প্রিসেটের নাম আপত্তিকর হলেও নির্গত সাউন্ডে কোনো কুফরি শব্দ নেই। এমন সাউন্ড কি তৈরী করা যাবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
মুহতারাম, আমি এর আগে একটি সিন্থেসাইজারের বিল্ট-ইন রিভার্ব প্রিসেট—যার নাম "Church" বা "Cathedral"—ব্যবহার করে সাউন্ড ইফেক্ট তৈরি করার বিষয়ে একটি প্রশ্ন করেছিলাম। তখন আমাকে জানানো হয়েছিল যে, রিভার্ব প্রিসেট মূলত একটি অডিও ইফেক্ট মাত্র, যা কোনো জায়গার অ্যাকোস্টিক বা প্রতিধ্বনিকে অনুকরণ করে এবং এর সাথে কুফরের সম্পর্ক নেই।
(রেফারেন্সের জন্য পূর্বের প্রশ্নের লিংক: https://islamqapro.com/q/1776/saund-ifekte-cathedralchurch-rivarw-priset-bzbhar-kra-ki-kufri-hbe )
পূর্বের উত্তরটি পেয়ে আমি স্বস্তি পেলেও, বর্তমানে একটি নতুন বিষয়ে সংশয় ও দুশ্চিন্তা আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে।
আমি একজন সাউন্ড ডিজাইনার এবং মিউজিক কম্পোজার। মিউজিকের কাজ শরিয়তসম্মত না হওয়ায় আমি বর্তমানে শুধু সাধারণ ও সাই-ফাই (sci-fi) সাউন্ড ইফেক্ট, ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাম্বিয়েন্ট টেক্সচার এবং ড্রোন সাউন্ড তৈরির কাজ করি। এই সাউন্ডগুলো তৈরি করতে আমাকে কম্পিউটারের DAW (Digital Audio Workstation) সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সিন্থেসাইজার অথবা VST Software (ভার্চুয়াল বাদ্যযন্ত্রের সফটওয়্যার) ব্যবহার করতে হয়।
ডিজিটাল সিন্থেসাইজার ও সফটওয়্যারগুলোতে শব্দ বা টোনের হাজার হাজার রেডিমেড সোর্স বা প্রিসেট (preset) থাকে। এগুলোর বেশিরভাগেরই নাম থাকে টেকনিক্যাল (যেমন: "FM Synth", "Sine Wave", "Strings" ইত্যাদি)। তবে কিছু প্রিসেটের নাম বেশ অদ্ভুত হয় এবং কিছু প্রিসেটের নামের মধ্যে ধর্মীয় বা শিরক/কুফর-সম্পর্কিত শব্দ থাকতে পারে। যেমন: "Church", "Cathedral" কিংবা সরাসরি শিরিকি বা কুফুরি শব্দ যেমন—গ্রিক গড (Greek God), Statue Worshiper (মূর্তি পূজারী) ইত্যাদি।
আমি গত কয়েক বছর ধরে প্রায় ৯০০টির মতো সাউন্ড ইফেক্ট এবং সাই-ফাই অ্যাম্বিয়েন্ট ট্র্যাক তৈরি করে বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিক্রি করেছি। এই সাউন্ডগুলো তৈরি করার সময় আমি প্রিসেটের নামের দিকে মোটেও খেয়াল করিনি; বরং সাউন্ডটি শুনতে কেমন লাগছে—শুধু তার ওপর ভিত্তি করে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করেছি।
আমার তৈরি করা মূল সাউন্ডগুলোর বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
সেগুলোতে কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর, ধর্মীয় জপ, প্রার্থনা, গান বা শিরক/কুফর-সম্পর্কিত কোনো বার্তা নেই।
সেগুলো সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি সাধারণ শব্দ (Non-verbal audio); যেমন: মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটির শব্দ, আর্টিফিশিয়াল উপায়ে তৈরি মেশিন ফ্যাক্টরির অ্যাম্বিয়েন্ট শব্দ, বিভিন্ন রোবোটিক সাউন্ড, সায়েন্স ফিকশন টাইপের সাউন্ড ইফেক্ট এবং ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাম্বিয়েন্ট সাউন্ড।
যেহেতু আমি আগে প্রিসেটগুলোর নামের দিকে মনোযোগ দিইনি, তাই অজান্তে যদি এমন কোনো প্রিসেট ব্যবহার করে থাকি যার নাম "Church" বা অন্য কোনো শিরিকি/কুফুরি শব্দ ছিল—তাহলে কি সেই প্রিসেটের শব্দকে ব্যবহার করে যে সাউন্ড ইফেক্ট অথবা অ্যাম্বিয়েন্ট সাউন্ড তৈরি করেছি, এটি তৈরি করার কারণে আমার কুফর বা কোনো গুনাহ হবে?
অতএব, আপনার কাছে বিনীত প্রশ্ন: যদি কোনো ডিজিটাল সাউন্ড প্রিসেটের নাম ধর্মীয়, শিরক বা কুফর-সম্পর্কিত (যেমন: গ্রিক গড, মূর্তি পূজারী ইত্যাদি) হয়ে থাকে, কিন্তু সেই প্রিসেট থেকে নির্গত মূল সাউন্ড বা শব্দের ভেতর কোনো কুফুরি বার্তা, মানুষের কণ্ঠস্বর বা ধর্মীয় উপাদান না থাকে—তবে সাউন্ড ইফেক্ট বা অ্যাম্বিয়েন্ট অডিও তৈরির জন্য কেবল ওই প্রিসেটের শব্দকে ব্যবহার করা বা সোর্স (Source) হিসেবে ব্যবহার করা কি কুফরের আওতাভুক্ত হবে?
দয়া করে শরিয়তের আলোকে উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।
(আমি জানি যে আমার প্রশ্নটি প্রথমে একটি AI (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রসেস করবে এবং এই টেকনিক্যাল টার্মস (Technical terms) বা কারিগরি বিষয়গুলো খুব সহজেই বুঝতে পারবে। পরবর্তীতে মূল মুফতি সাহেবকে দিয়ে উত্তরটি ভেরিফাইড (যাচাই) করিয়ে নেওয়া হবে।
সম্মানিত মুফতি সাহেব যেন পুরো বিষয়টি খুব সহজে এবং কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই বুঝতে পারেন, সেজন্য আমি এই সংক্ষিপ্ত ভিডিওটি তৈরি করেছি। এখানে আমার প্রশ্নের মূল পয়েন্টগুলো একদম প্র্যাক্টিক্যালি এবং ভিজ্যুয়ালি (Visual) স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। ভিডিও লিংক : https://youtu.be/CoO-0DKSQL8
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বর্ণিত সাউন্ড ডিজাইনের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং প্র্যাক্টিক্যাল। আমরা বিষয়টি বুঝতে পেরেছি এবং নিম্নে শরিয়তের আলোকে স্পষ্ট উত্তর প্রদান করছি।
মূলনীতি:
ইসলামে কর্মের বিচার নিয়ত ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে হয়। হাদীস শরীফে এসেছে:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
“নিশ্চয়ই সকল কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১)
সুতরাং কোনো জিনিসের নাম বা লেবেল যদি কুফরী বা শিরকী অর্থবহ হয়, কিন্তু সেই জিনিসের বাস্তব ব্যবহার বা ফলাফল কুফরী না হয়, তাহলে সেটি ব্যবহার করলে কুফর হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবহারকারীর নিয়ত ও বিশ্বাস কুফরী না হয়।
আপনার প্রশ্নের বিশ্লেষণ:
আপনি যে সফটওয়্যার প্রিসেট (Preset) ব্যবহার করছেন, তার নাম “Church”, “Cathedral”, “Greek God”, “Statue Worshiper” ইত্যাদি হতে পারে। কিন্তু আপনি ব্যবহার করছেন শুধু সেই প্রিসেট থেকে উৎপন্ন শব্দ (Sound)-কে, যা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, কোনো মানুষের কণ্ঠ, ধর্মীয় জপ, প্রার্থনা বা কুফরী বার্তা নেই। আপনার উদ্দেশ্যও সাউন্ড ইফেক্ট তৈরি করা, কোনো ধর্মীয় আচার বা বিশ্বাস প্রচার করা নয়।
এক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো:
১. প্রিসেটের নামের কারণে কুফর হবে না:
যেহেতু আপনি শুধু একটি টেকনিক্যাল টুল (প্রিসেট) ব্যবহার করছেন, যার নাম কুফরী হলেও আপনি সেই নামের প্রতি বিশ্বাস পোষণ করছেন না, বরং শব্দটি তৈরি করার জন্য একটি সোর্স হিসেবে ব্যবহার করছেন। এটি কোনোভাবেই কুফর বা শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
وَلَا يَكْفُرُ الْمُسْلِمُ بِفِعْلٍ أَوْ قَوْلٍ لَمْ يَقْصِدْ بِهِ الْكُفْرَ
“কোনো মুসলিম সে কর্ম বা কথার কারণে কাফির হবে না, যা দ্বারা সে কুফর ইচ্ছা করেনি।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬)
২. অজান্তে পূর্বের ব্যবহার গুনাহ নয়:
আপনি আগে প্রিসেটের নামের দিকে খেয়াল না করে শুধু সাউন্ড শুনে ব্যবহার করেছেন। এটি একটি সাধারণ ভুল, গুনাহ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
“হে আমাদের রব, যদি আমরা ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করো না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
হাদীসে এসেছে, আল্লাহ এই দোয়া কবুল করেছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১২৬)
৩. ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বন:
যদিও ব্যবহার বৈধ, তবুও তাকওয়া ও সতর্কতার জন্য এমন প্রিসেট এড়িয়ে চলা উচিত, যার নাম স্পষ্টত শিরক বা কুফরী নির্দেশ করে। ইমাম আল-হিদায়ায় এসেছে:
وَيُكْرَهُ اسْتِعْمَالُ مَا فِيهِ شُبْهَةُ الْكُفْرِ
“যাতে কুফরের সন্দেহ থাকে, তা ব্যবহার করা মাকরূহ।” (আল-হিদায়া, ৪/৮৭)
তবে যদি কোনো প্রিসেটের নাম দ্ব্যর্থবোধক বা টেকনিক্যাল হয় (যেমন “Church” শুধু একটি Reverb ইফেক্টের নাম), তাহলে সেটি ব্যবহারে কোনো অসুবিধা নেই, যেমনটি পূর্বের ফতোয়ায় বলা হয়েছে।
উপসংহার:
আপনার তৈরি করা সাউন্ড ইফেক্ট ও অ্যাম্বিয়েন্ট ট্র্যাক সম্পূর্ণ বৈধ। প্রিসেটের নাম কুফরী হলেও, সেই প্রিসেট থেকে উৎপন্ন শব্দ যদি নিরপেক্ষ হয় এবং আপনি কুফরী উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করেন, তাহলে তা কুফর বা গুনাহ নয়। পূর্বের অজান্তে করা কাজেও কোনো গুনাহ নেই। তবে উত্তম হলো—যেসব প্রিসেটের নাম স্পষ্টভাবে শিরক বা কুফর নির্দেশ করে, সেগুলো ব্যবহার না করা, অথবা নিজের ডিজিটাল লাইব্রেরিতে নাম পরিবর্তন করে রাখা।
আল্লাহ তাআলা আপনার কাজে বরকত দান করুন এবং সংশয় থেকে মুক্তি দিন। আমীন।
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী, হাদীস: ১
- রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬
- আল-হিদায়া, ৪/৮৭
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৭৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩৪