পরিবারের কেউ নেশা করলে করণীয় কি? তার সম্পর্কে পরিবারের অন্যকে সতর্ক করলে কি গীবত হবে?
Family Life · Hanafi
Question
এখন আমার ভাইয়ের বয়স প্রায় ২৫ বছর। এই দীর্ঘ সময়ের বেশিরভাগ সময় আমি বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করেছি। কিন্তু আমার ভাই সেই ৮ বছর বয়স থেকে যাদের সঙ্গে মিশত এবং নেশা করত, তাদের সঙ্গ কখনো ছাড়েনি। আমার বাবা তাকে শাসন করতেন, মা বাধা দিতেন বলে মনে হতো, কিন্তু বাস্তবে মা প্রায়ই তাকে সমর্থন করতেন। সে মায়ের কাছ থেকে টাকা চাইত, আর মা তাকে টাকা দিতেন। নেশার ব্যাপারে ধরা পড়লেও মা বিষয়টি বুঝতে পেরেও অনেক সময় তাকে প্রশ্রয় দিতেন। আমরা তখন ভাবতাম, হয়তো এটা মায়ের অতিরিক্ত মমতা।
কিন্তু এখন আমার ভাই একজন অপরাধপ্রবণ মানুষে পরিণত হয়েছে। সে পরিবারের প্রায় সবার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে, ব্যবসা করবে বলে বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ টাকা নিয়েছে। টাকা নেওয়ার পর সে হঠাৎ উধাও হয়ে যেত, ফোন বন্ধ করে দিত, কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখত না। এক-দুই মাস পর ফিরে এসে নতুন নতুন গল্প বানাত—বলত তার কোনো সমস্যা হয়েছে, ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে। সে কান্নাকাটি করত, প্রতিশ্রুতি দিত যে আর কখনো এমন করবে না, খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশবে না, মনোযোগ দিয়ে কাজ করবে। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সবার বিশ্বাস অর্জন করে একই কাজ করত।
এভাবে সে আমার বাবার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি করেছে। আমার, আমার বোনের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ক্ষতি করেছে। অনেক আত্মীয় তাকে টাকা দেননি কারণ তারা সতর্ক ছিলেন, কিন্তু পরিবারের বহু সদস্যকে সে প্রতারণা করেছে।
সে নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না। এমনকি তার ঈমানের অবস্থাও নিয়ে আমার মনে সন্দেহ জাগে। সে প্রচুর গালিগালাজ করে। বড় হওয়ার পর একাধিকবার আমার বাবার গায়ে হাত তুলেছে এবং বাবাকে আহত করেছে, যখন বাবা তাকে শাসন করার চেষ্টা করেছেন। এত কিছুর পরও আমার মা তাকে বাড়িতে আশ্রয় দেন এবং সমর্থন করেন। ফলে পুরো পরিবার অশান্তিতে থাকে। অথচ মা এমন ভাব করেন যেন তিনি কিছুই বোঝেন না, যদিও সবাই তাকে বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলেছে।
আমি পরিবারের সবাইকে আমার ভাই সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেছি। কারণ আমার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে টাকা না পেলে সে আরও ভয়ংকর কিছু করতে পারে, যেমন কাউকে ক্ষতি করা বা অপহরণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়া। এই আশঙ্কার কথাও আমি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছি।
এখন আমার প্রশ্ন হলো—আমি কি এভাবে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে গীবত করেছি? আর এই পরিস্থিতির কারণে আমি আমার মায়ের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চাই। আমার ভাইয়ের সঙ্গে আমি নিজের নিরাপত্তার জন্য সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছি। আমি মাকে বহুবার বুঝানোর চেষ্টা করেছি, অসংখ্যবার নসিহত করেছি, আর্থিক ও পারিবারিক ক্ষতির উদাহরণ দিয়েছি, কিন্তু তিনি কোনো পরিবর্তন আনেননি। ইসলামের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে তার জ্ঞান থাকলেও তিনি সেগুলোর অধিকাংশই অনুসরণ করেন না; শুধু নামাজ পড়েন এবং কোনো রকমে পর্দা করেন।
এ অবস্থায় যদি আমি আমার মায়ের সঙ্গে কিছুটা সীমিত দূরত্ব বজায় রাখি, তাহলে কি আমি গুনাহগার হব?
Answer
প্রশ্নোত্তর: গীবত, আত্মরক্ষা ও মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক
প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার
প্রশ্নকারিণী তাঁর ছোট ভাইয়ের নেশা, অপরাধপ্রবণতা, পরিবারের ক্ষতি ও মায়ের প্রশ্রয় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন এবং জানতে চেয়েছেন:
১. পরিবারের সদস্যদের ভাই সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি কি গীবত করেছেন? ২. মায়ের সঙ্গে কিছুটা সীমিত দূরত্ব বজায় রাখলে তিনি কি গুনাহগার হবেন?
উত্তর
১. গীবত সম্পর্কে ইসলামী বিধান
গীবত অর্থ অদৃশ্যে কারো দোষ চর্চা করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"গীবত হলো তোমার ভাইয়ের এমন বিষয় আলোচনা করা যা সে অপছন্দ করে।" (সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৮৯)
তবে শরিয়তে কিছু বৈধ কারণে গীবত করা জায়েয আছে। ইমাম নববী (রহ.) তাঁর 'আল-আযকার' গ্রন্থে গীবতের বৈধ কারণসমূহ উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে কয়েকটি হলো:
- অত্যাচারীর বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়া - কারো অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য সাহায্য চাওয়া
- অপকার থেকে বাঁচার জন্য সতর্ক করা - কাউকে কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য তার সম্পর্কে তথ্য দেওয়া
- অপবাদ বা অভিযোগ থেকে আত্মরক্ষা - নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য
আপনার ক্ষেত্রে, আপনি আপনার পরিবারের সদস্যদের আপনার ভাই সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এটি গীবতের শামিল হবে না, বরং এটি একটি বৈধ সতর্কীকরণ। কারণ:
- আপনি তাদের জানিয়েছেন যাতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন
- আপনার ভাই ইতিমধ্যে অনেকের ক্ষতি করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতি করার সম্ভাবনা আছে
- আপনি নিজের নিরাপত্তার জন্যও সতর্ক হয়েছেন
ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
"কাউকে কোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে তার সম্পর্কে বলা জায়েয। যেমন কেউ দেখে যে, একজন মানুষ কোনো অজ্ঞ ব্যক্তির কাছে খারাপ জিনিস বিক্রি করছে বা প্রতারণা করছে, তাহলে সে ক্রেতাকে সতর্ক করতে পারে।" (আল-আযকার, পৃষ্ঠা ৩৪০)
আপনার ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়াটাও আত্মরক্ষার জন্যই হয়েছে, যা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ফেলো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)
২. মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা
মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা দূরত্ব বজায় রাখা একটি গুরুতর বিষয়। ইসলামে মা-বাবার সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের মধ্যে একজন বা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তাদের 'উহ্' শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না, বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
তবে আপনার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আপনি মায়ের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাচ্ছেন না, বরং কিছুটা সীমিত দূরত্ব বজায় রাখতে চাচ্ছেন। এটি যদি নিম্নোক্ত কারণে হয়, তাহলে তা গুনাহ হবে না:
- নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: আপনার ভাই যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তাতে আপনি যদি মায়ের কাছে আসা-যাওয়া করেন, তাহলে আপনার নিজের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে
- ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ এড়ানো: মায়ের কাছে গেলে আপনার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা আপনার জন্য অনিরাপদ
- বারবার নসিহত সত্ত্বেও মায়ের অপরিবর্তনীয় অবস্থান: আপনি বহুবার মাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তিনি সাড়া দেননি
তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, মায়ের প্রতি আপনার দায়িত্ব শেষ নয়। আপনি নিম্নোক্ত উপায়ে মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন:
- ফোনে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া
- প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে মায়ের সাথে সাক্ষাৎ করা
- মায়ের আর্থিক প্রয়োজনে সাহায্য করা
- মায়ের জন্য দোয়া করা
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ফতোয়ায়ে শামীতে উল্লেখ করেছেন:
"মা-বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম এবং কবীরা গুনাহ, তবে যদি কোনো শরয়ি কারণে তা করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে ভিন্ন কথা।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৫)
আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করছেন না, বরং নিজের নিরাপত্তার জন্য সীমিত দূরত্ব বজায় রাখছেন, তাই ইনশাআল্লাহ আপনি গুনাহগার হবেন না।
পরামর্শ
১. পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হোন: আপনার ভাইয়ের সমস্যা সমাধানে পরিবারের সদস্যরা এক হয়ে কাজ করুন।
২. পেশাদার সাহায্য নিন: আপনার ভাইয়ের নেশার চিকিৎসার জন্য পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।
৩. মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখুন: সম্পূর্ণ দূরত্ব না রেখে ফোনে বা নিরাপদ পরিবেশে মায়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
৪. ভাইয়ের জন্য দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে আপনার ভাইয়ের হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন।
৫. প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিন: যদি আপনার ভাই কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করে বা অপরাধমূলক কাজ করে, তাহলে প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নেওয়া জায়েয।
রেফারেন্স
- কুরআন: সূরা আল-বাকারা (২:১৯৫), সূরা বনী ইসরাঈল (১৭:২৩-২৪)
- সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৮৯ (গীবতের সংজ্ঞা)
- আল-আযকার, ইমাম নববী (গীবতের বৈধ কারণ)
- রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৫ (মা-বাবার সাথে সম্পর্ক)
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫২ (গীবত ও সতর্কীকরণ)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩২০ (পারিবারিক সম্পর্ক ও আত্মরক্ষা)