স্বামী ৩ তালাক দিয়েছে,আমার বিবাহ কি বৈধ আছে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
بسم اللہ الرحمن الرحیم
الحمد لله، والصلاة والسلام على سيدنا محمد، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
প্রশ্নকারিণী তার স্বামীর সাথে তিন বছর বিবাহিত। দেড় বছর আগে ঝগড়ার সময় ফোনে স্বামী তালাকের কথা বলেছিলেন বলে মনে পড়ে, কিন্তু নিশ্চিত নন। সাত মাস পর আবার ঝগড়ার সময় তালাকের কথা বলেছিলেন কিনা সন্দেহ। স্বামীও কিছু মনে করতে পারেন না ও কোনো সাক্ষী নেই। এর ছয় মাস পর স্বামী একসাথে "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" বলে দেন। এখন তিনি জানতে চান: কয়টি তালাক কার্যকর হয়েছে? তার বিবাহ বৈধ আছে কী? তিনি স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চান, তার একটি মেয়ে রয়েছে, অন্য কাউকে বিয়ে করতে চান না।
উত্তর:
প্রথমেই বলে নেওয়া জরুরি যে, ইসলামি ফিকহে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্পষ্ট ও নিশ্চিত উচ্চারণ অপরিহার্য। সন্দেহ, ভুল বা অস্পষ্ট কথার মাধ্যমে তালাক পতিত হয় না।
১. প্রথম দুই ঘটনা (দেড় বছর আগে ও সাত মাস আগে):
যেহেতু আপনার স্মৃতি অস্পষ্ট, স্বামীরও কিছু মনে নেই এবং কোনো সাক্ষী নেই, সেহেতু এই দুই ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
"الشك لا يرفع اليقين" – "সন্দেহ নিশ্চিত জ্ঞানকে দূর করে না।"
এবং "الأصل بقاء النكاح" – "মূল বিধান হলো বিবাহ অটল থাকা।"
সুতরাং এই দুইবারের ঘটনাকে তালাক গণ্য করা যাবে না।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫০; আল-হিদায়া, ২/৩৪০)
২. তৃতীয় ঘটনা (ছয় মাস আগে):
এই ঘটনায় স্বামী স্পষ্টভাবে একসাথে বলেছেন: "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।"
হানাফি মতে, একসাথে একাধিক তালাক বললে সমস্ত তালাক কার্যকর হয় এবং তা তালাকে মুগাল্লাযা (অপরিবর্তনীয় তালাক) গণ্য হয়।
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এবং আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে একসাথে তিন তালাককে এক তালাক গণ্য করা হতো, কিন্তু পরবর্তীকালে উমর (রা.) আইনগত শাস্তি হিসেবে এটিকে তিন তালাক কার্যকর করার নির্দেশ দেন। হানাফি মাযহাব এই মত গ্রহণ করেছে।
(সুনানে বায়হাকী, ৭/৩৩৫; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯১; ফাতাওয়া শামী, ৩/৩০০)
অতএব, এই ঘটনার কারণে তিন তালাক কার্যকর হয়েছে এবং আপনার বিবাহ সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
৩. বর্তমান অবস্থা ও করণীয়:
-
এখন আপনি স্বামীর জন্য হারাম হয়ে গেছেন। আপনারা পুনরায় একসাথে থাকতে পারবেন না।
-
একই স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ করার জন্য হালালা (অর্থাৎ আপনি অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করে তার সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করা এবং তারপর সেই বিবাহ স্বাভাবিকভাবে শেষ হওয়া) আবশ্যক। তবে হালালা অত্যন্ত অপছন্দনীয় ও গুনাহের কাজ, তাই অধিকাংশ আলেম বলেন: হালালার শর্ত পূরণ করতে গিয়ে ইসলামের সীমা লঙ্ঘন করবেন না।
(আল-হিদায়া, ২/৩৫০; রদ্দুল মুহতার, ৩/৩৪০) -
আপনার একটি মেয়ে রয়েছে। সন্তানের লালন-পালনে মায়ের অধিকার অগ্রগণ্য। তবে তালাকের পর আপনার জন্য মেয়েকে নিয়ে স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো বৈধ পথ নেই যতক্ষণ না হালালা সম্পন্ন হয়।
৪. বিশেষ পরামর্শ:
- আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবেন না, তাহলে আপনার উচিত স্বামীকে বিষয়টি বিস্তারিত জানিয়ে কোনো দ্বীনি আলেমের শরণাপন্ন হওয়া।
- যদি স্বামী স্বীকৃতি দেয় যে তিনি তালাক দিয়েছেন, তাহলে তিনি আপনার জন্য পরকীয়া। কোনো অবস্থাতেই তার সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখবেন না।
- তালাকের পর ইদ্দত পালন করা আবশ্যক। যেহেতু তৃতীয় ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেছে, তাই আপনার ইদ্দত (তিন মাসিক বা তিন মাস) ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন আপনি অন্যত্র বিবাহ করতে স্বাধীন। কিন্তু আপনি যদি পুনরায় একই স্বামীর কাছে ফিরতে চান, তাহলে হালালা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
মূল সিদ্ধান্ত:
- প্রথম দুই ঘটনায় তালাক হয়নি।
- তৃতীয় ঘটনায় তিন তালাক কার্যকর হয়েছে, ফলে বিবাহ বাতিল।
- বর্তমানে আপনি স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম।
- পুনরায় ফিরে যেতে হলে হালালা আবশ্যক, যা করা কঠিন ও ইসলামি দৃষ্টিতে কাম্য নয়।
- তাই এক্ষেত্রে উত্তম হলো ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করা। আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে নিজের অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে থাকবেন এবং প্রয়োজনে দ্বীনি আলেমের সাহায্য নেবেন।
উল্লেখ্য:
- হানাফি মতে, "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" বললে তিন তালাকই পতিত হয়।
- কোনো সাক্ষী না থাকলেও স্বামীর স্পষ্ট উচ্চারণই যথেষ্ট। তবে আপনার প্রথম দুই ঘটনার অস্পষ্টতার কারণে সেগুলো তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
আল্লাহ তাআলা আপনার ও আপনার সন্তানের জন্য কল্যাণময় পথ নির্দেশ করুন।
(ফাতাওয়া শামী, ৩/২৯০; ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৩৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৫৫)
والله أعلم بالصواب