ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বিবাহের নিয়ম, সামাজিক কুপ্রথা বর্জন ও পাত্র-পাত্রীপক্ষের দিকনির্দেশনা।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১: ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বিবাহের নিয়মকানুন কেমন হওয়া উচিত?
২: সামাজিক কোন কোন নিয়মকে উপেক্ষা করা উত্তম?
৩: পাত্রপক্ষ ও পাত্রীপক্ষের জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা যা মেনে চলতে হবে।
উক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে পরিস্কার ধারণার প্রয়োজন, জাজাকাল্লাহ খাইরান।
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ
আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো—
১. ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী বিবাহের নিয়মকানুন কেমন হওয়া উচিত?
ইসলামী শরীয়তে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বিবাহের জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলী ও নিয়মাবলী পালন করা আবশ্যক:
(ক) বিবাহের রুকন (অপরিহার্য উপাদান):
১. ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) – একই বৈঠকে পরস্পরের সম্মতির মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে।
২. সাক্ষী – দুইজন মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী থাকা আবশ্যক। (সূরা বাকারা: ২৮২; হিদায়া, ২/৩)
৩. মহর – স্ত্রীর জন্য নির্ধারিত মোহরানা ফরয, তা নগদ বা বাকি যেকোনোভাবে দেওয়া যেতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/১০২)
(খ) বিবাহের সুন্নত ও মুস্তাহাব:
- বিবাহের আগে খাসিয়া (বিবাহের খুতবা) পড়া সুন্নত।
- বিবাহ সহজ ও সরলভাবে পালন করা। অযথা খরচ, দাম্ভিকতা ও বাহুল্য থেকে বিরত থাকা।
- মসজিদে বা ঘরে বিবাহ পড়ানো উত্তম।
- বিবাহের পর ওলিমা (বিবাহের ভোজ) দেওয়া, তা কমপক্ষে একটি বকরি দিয়ে হলেও কর্তব্য।
(গ) বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রীর বৈশিষ্ট্য:
- দ্বীনদারি ও চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া (বুখারী, ৫০৯০)।
- কুফু (সামঞ্জস্যতা) – বংশ, ধর্মপরায়ণতা, সম্পদ ও পেশায় সমতা বিবেচনা করা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫২)
(ঘ) বিবাহের হারাম ও নাজায়েয বিষয়:
- বিনা সাক্ষীতে বিবাহ (হাদীস: ইবনে মাজাহ, ১৮৮১)।
- ইদ্দতের নারীর সাথে বিবাহ।
- বিয়ে শুধু প্রেম বা সামাজিক স্ট্যাটাসের জন্য করা, দ্বীনকে উপেক্ষা করে নয়।
২. সামাজিক কোন কোন নিয়মকে উপেক্ষা করা উত্তম?
নিম্নলিখিত সামাজিক কুপ্রথাগুলো ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী, তাই এগুলো পরিত্যাগ করা কর্তব্য:
১. যৌতুক প্রথা – এটি সম্পূর্ণ হারাম ও ইসলামের চরম লঙ্ঘন। পাত্রপক্ষের চাহিদা বা দাবি মেনে নেওয়া জায়েয নয়। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪১২)
২. বিয়েতে ধর্মীয় স্থান ব্যবহার –
বিয়ে মসজিদে পড়ানো মুস্তাহাব,তবে ঘরেও পড়ানো যাবে।
৩. বিয়ের আয়োজনে অশ্লীলতা, গান-বাজনা, নাচ-গান – যদিও দফ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বৈধ, অন্য বাদ্যযন্ত্র ও অশ্লীল গান হারাম।
৪. অতিরিক্ত খরচ ও বাড়াবাড়ি – বিয়েতে পরিমিত খরচ করা সুন্নত, আড়ম্বর, ও অপচয় করা নাজায়েয।
৫. পাত্রপক্ষের পক্ষ থেকে অযথা শর্ত আরোপ করা – যেমন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বা সম্পদ দাবি করা, এটি উত্তম পদ্ধতি নয়।
৬. বিয়ের আগে গোপনে দেখা-সাক্ষাৎ – শরীয়তে মৌলিক দেখা (শরিয়াহ সম্মত পর্দার মধ্যে) জায়েয, কিন্তু গোপনে একান্তে মিলিত হওয়া নাজায়েয।
(বেহেশতী জেওর, ৪র্থ ভাগ; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩০)
৩. পাত্রপক্ষ ও পাত্রীপক্ষের জন্য বিশেষ দিকনির্দেশনা
পাত্রপক্ষের জন্য:
- পাত্রীর দ্বীনদারি, চরিত্র ও সচ্চরিত্রকে অগ্রাধিকার দিন।
- যৌতুকের লোভ করবেন না। নবী করিম ﷺ বলেন: “সর্বোত্তম বিবাহ তা যাতে সহজে সম্পন্ন হয়।” (ইবনে হিব্বান)
- পাত্রীকে তার পিতা বা অভিভাবকের কাছ থেকে পূর্ণ ইজ্জতের সাথে বিবাহ করুন।
- বিবাহের পর স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার করুন এবং তার অধিকার নিশ্চিত করুন। (সূরা নিসা: ১৯)
- বিবাহের খরচ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করুন, অন্যের উপর বোঝা করবেন না।
পাত্রীপক্ষের জন্য:
- দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র পাত্র বাছাই করুন। রাসূল ﷺ বলেন: “তোমাদের কাছে কেউ বিবাহের প্রস্তাব দিলে, যদি তার দ্বীন ও চরিত্র পছন্দ করো, তবে তাকে বিবাহ দাও।” (তিরমিযী, ১০৮৪)
- মোহরানা নির্ধারণে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করুন। খুব বেশি মোহরানা নির্ধারণ করা উচিত নয়, কারণ রাসূল ﷺ বলেন: “সর্বোত্তম মোহরানা হল সহজে দেওয়া যায় এমন।” (আবু দাউদ)
- মেয়ের সম্মতি অবশ্যই নিন। অপ্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের সম্মতি জরুরি, তবে প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ের পরিষ্কার সম্মতি ছাড়া বিবাহ বৈধ নয়। (বুখারী, ৫১৩৬)
- বিবাহের সময় পর্দা ও শালীনতা রক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা নিন।
উভয় পক্ষের জন্যই মনে রাখতে হবে যে বিবাহ একটি ইবাদত, শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান নয়। তাই এর প্রতিটি ধাপে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করা আবশ্যক।
والله أعلم بالصواب