"যাকাত কি নাতনিকে দেওয়া জায়েজ"
Taharah Purity · Hanafi
Question
১) আমার মেজ আপু তালাক প্রাপ্ত একটা মেয়ে সহ আমাদের বাড়িতে আছে,এই মেয়ের কোন ভরণপোষণ তার বাবা দেয়না, এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমার বাবা কি ওনার যাকাত এর টাকা আমার বোন এর মেয়েকে দিতে পারবেন?
২)নবিজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ঘুম থেকে উঠার পর দুই হাত না ধুয়ে কোনো পাত্রে হাত না দিতে ,
এখন আমি যে টা জানতে চাচ্ছি আমি সকালে ঘুম থেকে উঠার পর হাত তিন বার ধুয়ে পরে বাথরুমে যাই আর তখন বাথরুম ব্যবহার করার পর পানির ট্যাপ ও পানির পাত্র মানে বদনা যেটা বলে ঐ গুলো ভেজা থাকে পরে অন্য কেউ যেমন বাবা বা মা ওনারা গেলে হাত না ধুয়ে ই যায় তো তখন ঐ ভেজা ট্যাপ ও ভেজা বদনা তে ধরলে এতে কি এগুলো নাপাক হবে?
৩) পরিবারের অন্য যে সদস্যরা নামাজ পড়ে না ও পাক নাপাক নিয়ে সতর্ক থাকে না, যেমন কাপড়ে কোনো নাপাকি থাকলে তা ভালো ভাবে ধুয়ে পাক করেনা,বিশেষ করে জানেও না কিভাবে পাক করতে হবে , তারা যদি যেকোনো সময় ভেজা হাতে পানির ট্যাপ বা যেকোনো জিনিস পত্র এ হাত দেয় এতে কি এগুলো নাপাক হবে , সবসময় কি এগুলো পাক করে আমাকে ব্যবহার করতে হবে?
৪), আমার একজন নিকট আত্মীয় তিনি পেশায় একজন কবিরাজ মানে গাছ গাছালির ঔষধ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন তাবিজ কবজ করে, বিভিন্ন মন্ত্র পড়ে ঝাড়ফুঁক করে যা বৈধ নয়,
আবার তিনি বিভিন্ন সুদ ভিত্তিক সমিতি থেকে লোন নিয়ে একটি মুদি দোকান খুলেন,
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে ওনার বাড়িতে খাবার খাওয়া কি জায়েয হবে যেহেতু ওনার ইনকাম আমার কাছে হালাল মনে হচ্ছে না?
৫) আর যদি জায়েজ না হয় এতোদিন যে ওনার বিভিন্ন খাবার ও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পোশাক ও টাকা পয়সা নিয়েছি যার হিসাব নেই এগুলো কি করবো জানাবেন।?
জাযাকাললাহু খইরন আপনাকে
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
উত্তর:
আপনার পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের আলোকে কুরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য কিতাবের রেফারেন্স সহ নিম্নরূপ দেওয়া হলো।
১. যাকাত দেওয়া সম্পর্কে
প্রশ্ন: আমার বাবার যাকাতের টাকা কি আমার বোনের মেয়েকে (যে তালাকপ্রাপ্ত ও বাবার ভরণপোষণ পায় না) দেওয়া জায়েজ হবে?
উত্তর:
আপনার বোনের মেয়ে আপনার বাবার নাতনি (daughter’s daughter)। হানাফি ফিকহে যাকাত নিজের সন্তান, সন্তানের সন্তান (নাতি-নাতনি) এবং পিতা-মাতা, দাদা-দাদি প্রভৃতিকে দেওয়া জায়েজ নয়। কারণ এরা তার ওয়ারিশ বা তার ওপর নির্ভরশীলদের অন্তর্ভুক্ত।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: "যাকাত নিজের উসুল (পূর্বপুরুষ) ও ফুরু (সন্তান ও তাদের সন্তান) ছাড়া অন্য আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া জায়েজ।" (আল-হিদায়া, ২/২২৪; রদ্দুল মুহতার, ২/২৭২)
- সারকথা: আপনার বাবা তার নাতনিকে যাকাত দিতে পারবেন না। তবে তিনি অন্যান্য সাদকা বা খয়রাত দিতে পারেন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (২/২৭২)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৯৭)
- বেহেশতি জেওর (২/২২)
২. ঘুম থেকে উঠে হাত না ধুয়ে পাত্রে হাত দেওয়া ও ভেজা ট্যাপ-বদনার পবিত্রতা
প্রশ্ন: আমি ঘুম থেকে উঠে হাত ধুয়ে বাথরুমে যাই, ব্যবহারের পর ট্যাপ ও বদনা ভেজা থাকে। পরে বাবা-মা হাত না ধুয়ে সেগুলো ধরলে কি নাপাক হবে?
উত্তর:
হাদিসে আছে: "তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে ওঠে, তখন সে যেন পাত্রে হাত দেওয়ার আগে দুই হাত তিনবার ধুয়ে নেয়। কারণ সে জানে না রাতে তার হাত কোথায় ছিল।" (বুখারি, মুসলিম)
- এই হাদিসটি ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব। ঘুম থেকে ওঠার পর হাত ধোয়া সুন্নত, কিন্তু না ধুলে হাত অপবিত্র নয় যদি কোনো নাপাকি স্পর্শ না করে থাকে।
- কিন্তু আপনি যদি বাথরুম ব্যবহারের পর (ইস্তিঞ্জার পর) হাত না ধুয়ে ট্যাপ ও বদনা স্পর্শ করেন, তাহলে আপনার হাত নাপাক হওয়ার কারণে সেই ভেজা ট্যাপ ও বদনা নাপাক হয়ে যাবে।
- আপনার বাবা-মা যদি পরে সেই নাপাক ট্যাপ/বদনা স্পর্শ করেন এবং তাদের হাত শুকনো থাকে, তবে তাদের হাতও নাপাক হবে যদি স্পর্শকৃত স্থান ভেজা থাকে। যদি ট্যাপ বা বদনা শুকনো হয় এবং তারা শুকনো হাতে স্পর্শ করেন, তবে নাপাকি ট্রান্সফার হবে না (ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৪৭; রদ্দুল মুহতার, ১/১৯৮)
- পরামর্শ: বাথরুম ব্যবহারের পর হাত ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন। পরিবারের সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন করুন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/১৯৮)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৪২)
- বেহেশতি জেওর (পবিত্রতা অধ্যায়)
৩. নামাজ না পড়া ও পাক-নাপাক না মানা পরিবারের সদস্যদের হাত স্পর্শ
প্রশ্ন: পরিবারের কেউ নামাজ পড়ে না, কাপড়ে নাপাকি থাকলে ঠিকমতো ধুয়ে না, তারা ভেজা হাতে ট্যাপ-পাত্র ধরলে কী করব?
উত্তর:
- প্রামাণ্য নীতি: যে ব্যক্তি মুসলিম এবং তার হাতে দৃশ্যমান নাপাকি না থাকে, তবে তার হাত পবিত্র বলে ধরা হয় (ইসতিহসান)। একে ‘আসলতুত তাহারাহ’ বলে। (রদ্দুল মুহতার, ১/১৭০)
- কিন্তু যদি আপনি নিশ্চিত হন যে ওই ব্যক্তি নাপাক অবস্থায় (যেমন ইস্তিঞ্জা শেষে হাত না ধুয়া, প্রস্রাব-পায়খানার স্পর্শ পরে না ধুয়া) ভেজা হাতে ট্যাপ ধরেছেন, তাহলে ট্যাপ নাপাক হবে।
- আপনার করণীয়: আপনি যদি সন্দেহ করেন যে ট্যাপ বা পাত্র নাপাক হয়ে গেছে, তাহলে পবিত্র করার জন্য তিনবার ধুয়ে নিন (পানি দ্বারা)। বিশেষ করে অযু-গোসলের সময় সতর্ক থাকা জরুরি।
- পরিবারের সদস্যদের সাথে ভালোবাসার সাথে ইসলামের পবিত্রতা বিষয়ে শিক্ষা দিন। তাদের না বুঝানোর কারণে আপনি নিজে পাক-নাপাকের ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৪৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩২৬)
৪. কবিরাজ ও সুদি লোনে ব্যবসা করা আত্মীয়ের বাড়িতে খাওয়া
প্রশ্ন: আমার নিকট আত্মীয় কবিরাজ (তাবিজ, মন্ত্র, ঝাড়ফুঁক করেন) এবং সুদি লোনে মুদি দোকান খুলেছেন। তাঁর বাড়িতে খাওয়া জায়েজ হবে?
উত্তর:
মোটামুটি তিনটি বিষয় এখানে আছে:
ক. তাবিজ-কবচ ও মন্ত্র ঝাড়ফুঁক:
- যে তাবিজ-কবচে শিরকি বা অবৈধ মন্ত্র (অজানা ভাষা, অন্য নবী-দেবতার নাম) ব্যবহার হয়, তা সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরির দিকে নিয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬২; ফাতাওয়া উসমানী ৪/৮৭)
- বৈধ তাবিজ: শুধু কুরআনের আয়াত বা সহিহ দোয়া দিয়ে তৈরি তাবিজ কেউ কেউ অনুমতি দিয়েছেন, তবে এতেও বিতর্ক আছে। এখানে কবিরাজ যেহেতু ‘বিভিন্ন মন্ত্র’ পড়েন যা ‘বৈধ নয়’ বলে আপনি উল্লেখ করছেন, তাই তা হারাম।
খ. সুদভিত্তিক লোন নিয়ে ব্যবসা:
সুদ (রিবা) কঠোরভাবে হারাম। ঋণ নেওয়ার সময় সুদের চুক্তি করার অর্থ হল গুনাহগার হওয়া।
গ. তাঁর বাড়িতে খাওয়ার বিধান:
- যদি তাঁর উপার্জনের বেশির ভাগ হারাম হয়ে থাকে (যেমন সুদি ব্যবসা, তাবিজ-কবচের অর্থ), তবে তাঁর বাড়িতে খাওয়া জায়েজ নয়। (ফাতাওয়া উসমানী ২/৩৫؛ ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫/১৯২)
- আপনার কাছে যেহেতু তার উপার্জন হালাল মনে হচ্ছে না, তাই খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। যদি নিশ্চিত না হন যে তিনি তওবা করেছেন ও পবিত্র উপায়ে ব্যবসা করছেন, তাহলে দূরে থাকাই নিরাপদ।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৩৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/১৯২)
- রদ্দুল মুহতার (৪/১৯৮, ৬/৩৬২)
৫. আগে নেওয়া খাবার, পোশাক ও টাকার কী করব?
প্রশ্ন: যদি তার বাড়িতে খাওয়া জায়েজ না হয়, তবে আগে যত খাবার, পোশাক ও টাকা নিয়েছি (হিসাব নেই) সেগুলোর কী ব্যবস্থা করব?
উত্তর:
আপনি যখন নিচ্ছিলেন, তখন সম্ভবত আপনি তাঁর উপার্জনের হারাম সম্পর্কে জানতেন না। তাই পূর্বের গৃহীত জিনিসগুলোর জন্য আপনার ওপর কোনো গুনাহ নেই। তবে বর্তমানে জানার পর করণীয়:
- খাবার ও পোশাক: যেগুলো ইতিমধ্যে খেয়ে ফেলেছেন বা ব্যবহার করে ফেলেছেন, সেগুলোর জন্য তওবা ও ইস্তিগফার করুন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- টাকা-পয়সা: যদি আপনার কাছে এখনো সেই টাকা মওজুদ থাকে, তবে তা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দিন। তবে সদকার নিয়ত ‘হারাম মাল থেকে মুক্তি’ হিসেবে করুন, যেহেতু তা আপনার নিজের সম্পদ নয় বরং ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন। (ফাতাওয়া উসমানী ৪/১২৫; আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫৪)
- হিসাব না থাকলে: যতটুকু মনে পড়ে বা অনুমান করে গড় করুন, আর সদকা করে দিন। অতিরিক্ত সন্দেহ নিয়ে পেরেশান হবেন না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ: সেই আত্মীয়কে ভালোভাবে নসিহত করুন যেন তিনি তওবা করে শিরকি কবিরাজি ও সুদ ব্যবসা ছেড়ে দেন।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (৪/১২৫)
- রদ্দুল মুহতার (৪/১৯৮)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/১৯২-১৯৩)
সারসংক্ষেপ:
১. যাকাত নিজের নাতনিকে দেওয়া জায়েজ নয়।
২. ঘুম থেকে উঠে হাত ধোয়া মুস্তাহাব, কিন্তু বাথরুমের পর হাত ধোয়া ওয়াজিব। নাপাকি স্পর্শ করলে ভেজা ট্যাপ-বদনা নাপাক হয়।
৩. সন্দেহ থাকলে পাত্র ধুয়ে নিন, তবে অন্যদের হাত সাধারণত পবিত্র ধরা হয় যদি নাপাকি নিশ্চিত না হয়।
৪. হারাম উপার্জনের প্রাধান্য থাকলে তার বাড়িতে খাওয়া জায়েজ নয়।
৫. আগের জিনিসগুলোর জন্য তওবা করুন, হিসাবমতো টাকা সদকা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ ও আমল করার তাওফিক দিন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।