মৃত ব্যক্তির মানত ওয়ারিশরা সম্পদ থেকে আদায় করতে পারে?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 2025
Questioner: Suraia Shova
Question Asked: 25 Jun 2026, 05:33 PM
Reviewed & Published: 25 Jun 2026, 05:39 PM
Views: 20
Tokens: 6,292
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম উস্তায
আমার বাবা বহু বছর আগে যখন চেয়ারম্যান হওয়ার নির্বাচনে ছিলেন তখন তিনি মানত করেছিলেন যে চেয়ারম্যান হতে পারলে একটা মসজিদে কিছু টাকা বা মিষ্টি দিবে.. তিনি এখন বেঁচে নেই
তার এই মানতে কী কোনো ত্রুটি আছে?
আর আমরা কী টাকা বা মিষ্টি বিতরণ করে দিতে পারবো তার হয়ে?


আর আমিও এস এস সি -র সময় তখন যদিও দ্বীন সম্পর্কে জানা ছিলো না
মানত করে ফেলেছিলাম যে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেলে কত কেজি যেনো মিষ্টি দেবার
আমার মনে নেই সঠিক কী মানত করেছিলাম

এক্ষেত্রে কী করতে পারি উস্তায? আসলে মানতের ব্যাপারটা আমি ক্লিয়ার না....

Answer

উত্তর: মানত (نذر) সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
প্রশ্নকারী দুইটি মানতের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন—
১. তার বাবা নির্বাচনে চেয়ারম্যান হওয়ার মানত করেছিলেন (মসজিদে টাকা বা মিষ্টি দেওয়ার)। তিনি মারা গেছেন। মানতটি কি ত্রুটিপূর্ণ ছিল? এবং তাঁরা কি তাঁর পক্ষ থেকে তা আদায় করতে পারবেন?
২. প্রশ্নকারী নিজে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার মানত করেছিলেন (নির্দিষ্ট কেজি মিষ্টি দেওয়ার)। এখন সঠিক পরিমাণ মনে নেই। কী করবেন?


১. মানতের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব (হানাফী মতে)

মানত (نذر) অর্থ: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো ইবাদত বা সদকা নিজের ওপর ওয়াজিব করে নেওয়া, শর্তসাপেক্ষে বা শর্তহীনভাবে। শর্তসাপেক্ষ মানত যেমন: “যদি আমি সুস্থ হই, তবে দুই রাকাত নামাজ পড়ব।” শর্ত পূরণ হলে মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়। {সূরা আল-ইনসান ৭, সূরা আল-হাজ ২৯}

হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে (আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগীরী) মানতের বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

  • শর্ত পূরণ না হলে মানত আদায় করতে হবে না।
  • শর্ত পূরণ হলেই পূর্ণ করা ফরজ (ওয়াজিব) হয়ে যায়।
  • মানত যদি কোনো গুনাহের কাজের হয় (যেমন: মৃতকে সিজদা করা), তবে তা পূর্ণ করা হারাম এবং কাফফারা দিতে হবে।

তবে এক্ষেত্রে বাবার মানত (মসজিদে অর্থ/মিষ্টি দেওয়া) এবং প্রশ্নকারীর মানত (মিষ্টি দেওয়া) উভয়ই জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। এতে কোনো ত্রুটি নেই।

উল্লেখ্য: মানতের ক্ষেত্রে মনে রাখবেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মানত কোনো কিছু আগাতে বা পিছাতে পারে না; বরং তা কৃপণের কাছ থেকে সম্পদ বের করে আনে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৬০৮) অর্থাৎ মানত করাকে ভালো কাজ মনে করা ঠিক নয়; বরং মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব।


২. প্রথম অংশ: বাবার মানত

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ:
আপনার বাবা নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন এবং চেয়ারম্যান হতে পারলে একটি মসজিদে কিছু টাকা বা মিষ্টি দেওয়ার মানত করেছিলেন।

  • যদি তিনি চেয়ারম্যান হন (শর্ত পূর্ণ হয়), তবে তা পূর্ণ করা তার ওপর ওয়াজিব ছিল। তিনি মৃত্যুবরণ করায় তা আদায় না করেই গেছেন।
  • যদি তিনি চেয়ারম্যান না হন, তবে কোনো মানত বাকি নেই; এটি নাজরুল মাক্বরূন (মুক্বাব্বাল) না হওয়ায় শর্ত অমূলক হয়েই শেষ।

আপনার প্রশ্ন: “ত্রুটি আছে কি?”
উত্তর: মানতের মধ্যে ত্রুটি নেই; শর্ত পূর্ণ হলে পূর্ণ করা ওয়াজিব ছিল। এখন তার মৃত্যুতে আপনাদের (ওয়ারিশদের) দায়িত্ব:

হানাফী ফিকহের নির্দেশনা:

  • যদি মৃত ব্যক্তি মানত পূর্ণ না করে মারা যায় এবং তার সম্পদ থাকে, তবে ওয়ারিশদের ওপর তা আদায় করা ওয়াজিব (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৯৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৪০৫)।
  • যদি সম্পদ না থাকে বা তিনি সম্পদ ত্যাগ না করে থাকেন, তবে ওয়ারিশরা চাইলে নিজেদের পক্ষ থেকে সওয়াবের নিয়তে আদায় করতে পারেন, কিন্তু তা ওয়াজিব নয়।

আপনার করণীয়:
প্রথমে নিশ্চিত হোন যে আপনার বাবা চেয়ারম্যান হয়েছিলেন কি না। যদি হয়েছিলেন, তবে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে মানত পরিমাণ টাকা বা মিষ্টি মসজিদে দান করুন। যদি সম্পদ না থাকে, তবে আপনারা নিজের পক্ষ থেকে দান করতে পারেন; এতে বাবার জন্য সওয়াব হবে এবং মানতের দায়িত্বও আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

হাদীসে আছে: ইবনে আব্বাস রা.-এর ভাই সাদ ইবনে উবাদা রা.-এর মা মারা গেলে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন যে তার পক্ষ থেকে মানত আদায় করা যাবে কি? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “তুমি তার পক্ষ থেকে তা আদায় করো।” (সহীহ বুখারী ২৭৬১)


৩. দ্বিতীয় অংশ: প্রশ্নকারীর নিজের মানত

পরিস্থিতি:
আপনি এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার মানত করেছিলেন যে “কত কেজি যেনো মিষ্টি দেবার” – এখন সঠিক পরিমাণ মনে নেই। আপনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন (অথবা পেয়েছেন বলে ধরে নিচ্ছেন)।

হানাফী মতে:

  • শর্ত পূর্ণ হওয়ায় (জিপিএ-৫ পাওয়া) মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব।
  • পরিমাণ ভুলে গেলে কি করবেন?

বিধান:
১. চেষ্টা করুন স্মরণ করার – সম্ভব হলে পরিবার বা বন্ধুদের জিজ্ঞেস করুন, কোনো লিখিত স্মৃতিচিহ্ন থাকলে দেখুন।
২. যদি মনে না আসে, তাহলে ইসলামী ফিকহ অনুসারে, আপনি নিশ্চিত পরিমাণের ন্যূনতম সম্ভাব্য পরিমাণ ধরে নিন। যেমন: আপনি যদি মনে না করতে পারেন ১ কেজি, ২ কেজি নাকি ৫ কেজি বলেছিলেন, তবে সবচেয়ে ছোট পরিমাণ (যেমন ১ কেজি) দিলেই দায়িত্বমুক্ত হবেন, কারণ সন্দেহের ক্ষেত্রে কম ধরা উচিত (ফাতাওয়া উসমানী, ৩/২৯০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬৪)।
৩. বিকল্প – কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ না মানতে পারলে সাধারণ সদকা করে দিন (যেমন: কিছু কেজি মিষ্টি বা সমমূল্যের টাকা গরিবদের দান করুন) এবং মনে মনে নিয়ত করুন যে আপনি মানত পূর্ণ করছেন। অবশ্য, মানতের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টতা উত্তম।

উল্লেখ্য: মানত যদি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে (যেমন: কোনো মসজিদ) দেওয়ার হয়েছিল, তবে সেখানে দিতে হবে। আপনি “মিষ্টি দেবার” বলেছেন – সাধারণত মিষ্টি বিতরণ করা যায় গরিবদের বা প্রতিবেশীদের। কোনো মসজিদের খেদমতে দেওয়াও চলবে, তবে মসজিদের পরিচালনায় ব্যয় করা জায়েয আছে কিনা তা বিবেচনা করতে হবে (মসজিদের ফান্ডে সাধারণ দান করা যায়; মিষ্টি মসজিদে এনে খাওয়ানোও জায়েয)।

আপনার করণীয়:

  • আপনি জিপিএ-৫ পেয়েছেন নিশ্চিত হলে (অথবা পেয়েছেন বলে ধরে নিচ্ছেন), এখনই মানত পূর্ণ করুন।
  • মনে না থাকলে, আপনার ধারণা অনুযায়ী (যেমন: মোটামুটি ২ কেজি মনে হয়) সেটাই দিন। অথবা সবচেয়ে কম সম্ভাব্য পরিমাণ ধরে (যেমন ১ কেজি) দিন।
  • অধিক সতর্কতা: জানা না থাকলে এখন একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে (যেমন: ৫ কেজি) দিয়ে দিন; তাহলে অতিরিক্ত দেওয়াতে সওয়াব বেশি হবে। কিন্তু ওয়াজিব আদায় হবে অন্তত নিশ্চিত পরিমাণ দিলেই।

৪. সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | বাবার মানত (চেয়ারম্যান হলে দান) | শর্ত পূর্ণ হলে বাবার সম্পদ থেকে আদায় ওয়াজিব; পরে নিজেরা দান করলেও হবে। ত্রুটি নেই। | | আপনার নিজের মানত (জিপিএ-৫ পেলে মিষ্টি) | জিপিএ-৫ পেয়ে থাকলে মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব। পরিমাণ ভুলে গেলে ন্যূনতম ধরে দিন অথবা সম্ভাব্য পরিমাণ দিন। |

উভয় ক্ষেত্রেই দেরি না করে দ্রুত আদায় করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা যা খরচ কর, তিনি তার প্রতিদান দেবেন।” (সূরা সাবা: ৩৯)

হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার (২/৪২২-৪২৪, ৫/২৯৫) – মানতের ওয়াজিব হওয়া ও ওয়ারিশদের দায়িত্ব
  • ফাতাওয়া আলমগীরী (২/৪০৫-৪০৬) – মৃত ব্যক্তির মানত আদায়
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৬৪, ৪/২৭০) – ভুলে গেলে ন্যূনতম পরিমাণ নির্ধারণ
  • ফাতাওয়া উসমানী (৩/২৮৮-২৯০) – মানতের শর্ত পূরণে বাধ্যবাধকতা
  • বেহেশতী জেওর (৬/২২-২৫) – মানতের সাধারণ মাসয়ালা
  • মারেফুল কুরআন (২/২৭০, সূরা বাকারার ২৭০ নং আয়াতের ব্যাখ্যা) – দান-সদকা ও মানত

উল্লেখ্য: মানত করা সাধারণত উৎসাহিত নয়, তবে যদি করে ফেলেন তবে তা পূর্ণ করা ফরজ। তাই ভবিষ্যতে মানত না করার চেষ্টা করুন; বিনা শর্তে নফল ইবাদত করাই উত্তম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.