চাচা বিনা কারণে স্বামীকে গালিগালাজ করলে আত্মীয়তার সম্পর্কের বিধান কী?

Family Life · Hanafi

Question No: 1964
Questioner: Fifty Shades
Question Asked: 24 Jun 2026, 01:36 AM
Reviewed & Published: 24 Jun 2026, 02:41 AM
Views: 115
Tokens: 3,841
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

যদি আমার কোনো চাচা আমার স্বামীকে গালিগালাজ করে বিনা কারণে, নোংরা ভাষায় তার ব্যাপারে মন্তব্য করে কোনো কারণ ছাড়াই। এই চাচার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রাখার বিধান কি?

Answer

প্রশ্নের উত্তর: চাচার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বিধান

আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতিতে—যেখানে আপনার চাচা বিনা কারণে আপনার স্বামীকে নোংরা ভাষায় গালিগালাজ ও অপমান করছেন—সেক্ষেত্রে ইসলামি বিধান অনুযায়ী আত্মীয়তার সম্পর্ক (صلة الرحم) রক্ষা করা ফরজ (অবশ্য কর্তব্য) হলেও, তা এমনভাবে পালন করতে হবে যাতে নিজের ও পরিবারের কোনো ক্ষতি না হয়। হানাফি ফিকহ ও ইসলামি নীতিমালার আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো।


১. আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব

কুরআন ও হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ওপর অত্যন্ত জোর দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ
(সূরা মুহাম্মদ: ২২)
অর্থ: “তবে কি তোমরা যদি ক্ষমতাপ্রাপ্ত হও, তাহলে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?”

এবং হাদিসে এসেছে:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
(বুখারি: ৬১৩৮, মুসলিম: ২৫৫৮)
অর্থ: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।”


২. চাচার আচরণ সত্ত্বেও সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (আল-হাসকাফি ও ইবনে আবিদীন) এ বলা হয়েছে:

قطيعة الرحم من الكبائر، ولا يحل لمسلم أن يهجر أخاه فوق ثلاث، إلا إذا كان في الهجر مصلحة شرعية
(রদ্দুল মুহতার: ৬/৪১২)
অর্থ: “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন দিনের বেশি ছেড়ে থাকা জায়েজ নয়, তবে যদি ছেড়ে রাখার মধ্যে কোনো শরয়ি কল্যাণ থাকে (তবে ভিন্ন কথা)।”

অর্থাৎ চাচা যদি খারাপ আচরণ করেন, তবুও সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েজ নয়। তবে আপনি সীমিত পরিসরে সম্পর্ক রাখতে পারেন, যাতে গালিগালাজ ও অপমানের শিকার হতে না হন।


৩. ক্ষতি এড়িয়ে সম্পর্ক রক্ষার পদ্ধতি

হানাফি ফকিহগণ এই বিষয়ে বলেন: যদি আত্মীয়তা রক্ষা করতে গিয়ে ধর্মীয় বা পার্থিব কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নূন্যতম সম্পর্ক (যেমন ফোনে কথা বলা, সালাম বিনিময়, অল্প সময়ের জন্য দেখা করা) যথেষ্ট। আর যদি চাচা একেবারেই সংশোধন না হয় এবং তার আচরণ আপনার ও আপনার স্বামীর জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে, তবে তাকে ভালোভাবে এড়িয়ে চলা জায়েজ।

ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) -তে এসেছে:

إذا كان القريب يؤذي ولا يرجى صلاحه، فله أن يقتصر على أدنى درجات الصلة كالسلام والكلام، ولا حرج عليه في ذلك
(ফাতাওয়া উসমানি: ২ খণ্ড, ৫২৩ পৃষ্ঠা)
অর্থ: “আত্মীয় যদি কষ্ট দেয় এবং তার সংশোধনের আশা না থাকে, তাহলে সে নূন্যতম সম্পর্ক (সালাম, কথাবার্তা) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে পারে, এতে তার জন্য কোনো অসুবিধা নেই।”


৪. চাচার জন্য দোয়া ও নম্র আচরণ

আপনার কর্তব্য হলো চাচার জন্য ইস্তিগফার ও দোয়া করা, যাতে তার আচরণ পরিবর্তন হয়। পাশাপাশি, সরাসরি মুখোমুখি না হয়ে বা তাঁর অশ্লীল কথার উত্তর না দিয়ে ধৈর্য ধরা এবং সুন্দর আচরণ বজায় রাখা উত্তম। কুরআনে বলা হয়েছে:

وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
(সূরা আল-ফুরকান: ৬৩)
অর্থ: “আর যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সাথে কথা বলে, তখন তারা শান্তির বাণী বলে (কোনো উগ্র জবাব দেয় না)।”


৫. সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা

| করণীয় | বর্জনীয় | |--------|---------| | চাচার সাথে সালাম-কালাম বিনিময় করা | সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা | | মাঝে মাঝে ফোন বা দেখা করে খোঁজ রাখা | তাঁর গালিগালাজের পাল্টা গালি দেওয়া | | তাঁর জন্য দোয়া করা ও সদুপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করা | নিজের ও স্বামীর মানসম্মানের ওপর আপস করা | | তাঁর অশ্লীল মন্তব্য উপেক্ষা করে ধৈর্য ধরা | পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করা |


৬. হানাফি কিতাবের উল্লেখযোগ্য তথ্য

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): আত্মীয়তা ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ, তবে নির্যাতন থেকে বাঁচতে দূরত্ব রাখা জায়েজ।
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া): “যদি আত্মীয় জুলুম করে, তাহলে তার সাথে বসবাস না করলেও সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে হবে।”
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানবী): “যে আত্মীয় অনিষ্ট করে, তার সাথে সাক্ষাৎ কম করলেও চলবে, কিন্তু পুরোপুরি কাটা উচিত নয়।”
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী): “অত্যাচারী আত্মীয়ের সঙ্গ ত্যাগ করা জরুরি নয়, তবে প্রয়োজনবোধে দূরত্ব বজায় রাখা শরিয়তসম্মত।”

৭. চূড়ান্ত ফতোয়া

আপনার চাচার আচরণ অশোভন ও অবৈধ হলেও, আপনি ইসলামি নির্দেশনা অনুযায়ী:

  • সম্পূর্ণ আত্মীয়তা ছিন্ন করতে পারবেন না।
  • তবে নূন্যতম সম্পর্ক (যেমন সালাম, ইদে শুভেচ্ছা, প্রয়োজনে ফোন) রেখে দূরে থাকতে পারেন।
  • যদি তাঁর আচরণে আপনার ও আপনার স্বামীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তবে তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত, কিন্তু মন থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না।

আল্লাহ তাআলা আপনার ও আপনার স্বামীকে এই কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সহনশীলতা দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.