তাকদীরে মুবরাম ও মু‘আল্লাক সম্পর্কে হানাফী ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 1929
Questioner: Fatema Khatun Fayza
Question Asked: 23 Jun 2026, 09:43 AM
Reviewed & Published: 23 Jun 2026, 09:50 AM
Views: 91
Tokens: 7,433
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, হুজুর। নিম্নলিখিত তথ্য ও তার বর্ণনা সঠিক কি না?
উত্তরের জন্য জাযাকাল্লাহ।

" 'বিয়ে' তাকদীরে মুবরাম কিন্তু 'কার' সাথে বিয়ে হবে এইটা তাকদীরে মুআল্লাক।

তাকদীরে মুবরাম হলো সেই তাকদীর যা পূর্বে থেকেই লিপিবদ্ধ আছে এবং কোনো অবস্থাতেই খণ্ডনীয় নয় অর্থাৎ দুআর উছিলায় পরিবর্তিত হবে না। তাকদীরে মুআল্লাক হলো যে তাকদীর ঝুলন্ত সিদ্ধান্তের মতো থাকে অর্থাৎ দুআ/চেষ্টার উছিলায় পরিবর্তনীয়!

এবার বলি আসল কথা যা আমি বলতে চাইছিলাম,
অনেকে একটা কথা বলে থাকেন জন্ম মৃত্যু বিয়ে লিপিবদ্ধ আছে এর কোনো খণ্ডন হবে না। হ্যাঁ কথা সত্য তবে এখানে বিয়ে লেখা আছে বলতে এমনটা বোঝানো হয় যে 'জীবনসঙ্গী সুনির্ধারিত' কিন্তু মূলত এখানে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।

কারো 'বিয়ে হবে নাকি হবে না' এটা সুনির্ধারিত কিন্তু জীবনসঙ্গী কে হবে তা সুনির্ধারিত নয় বরং এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ঝুলন্ত সিদ্ধান্ত অর্থাৎ আপনি দুআ এবং উত্তমরূপে খোঁজ খবর নিয়ে প্রচেষ্টার দ্বারা একজন মনের মতো জীবনসঙ্গী পেতেও পারেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহর কাছে প্রকৃত তাকওয়াবান, উত্তম আখলাক এবং চক্ষুশীতলকারী জীবনসঙ্গী চান, সাথে এটাও চাইবেন যেনো আপনি তার জন্য চক্ষুশীতলকারিণী হন। যতই সুন্দর হোক দেখতে, তাকওয়া না থাকলে বাকি সবগুলো ধূলোয় মিশে যায়।"

Answer

উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নে উল্লেখিত তথ্য ও বর্ণনা মূলত সঠিক, তবে কিছু সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা এবং হানাফী ফিকহের আলোকে পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী কিতাবের রেফারেন্স সহ বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


১. তাকদীরের প্রকারভেদ : মুবরাম ও মু‘আল্লাক

হানাফী আকীদা ও ফিকহের কিতাবে তাকদীর দুই ভাগে বিভক্ত:

ক. তাকদীরে মুবরাম :
এটি সেই তাকদীর যা লাওহে মাহফূযে চূড়ান্তভাবে লিখিত এবং কখনো পরিবর্তন হয় না। যেমন: জন্ম, মৃত্যু, রিজিকের পরিমাণ, ঈমান-কুফর ইত্যাদি।
(সূত্র: রাদ্দুল মুহতার, ১/৫১; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৮; বাহিশতি জেওর, আকায়েদ অধ্যায়)

খ. তাকদীরে মু‘আল্লাক :
এটি সেই তাকদীর যা শর্ত সাপেক্ষে লেখা হয়েছে। যেমন: দু‘আ, সদকা, সৎকর্ম ইত্যাদির মাধ্যমে তা পরিবর্তিত হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"لا يَرُدُّ الْقَضَاءَ إِلَّا الدُّعَاءُ"
"দু‘আ ছাড়া আর কিছুই তাকদীরকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।"
(তিরমিযী, হাদীস: ২১৩৯; ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৯০; মিশকাত, হাদীস: ২২২৮)

ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:

"وَكُلُّ شَيْءٍ يَجْرِي بِتَقْدِيرِهِ وَمَشِيئَتِهِ، وَمَا شَاءَ اللَّهُ كَانَ، وَمَا لَمْ يَشَأْ لَمْ يَكُنْ"
"প্রত্যেক বস্তুই আল্লাহর তাকদীর ও ইচ্ছায় সংঘটিত হয়। তিনি যা চান তা হয়, যা চান না তা হয় না।"
(আল-আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ)


২. বিয়ে ও তাকদীর : মুবরাম না মু‘আল্লাক?

প্রশ্নে বলা হয়েছে: "বিয়ে তাকদীরে মুবরাম, কিন্তু কার সঙ্গে বিয়ে হবে তা তাকদীরে মু‘আল্লাক।"

হানাফী ফিকহের আলোকে এ কথা আংশিক সঠিক। বিশ্লেষণ:

ক. বিয়ে হবে কি হবে না – এটি ব্যক্তির তাকদীরের একটি অংশ। কেউ বিয়ে করবে কি না, এটি আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞানে নির্ধারিত। তবে এটি মুবরাম বললে ভুল হবে না, কারণ বিয়ে মৃত্যুর মতো অনিবার্য নয়; বরং অনেকেই সারা জীবন অবিবাহিত থাকেন। তাই এটাকে মুবরাম না বলে লিখিত ও জ্ঞাত বলা অধিক সঙ্গত। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"الْأَقْوَالُ وَالْأَفْعَالُ كُلُّهَا بِتَقْدِيرِ اللَّهِ تَعَالَى"
"সকল কথা ও কাজ আল্লাহর তাকদীর অনুসারেই হয়।"
(রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৭)

খ. জীবনসঙ্গী নির্ধারণ – এটি মু‘আল্লাক অর্থাৎ দু‘আ, ইস্তিখারা, প্রচেষ্টা ও আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তাই বলা হয়:
"জীবনসঙ্গী কে হবে, তা দু‘আ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য।"
এ কথাটি সহীহ হাদীস ও হানাফী ফতোয়া দ্বারা সমর্থিত। ইমাম মালিক (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"الدُّعَاءُ يَرُدُّ الْبَلَاءَ وَيَزِيدُ فِي الرِّزْقِ"
"দু‘আ বিপদ দূর করে এবং রিজিক বৃদ্ধি করে।"
(মিশকাত, হাদীস: ২২৩০)

তাই “বিয়ে হবে কি হবে না” তা যেমন নির্ধারিত, তেমনি “কার সঙ্গে বিয়ে হবে” তাও সম্পূর্ণ অনির্ধারিত নয়; বরং তা দু‘আ ও চেষ্টার অনুপাতে পরিবর্তন সাপেক্ষ।


৩. তাকওয়া ও আখলাকের গুরুত্ব

আপনার শেষোক্ত মন্তব্য:

“আল্লাহর কাছে প্রকৃত তাকওয়াবান, উত্তম আখলাক এবং চক্ষুশীতলকারী জীবনসঙ্গী চান... যতই সুন্দর হোক দেখতে, তাকওয়া না থাকলে বাকি সবগুলো ধূলোয় মিশে যায়।”

এ কথা শতভাগ সঠিক। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

"إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ"
"নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই বেশি মর্যাদাবান, যে বেশি তাকওয়াবান।"
(সূরা হুজুরাত: ১৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ"
"মেয়েকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয়: সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য এবং দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলিমাখা হোক।"
(বুখারী, হাদীস: ৫০৯০; মুসলিম, হাদীস: ১৪৬৬)

ইমাম শাফি‘ঈ (রহ.) বলেন:

"مَنْ طَلَبَ الدُّنْيَا بِالْحَرَامِ فَاتَتْهُ، وَمَنْ طَلَبَهَا بِالْحَلَالِ فَاتَتْهُ أَوْ أَدْرَكَتْهُ، وَمَنْ طَلَبَ الْآخِرَةَ بِالطَّاعَةِ أَدْرَكَهَا وَلَهُ حَظُّهُ مِنَ الدُّنْيَا"
"যে হারাম দ্বারা দুনিয়া চায়, তা তার হাতছাড়া হয়; আর যে হালাল দ্বারা চায়, হয় তা পায় না অথবা পায়; আর যে ইবাদতের মাধ্যমে আখিরাত চায়, সে তা পায় এবং দুনিয়াও তার ভাগে আসে।"


সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া:

| বিষয় | অবস্থান | |------|---------| | বিয়ে হবে কি হবে না | তাকদীরে লিখিত, তবে তা মুবরাম নয়; বরং দু‘আ ও প্রচেষ্টার দ্বারা পরিবর্তন সাপেক্ষ। | | জীবনসঙ্গী কে হবে | তাকদীরে মু‘আল্লাক; দু‘আ, ইস্তিখারা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা ভালো হতে পারে। | | তাকওয়া ও আখলাকের গুরুত্ব | সৌন্দর্যের চেয়ে তাকওয়া ও চরিত্র অধিক গুরুত্বপূর্ণ। |

পরামর্শ:

  • বিয়ে করার আগে ইস্তিখারাপরামর্শ করুন।
  • উত্তম জীবনসঙ্গী লাভের জন্য নিয়মিত দু‘আ করুন।
  • শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, দ্বীন ও চরিত্র কে প্রাধান্য দিন।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.