/৩৩৪)
আপনার স্বামী কোনো খরচ দিচ্ছেন না, অথচ আপনার মা তা বহন করছেন—এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি যদি সামর্থ্যবান না হন, তাহলেও অন্তত কিছু দেওয়ার চেষ্টা করবেন। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দেন না, তবে তিনি গুনাহগার। -
সুন্দর ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার : আল্লাহ বলেন, “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।” (সূরা আন-নিসা: ১৯)
আপনার স্বামী নিজে গুনাহে লিপ্ত থেকে আপনাকে ইসলামিকভাবে চলতে বাধ্য করছেন—এটি চরম অসংগতি। তার উচিত নিজে সংশোধন হওয়া। -
গোপনীয়তা ও বিশ্বাস : বিয়ের আগে গুরুতর বিষয় (যেমন মারাত্মক রোগ, পাপাচার) গোপন করা ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “প্রতারক আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১)
আপনি বিয়ের পর যেসব বিষয় জানতে পেরেছেন (যেমন: শারীরিক সম্পর্কের পূর্ব অভিজ্ঞতা, সিগারেট, কিডনি রোগ ইত্যাদি), সেগুলো ইচ্ছাকৃত গোপন রাখা আপনার অধিকার লঙ্ঘন করেছে।
দ্বিতীয়ত: স্বামীর বর্তমান গুনাহসমূহ
আপনার স্বামী বর্তমানে যেসব পাপ করছেন (যেমন: পর্ণোগ্রাফি দেখা, নন-মাহরাম নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক, গান-সিনেমা, সিগারেট, বাজে সঙ্গ ইত্যাদি)—এগুলো সবই কবিরা গুনাহ। তবে তিনি যদি শারীরিক অবৈধ সম্পর্ক না করে থাকেন, তবুও এগুলো মারাত্মক।
- পর্ণোগ্রাফি দেখা জিহ্বা ও চোখের জিনা। (সহীহ বুখারি, হাদীস: ৬২৪৩)
- নারী দেখা ও ফেসবুকে সময় নষ্ট করা গুনাহের মাধ্যম।
- গান শোনা হারাম। (সূরা লুকমান: ৬)
- সিগারেট অধিকাংশ আলেমের মতে মাকরুহে তাহরিমি বা নাজায়েজ।
তার এই আচরণ আপনার জন্য মানসিক কষ্টের কারণ। ইসলাম স্ত্রীকে এমন স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে বাধ্য করে না যা তার দীন ও দুনিয়ার ক্ষতি করে।
তৃতীয়ত: ডিভোর্স (তালাক) দেওয়ার বিধান
আপনার প্রশ্ন—ডিভোর্স দেবেন কি না? এটি নির্ভর করে নিম্নলিখিত বিষয়ের ওপর:
ক. খোরপোষ না দেওয়া:
হানাফি মতে, স্বামী যদি তিন দিনের বেশি ইচ্ছাকৃতভাবে খোরপোষ না দেয়, তাহলে স্ত্রী কাযির (ইসলামি বিচারক) কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের দাবি করতে পারেন। যদি কোনো কাযি না থাকে, তাহলে স্থানীয় আলেমদের মাধ্যমে সালিশ ও পরে বিবাহ বিচ্ছেদ বৈধ। (ফাতাওয়া শামী, ৩/৫৬৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৪৭)
যেহেতু আপনার স্বামী বেকার, তাই তিনি হয়তো খোরপোষ দিতে অক্ষম। কিন্তু যদি তাকে চাকরি বা আয়ের ব্যবস্থা করতে বলা হয় এবং তিনি না মানেন, তবে আপনার জন্য খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ) নেওয়ার সুযোগ আছে।
খ. গোপন ত্রুটি ও প্রতারণা:
বিয়ের আগে স্বামীর গুরুতর রোগ (যেমন কিডনি রোগ) বা পাপাচার গোপন করলে, স্ত্রী এটিকে ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। হানাফি ফিকহে “আইব” (ত্রুটি) এর মধ্যে কিছু রোগ (যেমন কুষ্ঠ, উন্মাদনা, যৌন অক্ষমতা) অন্তর্ভুক্ত। তবে কিডনি রোগ অন্যান্য আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলে তা “দারার” (ক্ষতি) হিসেবে গণ্য হতে পারে। আপনার ক্ষেত্রে আপনি আগেই ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাই এটি এখন প্রধান দলিল নয়।
গ. দারার (ক্ষতি) ও নিঃশ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ:
আপনার স্বামীর পাপাচার, আপনাকে ইসলামিক জামা পরানোর নামে জোরাজুরি, তার নিজের পাপাচার লুকিয়ে রাখা—এগুলো ‘দারার’ (ক্ষতি) হিসেবে গণ্য। হানাফি ফিকহে স্ত্রী যদি স্বামীর কারণে দীনের ওপর বা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে সে খুলা বা ফাসখ (বিচ্ছেদ) চাইতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫১)
ঘ. নাবালেগির কারণে:
স্বামী বেকার হলেও তিনি প্রাপ্তবয়স্ক। বেকারত্ব তালাকের বৈধ কারণ নয়, তবে খোরপোষ দিতে না পারলে বিচ্ছেদ জায়েজ।
চতুর্থত: কী করণীয়?
১. সর্বপ্রথম ধৈর্য ও দোয়া: আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন। স্বামীকে নরম ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যান। তিনি দিন দিন উন্নতি করছেন বললে আশা রাখুন।
২. পরিবার ও বিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন: আপনার পরিবার ও স্বামীর পরিবারের সিনিয়র সদস্যদের মধ্যস্থতা করুন। স্থানীয় একজন মুফতি বা ইমামের সঙ্গে কথা বলুন, যিনি স্বামীকে দ্বীনের দিকে আহ্বান করবেন।
৩. খোরপোষের দাবি: তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিন, আপনি তার খোরপোষ ছাড়া নিজের মায়ের ওপর বোঝা হতে চান না। যদি তিনি দিতে না পারেন, তাহলে তাকে চাকরি খোঁজার জন্য সময় দিন (যেমন ৩-৬ মাস)।
৪. যদি কোনো উন্নতি না হয়:
- আপনি নিজে খুলা নিতে পারেন। এজন্য আপনাকে মোহরানা বা কিছু অর্থ ফিরিয়ে দিতে হবে (যদি মোহর ইতিমধ্যে পরিশোধিত হয়ে থাকে)।
- অথবা দ্বিতীয় উপায় হলো ফাসখ (আলেম বা ইসলামি বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ)।
- আপনার জন্য তালাক দেওয়ার অধিকার নেই (স্বামী তালাক দেয়), তবে আপনি স্বামীকে তালাক দিতে বলতে পারেন। তিনি রাজি না হলে উপরের পদ্ধতি অবলম্বন করুন।
৫. শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন:
যদি তার আচরণ আপনার মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে ফেলে এবং আপনি ট্রমাটাইজড হয়ে যান, তাহলে তাকে পুনরায় বোঝান। যদি তিনি পরিবর্তন না হন, তাহলে বিচ্ছেদ নেওয়া জায়েজ।
শেষ কথা
আপনার ভয় “বেকার অবস্থা চলে গেলে সে চাকরি করে পরকিয়া করবে”—এটি ভবিষ্যতের ধারণা মাত্র। বর্তমান বাস্তবতায় তিনি খোরপোষ দিচ্ছেন না এবং ক্রমাগত পাপ করছেন। তাই আপনি এখনই ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, তালাক আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হালাল (আবু দাউদ, হাদীস: ২১৭৮), কিন্তু যখন দাম্পত্য জীবন অচল ও নির্যাতনমূলক হয়, তখন বিচ্ছেদই উত্তম।
সুপারিশ:
- প্রথমত, আপনি যদি তাকে ভালোবাসেন ও সংসার টিকিয়ে রাখতে চান, তাহলে দ্বীনি পরিবেশে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন। তাকে ইমাম বা আলেমের সঙ্গে বসার ব্যবস্থা করুন।
- যদি তিন মাসের মধ্যে কোনো পরিবর্তন না হয় এবং আপনি আর সামলাতে না পারেন, তাহলে আপনার জন্য ফাসখ বা খুলা জায়েজ হবে।
উল্লেখিত কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতওয়া শামী
- ইমদাদুল ফাতওয়া
- আল-হিদায়া
- ফাতওয়া উসমানী
- শরহ মাআনিল আসার