এক্বরাহ ছাড়া কি কুফরি গ্রহণযোগ্য
Faith and Belief · Hanafi
Question
যেমন, ২ টি কুফরি কাজ বাধ্যতা মূলক হলে সহজটি করা।। গ্রহণ যোগ্য হলে কখন বা শুধু সামরিক খাতে বৈধ হবে? না কি অন্নান্য সময়ও?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আপনি কুফরি কাজ (যেমন কুফরি শব্দ উচ্চারণ বা কুফরি আমল) করার বৈধতা সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন, বিশেষ করে একরাহ (জোর-জবরদস্তি) ছাড়া অন্য কোনো অবস্থায় তা জায়েজ কিনা। পাশাপাশি, একাধিক কুফরি কাজের মধ্যে সহজটি বেছে নেওয়া এবং সামরিক ও অ-সামরিক প্রসঙ্গে এর বিধান নিয়েও আলোচনা করেছেন। নিচে হানাফি মাজহাব ও কোরআন-হাদিসের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
প্রশ্ন ১: একরাহ (জোর-জবরদস্তি) ছাড়া কি কুফরি কাজ গ্রহণযোগ্য?
উত্তর:
শরিয়তে কুফরি কাজ করার বৈধতা শুধুমাত্র একরাহ (জোর-জবরদস্তি)-এর মাধ্যমে সীমাবদ্ধ। একরাহ ব্যতীত অন্য কোনো অবস্থায় কুফরি কাজ করা হারাম ও ইমান বিগ্রহকারী। তবে দুটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে—
১. ইজতিরার (চরম প্রয়োজন): যদি জীবন বাঁচানোর জন্য কুফরি শব্দ মুখে বলা ছাড়া কোনো উপায় না থাকে, তবে শুধুমাত্র মুখে বলা জায়েজ, তবে অন্তর ইমানের ওপর অটল থাকতে হবে। (সূরা আন-নাহল: ১০৬)
২. মাকরুহ তানযিহি (অপছন্দনীয়): কোনো কাফির শাসকের ভয়ে কুফরি শব্দ বলা অত্যন্ত অপছন্দনীয়, তবে জীবন বিপদের আশঙ্কা থাকলে তা জায়েজ বলেছেন কিছু হানাফি ফকিহ। (রদ্দুল মুহতার, ৫/৩০০)
উল্লেখ্য: উপরের দুটি ক্ষেত্রেও ইকলাস (আন্তরিকতা) অটল রাখা আবশ্যক। অন্যথায় কুফরি কাজ ইমান নষ্ট করে।
প্রশ্ন ২: একাধিক কুফরি কাজ বাধ্যতামূলক হলে সহজটি করা জায়েজ?
উত্তর:
হ্যাঁ, যদি কোনো ব্যক্তি একরাহ (জোর-জবরদস্তি)-এর শিকার হয়ে একাধিক কুফরি কাজের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়, তবে সহজ বা কম কঠিন কাজটি করা জায়েজ। এটি জরুরাত (প্রয়োজন)-এর একটি শাখা। যেমন—
- যদি কেউ জোরপূর্বক পাথর বা মাটির মূর্তির সামনে সিজদা করতে বাধ্য হয়, তবে মুখে কুফরি শব্দ বলা অপেক্ষা সিজদা করা কম কুফরি বলে গণ্য (কারণ ইচ্ছাকৃত সিজদা করলেই কুফর হয়, তবে জোর করে করলে তা মাকরুহ তানযিহি)।
- উভয় কাজই কুফরি হলেও সবচেয়ে হালকা কুফরি বেছে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। (মারাকিল ফালাহ, ২/২৪৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৪৬০)
শর্ত: এই অনুমতি শুধুমাত্র জীবন-বিপদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
প্রশ্ন ৩: সামরিক ও অ-সামরিক প্রসঙ্গে কুফরি কাজের বৈধতা
উত্তর:
হানাফি ফিকহে একরাহ (জোর-জবরদস্তি)-এর বিধান সামরিক ও অ-সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে সামরিক প্রেক্ষাপটে কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে:
১. যুদ্ধকালীন: যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম সেনাদের ওপর কুফরি কাজ চাপিয়ে দেওয়া হলে, তারা ইমান গোপন রেখে শত্রুকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য কুফরি শব্দ ব্যবহার করতে পারে, যদি তা জিহাদে সহায়ক হয়। (আল-হেদায়া, ২/২৮৪)
২. সাধারণ সময়: অ-সামরিক প্রসঙ্গে (যেমন বেসামরিক শাসক বা শত্রুর ভয়) কেবল জীবন রক্ষার্থে কুফরি কাজ জায়েজ। অন্যথায় তা হারাম।
নোট: সামরিক ক্ষেত্রে সহজটি বেছে নেওয়ার সময় জিহাদের মুখোমুখি না হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যুদ্ধে শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে মিথ্যা বলা জায়েজ, কিন্তু কুফরি কাজ করা নাজায়েজ। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২২৪)
কোরআন-হাদিসের প্রমাণ:
১. কোরআন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে অস্বীকার করে, যদিও তার অন্তর ইমানে পরিপূর্ণ, তবে তাকে জোর করা হলে (একরাহ) তা ব্যতিক্রম।" (সূরা আন-নাহল: ১০৬)
২. হাদিস:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য ভুল, ভুলে যাওয়া এবং জোরপূর্বক (একরাহ) কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (ইবনে মাজা, হাদিস: ২০৪৫)
৩. হানাফি ফিকহ:
“একরাহ (জোর-জবরদস্তি) এমন একটি অবস্থা, যেখানে কেউ নিজের জীবন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্ষার্থে কুফরি কাজ করতে বাধ্য হয়। এর অন্তর্ভুক্ত: প্রাণনাশের ভয়, অঙ্গহানির ভয় এবং গুরুতর আঘাতের ভয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/৩০০)
সারসংক্ষেপ:
১. একরাহ (জোর-জবরদস্তি) ছাড়া কুফরি কাজ কখনো জায়েজ নয়।
২. একাধিক কুফরি কাজের মধ্যে সবচেয়ে সহজ ও হালকা কাজটি করা জায়েজ, তবে শর্ত হলো: জীবন বাঁচানোই উদ্দেশ্য।
৩. সামরিক ও অ-সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই একরাহ-এর বিধান প্রযোজ্য, তবে সামরিক ক্ষেত্রে জিহাদের স্বার্থে কৌশলগত অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
৪. মুখে কুফরি শব্দ বললেও অন্তর ইমানের ওপর অটল থাকতে হবে।
সতর্কতা: কুফরি কাজের বৈধতা অত্যন্ত সীমিত এবং এটি আপনি স্বেচ্ছায় নয়, বরং বাধ্য হয়ে করছেন—এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। অনেকে ভুলক্রমে নিজেকে বাধ্য মনে করে হারাম কাজ করে ফেলে, যা ইমান নষ্টের কারণ।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ইমানের ওপর অটল রাখুন। আমিন।