মাসিক রক্তস্রাব ১০ দিনের বেশি হলে ইসলামী বিধান
Taharah Purity · Hanafi
Question
সম্প্রতি গাইনি ডাক্তার দেখিয়ে কিছু ওষুধ খাচ্ছি। এই মাসে আমার মাসিক শুরু হয় ২ তারিখে। ৮ দিন রক্তস্রাব হয়েছিল। এরপর আরও ২ দিন সাদা/হলদেটে স্রাব ছিল, তাই সেটাকেও মাসিকের অংশ হিসেবে ধরেছি।
এরপর ১২ তারিখ আসর থেকে নামাজ পড়ছি। কিন্তু ২৩ তারিখ সকালে আবার রক্ত দেখা গেছে। এখন আমি বিভ্রান্ত—এটা কি হায়েজ (মাসিক) হিসেবে গণ্য হবে, নাকি ইস্তিহাজা হিসেবে?
আরেকটি বিষয় জানতে চাই: যদিও সুস্থতার ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত ইস্তিহাজার হুকুম চলবে, কিন্তু যদি ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার পরও রক্তস্রাব চলতে থাকে, তাহলে কি সেটিকে হায়েজ হিসেবে গণ্য করতে হবে?
Answer
উত্তর দেওয়ার পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ নোট:
এই উত্তরটি সম্পূর্ণরূপে হানাফী মাযহাবের ফিকহী নীতিমালা ও কিতাবসমূহের (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, বেহেশতি জেওয়ার) ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত মাসিক চক্র ও ডাক্তারি চিকিৎসার কারণে পরিবর্তন হতে পারে, তাই শরয়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একজন আলিমের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
প্রশ্ন ১: বর্তমান রক্তস্রাব (২৩ তারিখ সকালে দেখা দেওয়া রক্ত) কি হায়েজ নাকি ইস্তিহাজা?
উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- এই মাসে ২ তারিখ হায়েজ শুরু হয়েছিল।
- ৮ দিন রক্তপাত হয়, তারপর ২ দিন সাদা/হলদেটে স্রাব ছিল। (হানাফী মাযহাবে মাসিকের শেষের সাদা/হলদে স্রাব মাসিকের অংশ গণ্য হয় যদি তা রক্তের ধারাবাহিকতায় আসে এবং মাসিকের মেয়াদের মধ্যে হয়; আপনি যেহেতু ৮ দিন রক্তের পর পরপর ২ দিন সাদা স্রাব পেয়েছেন, এবং আপনার সাধারণ মাসিক ১২–১৫ দিন স্থায়ী হয়, তাই আপনি সেটিকে মাসিকের অংশ ধরেছেন—এটা হানাফী মতে গ্রহণযোগ্য।)
- ১০ দিন (২ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সকাল) শেষে আপনি ১২ তারিখ আসর থেকে নামাজ পড়া শুরু করেন, অর্থাৎ আপনি ধরে নেন যে আপনার হায়েজ ১০ দিনের মধ্যে শেষ হয়েছে। (হানাফী মতে হায়েজের সর্বোচ্চ সময়সীমা ১০ দিন; এর বেশি রক্ত ইস্তিহাজা গণ্য হয়।)
- তারপর ২৩ তারিখ সকালে আবার রক্ত দেখা দিয়েছে।
শরয়ী সিদ্ধান্ত:
হানাফী ফিকহে মাসিকের মধ্যে সর্বনিম্ন পবিত্রতার সময়কাল হলো ১৫ দিন। অর্থাৎ, দুটি হায়েজের মধ্যে কমপক্ষে ১৫ দিন পবিত্র থাকতে হবে। যদি ১৫ দিনের কম ব্যবধানে রক্ত আসে, তবে দ্বিতীয় রক্ত হায়েজ নয় বরং ইস্তিহাজা বলে গণ্য হবে।
এক্ষেত্রে:
- আপনার শেষ হায়েজের প্রথম দিন ছিল ২ তারিখ।
- হায়েজের শেষ দিন ধরা হয় ১১ তারিখ পর্যন্ত (যদি আপনি ১০ দিন ধরে থাকেন) অথবা ১২ তারিখ সকাল পর্যন্ত।
- তারপর পবিত্রতা শুরু হয়েছে ১২ তারিখ আসর থেকে।
- পুনরায় রক্ত এসেছে ২৩ তারিখ সকালে—অর্থাৎ শেষ হায়েজ শেষ হওয়ার পর মাত্র ১০–১১ দিন পবিত্রতা হয়েছে, যা ১৫ দিনের কম।
সুতরাং, ২৩ তারিখের রক্ত হায়েজ হবে না; এটি ইস্তিহাজা (অবস্থাগত রক্ত) গণ্য হবে।
- আপনি নামাজ, রোজা, ও অন্যান্য ইবাদত চালিয়ে যাবেন। ইস্তিহাজার সময় প্রত্যেক ফরয নামাজের জন্য নতুন করে উযু করতে হবে।
হানাফী কিতাবের দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (১/৩০৬): "যদি হায়েজের পর পনেরো দিনের কম ব্যবধানে রক্ত আসে, তবে তা ইস্তিহাজা।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৭): "দুটি হায়েজের মধ্যে কমপক্ষে পনের দিন পবিত্রতা প্রয়োজন।"
- ফাতাওয়া উসমানি (২/১২৩): "যে রক্ত পনের দিনের কম পবিত্রতার পর আসে, তা হায়েজ নয়, ইস্তিহাজা।"
প্রশ্ন ২: ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার পরও যদি রক্তস্রাব চলতে থাকে, তাহলে কি সেটিকে হায়েজ হিসেবে গণ্য করতে হবে?
উত্তর:
হানাফী মতে:
- হায়েজের সর্বোচ্চ সময় ১০ দিন।
- যদি কারো রক্তস্রাব ১০ দিনের বেশি স্থায়ী হয় এবং তার আদত (স্বাভাবিক অভ্যাস) থাকে, তাহলে সে তার স্বাভাবিক দিন সংখ্যা (যত দিন সাধারণত হায়েজ হয়) পর্যন্ত রক্তকে হায়েজ গণ্য করবে, এবং বাকি দিন ইস্তিহাজা।
- যদি স্বাভাবিক দিন সংখ্যা নির্ধারিত না থাকে (যেমন নতুন করে হায়েজ শুরু হয়েছে), তাহলে শুরু থেকে ১০ দিন পর্যন্ত রক্ত হায়েজ এবং ১০ দিনের পরের রক্ত ইস্তিহাজা।
আপনার ক্ষেত্রে:
আপনার স্বাভাবিক মাসিক ১২–১৫ দিন হয় বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু শরয়ী নিয়ম অনুযায়ী, হায়েজ ১০ দিনের বেশি হতে পারে না। তাই আপনার স্বাভাবিক দিন যাই হোক না কেন, ১০ দিনের বেশি রক্ত ইস্তিহাজা গণ্য হবে (যদিও ডাক্তারি কারণে আপনার দীর্ঘ রক্তপাত হচ্ছে)।
১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার পরও রক্ত চলতে থাকলে:
- যদি ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই রক্ত বন্ধ হয়ে যায় এবং আপনার স্বাভাবিক দিন পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে সেটি হায়েজ ছিল।
- যদি ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার পরও রক্ত চলতে থাকে, তাহলে শুরু থেকে ১০ দিন পর্যন্ত হায়েজ, এরপরের সব রক্ত ইস্তিহাজা।
- আর যদি রক্ত ১০ দিনের কম সময়ের জন্য আসে এবং তারপর ১৫ দিন পবিত্রতা পূর্ণ হওয়ার আগে আবার রক্ত আসে, তাহলে দ্বিতীয় রক্ত যেমন ইস্তিহাজা হয়, তেমনই ১৫ দিনের পর যদি আসে তবে দ্বিতীয় রক্ত নতুন হায়েজ হতে পারে যদি তা ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে হয়।
আপনার বর্তমান অবস্থায় আপনি আগের রক্তকে ১০ দিন পর্যন্ত হায়েজ ধরেছেন, এবং ১২ তারিখ থেকে নামাজ পড়ছেন। এখন ২৩ তারিখের রক্ত ইস্তিহাজা। আর ভবিষ্যতে যদি আপনার মাসিক চক্র নিয়মিত না হয়, তবে আপনি আদত অনুযায়ী বা ১০ দিন পর্যন্ত হায়েজ ও বাকি ইস্তিহাজা এই নিয়মেই চলবেন।
উল্লেখ্য: আপনি ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাচ্ছেন, যার কারণে মাসিকের সময়সীমা ও চক্র পরিবর্তন হতে পারে। তাই প্রতি মাসে আপনার আদত ও রক্তপাতের ধরন দেখে ফিকহী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
হানাফী কিতাবের দলিল:
- বেহেশতি জেওয়ার (হায়েজের অধ্যায়): "যে রক্ত দশ দিনের বেশি হয়, তা হায়েজ নয় বরং ইস্তিহাজা; যদি কারো অভ্যাস থাকে তাহলে অভ্যাসের দিন পর্যন্ত হায়েজ ধরবে, অন্যথায় দশ দিন পর্যন্ত হায়েজ।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪২): "হায়েজের সর্বোচ্চ সময় দশ দিন, এর বেশি হলে ইস্তিহাজা। পনের দিন পবিত্রতা ছাড়া দ্বিতীয় হায়েজ হয় না।"
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা:
- ২৩ তারিখের রক্ত: ইস্তিহাজা গণ্য হবে। নামাজ, রোজা চালিয়ে যান। ইস্তিহাজার নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক ফরয নামাজের সময় নতুন উযু করুন।
- ১৫ দিন পূর্ণ হওয়ার পর রক্ত চলতে থাকলে: হায়েজের জন্য সর্বোচ্চ ১০ দিন গণ্য করুন; এর বেশি ইস্তিহাজা।
- ডাক্তারি চিকিৎসার কারণে চক্র অনিয়মিত হলে: প্রতিবার মাসিকের শুরু ও শেষ লিখে রাখুন, এবং হানাফী নিয়ম অনুযায়ী ফকীহের পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিন।
আল্লাহ তাআলা আপনার অসুবিধা সহজ করুন এবং সুস্থতা দান করুন।