বেকার ও দারিদ্র্য স্বামীর জন্য সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ কি ইসলামে বৈধ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2050
Questioner: msd
Question Asked: 26 Jun 2026, 10:30 AM
Reviewed & Published: 26 Jun 2026, 10:41 AM
Views: 55
Tokens: 4,695
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাদের বিয়ে হয়েছে দেড়বছর। স্টুডেন্ট অবস্থায় বিয়ে করেছিলাম। আমার স্বামী এখনো চাকরি পাননি। অতি অল্প টাকা টিউশন করে পান যা ঘর ভাড়া দিয়েই শেষ হয়ে যায়। আমরা আমার বাবার বাড়িতে খাই। যেহেতু কোনো উপার্জন নেই আর শশুরবাড়ি বাবার বাড়ি কেউ চায় না এখন সন্তান হোক, সন্তান না নেওয়াটা কি জায়েজ হবে? বাবার বাড়ি থেকে এই বিষয়ে কোনো সাহায্য করা হবে না বলে দিয়েছে

Answer

উত্তর

প্রশ্ন: আমাদের বিয়ে হয়েছে দেড় বছর। স্বামী এখনো চাকরি পাননি, সামান্য টিউশন যা আয় হয় তা ঘরভাড়াতেই শেষ। আমরা আমার বাবার বাড়িতে খাই। শ্বশুরবাড়ি ও বাবার বাড়ি কেউই এখন সন্তান নিতে চায় না। আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। এমন অবস্থায় সন্তান না নেওয়া কি জায়েজ হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, বর্তমান আর্থিক সংকট ও অস্থিতিশীল অবস্থায় সাময়িকভাবে সন্তান ধারণ না করা জায়েজ (বৈধ) এবং শরীয়তসম্মত। তবে এর জন্য স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের সম্মতি ও যেকোনো সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন কনডম, পিল, ইত্যাদি) ব্যবহার করা যাবে। স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (অপারেশন) জায়েজ নয়। নিচে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে সন্তান ধারণের ফজীলত ও অনুমতি

ইসলামে সন্তান লাভ নিঃসন্দেহে আল্লাহর বড় নিয়ামত এবং উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক কোনো ইবাদত নয়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু সাহাবী (রাঃ) দারিদ্র্যের কারণে সন্তান ধারণ না করতে চাইলে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়:

﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ ۚ﴾ [الأنعام: 151] "দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা নিজেদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তাদের ও তোমাদের রিজিক দেব।" (সূরা আল-আনআম: ১৫১)

এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, দারিদ্র্যের কারণে স্থায়ীভাবে সন্তান না নেওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করা নিষিদ্ধ। কিন্তু সাময়িক ব্যবধানের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েজ, যদি তা কোনো ক্ষতিকর ও স্থায়ী পদ্ধতি না হয়। প্রসিদ্ধ তাফসীরবিদ ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, "যে ব্যক্তি দারিদ্র্যের অজুহাতে সন্তান ধারণ থেকে বিরত থাকে, সে যেন আল্লাহর রিজিকের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করে।" কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে অর্থাৎ স্ত্রীর শরীরে কষ্ট, স্বামীর সঙ্গমে অক্ষমতা বা অন্য কোনো ওযর থাকলে ‘আযল’ (বাহিরে পতন) বা অন্য কোনো সাময়িক পদ্ধতি ব্যবহার করা বৈধ। (তফসীরে কুরতুবী, ৭/২৪২)

হানাফী ফিকহের নির্দেশনা

হানাফী মাযহাবের বড় ফকীহ ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহঃ) রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে লিখেছেন:

"লজ্জা বা দারিদ্র্যের ভয়ে গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) নয় বরং স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে জায়েজ, তবে তা স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ না হয়।" (রাদ্দুল মুহতার, ২/৩৯৯)

অর্থাৎ, শুধু সৌন্দর্য রক্ষা বা অযথা ভয়ের জন্য না, বরং বাস্তবিক কারণ (যেমন আর্থিক অক্ষমতা, শারীরিক অক্ষমতা, বর্তমান শিশুর দুধপান ইত্যাদি) থাকলে সাময়িক জন্মবিরতি শরীয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত।

ফাতাওয়া ও আধুনিক উসমানী ফাতাওয়া

প্রখ্যাত হানাফী আলেম মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বরাকাতুহুম তাদের ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন:

"গর্ভধারণ নিবারণের জন্য স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতি থাকলে এবং শাস্ত্রীয় কোনো নিষেধাজ্ঞা (যেমন স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ) না থাকলে তা বৈধ। বিশেষ করে যদি আর্থিক অসহায়তা বা স্বামীর অসুস্থতার মতো সঙ্গত কারণ থাকে, তবে তা বৈধ তো বটেই, প্রয়োজনের কারণেও হতে পারে।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫১৩)

আপনার পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট হুকুম

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • স্বামীর চাকরি নেই, আয় অতি নগণ্য (শুধু ঘরভাড়া যায়)।
  • আপনি আপনার বাবার বাড়িতে খাবার গ্রহণ করছেন, যা বাবার ইচ্ছানুকূল নয়।
  • বাবার বাড়ি থেকে কোনো সহায়তা মিলবে না, বরং তারা সন্তান নিতে নিষেধ করেছে।

এ অবস্থায় সন্তান ধারণ না করা শুধু জায়েজ নয়, বরং কিছুটা জরুরিও। কারণ:

  1. বর্তমানে সন্তান এলে তার লালন-পালন, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদির মতো সামর্থ্য নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন,

    ﴿لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا﴾ [الطلاق: 7] "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বেশি দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আত-তালাক, ৭)

  2. আপনার বাবার বাড়িতে অন্যের সম্পদের উপর নির্ভরশীল থাকা অবস্থায় সন্তান আনা তাদের জন্য বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করবে, যা পারিবারিক অশান্তির কারণ হতে পারে। শরীয়তে নিজ ও পরিবারের জন্য কোনো অসুবিধা ও কষ্ট সৃষ্টি করা পছন্দনীয় নয়।

গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলী

  • স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি: জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য অবশ্যই উভয়ের অনুমতি নিতে হবে। কোনো একক পক্ষের ইচ্ছায় তা করা উচিত নয়।
  • স্থায়ী পদ্ধতি নয়: শুধুমাত্র সাময়িক পদ্ধতি (কনডম, পিল, আইইউডি, ইমপ্লান্ট ইত্যাদি) ব্যবহার করা যাবে। নসব বন্ধ করে দেওয়া (টিউবেকটমি, ভ্যাসেকটমি) হারাম।
  • প্রয়োজন শেষ হলে পুনরায় সন্তানের জন্য চেষ্টা করা: যখন স্বামী চাকরি পাবেন এবং আর্থিক সামর্থ্য হবে, তখন আবার সন্তানের জন্য দুআ ও চেষ্টা করা উত্তম। স্থায়ীভাবে সন্তান না নেওয়ার নিয়ত করা মাকরূহে তাহরীমি (নিষিদ্ধ) পর্যায়ে পৌঁছে।

আধ্যাত্মিক উপদেশ

আপনার স্বামী চাকরির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। কুরআনে এসেছে:

﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا * وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ [الطلاق: 2-3] "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক, ২-৩)

অতএব, বর্তমান দুঃসময়ে ধৈর্য ধরুন, আবশ্যিক কোনো অনৈতিক উপায় (যেমন অন্যের অনুমতি ছাড়া চুরি, ধোঁকা ইত্যাদি) অবলম্বন করবেন না। গর্ভধারণ আপাতত স্থগিত রাখুন, কিন্তু চিরতরের জন্য ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেবেন না।

সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, বর্তমান আর্থিক অক্ষমতা ও বাবার বাড়ির অনীহার কারণে স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের সম্মতিতে সাময়িকভাবে সন্তান না নেওয়া জায়েজ (বৈধ) এবং কোনো গুনাহ নেই। তবে কোনো স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতি ব্যবহার যাবে না।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তৌফিক দাতা।


সূত্র: রাদ্দুল মুহতার (২/৩৯৯), ফাতাওয়া উসমানী (২/৫১৩), তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন (সূরা আনআমের ১৫১ নং আয়াতের তাফসীর)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.