৩ তালাকের পর কি একসাথে থাকা যাবে যদি স্বামী-স্ত্রী সম্মত হয়?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 1874
Questioner: Mst.Momota Akter Momo
Question Asked: 21 Jun 2026, 02:39 PM
Reviewed & Published: 21 Jun 2026, 03:02 PM
Views: 130
Tokens: 9,888
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার বিয়ের বয়স তিন বছর। বিয়ের এক বছর পর আমার স্বামী ফোনে আমাকে এক তলাক, দুই তালাক, এভাবে বলে দেয় আর দশ দিন পরেই আমি আমার স্বামী একসাথে স্বামী স্ত্রীর মতোই থাকি। এর ছয় মাস পর আবার একদিন ঝগড়া করে রাগের মাথায় আমাকে এক তালাক কথাটি বলে দেয় কিন্তু সেদিনই আমরা রাতে একসাথে স্বামী স্ত্রীর মত শুয়ে ঘুমাই। তার আবার ছয় মাস পর খুব ঝগড়ার মধ্যে আমার স্বামীর রাগের মাথায় আমাকে এক তালাক,দুই তালাক, তিন তালাক, এভাবে বলে দেয় কিন্তু সেদিনের পরের দিন রাতেই আমরা আবার স্বাভাবিকভাবেই থাকি। এখন আমার প্রশ্ন হল এই ঘটনার গুলোর পরে আমাদের সম্পর্ক কি ইসলাম অনুযায়ী বৈধ আছে? আর যদি বৈধ না থাকে আমি আমার স্বামীর কাছেই ফিরে যেতে চাই। আমরা আগের মতই সংসার করতে চাই আমার একটা বাচ্চা আছে আমার স্বামী এই বিষয়ে আগে জানতো না এখন জেনে সে নিজেও অনুতপ্ত। আমি অন্য কোন ছেলেকে বিয়ে করতে পারবো না আমি আমার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চাই এখন আপনি বলুন আমাদের বিয়ে কি হালাল আছে না থাকলে আমরা কিভাবে আবার একত্রে সংসার করতে পারি? সে কোন তালাকি মন থেকে দেয়নি।

Answer

বক্তব্য প্রদানের পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ

প্রশ্নের মধ্যে বর্ণিত ঘটনাবলী অত্যন্ত গুরুতর এবং জটিল। একজন নারী হিসেবে আপনি যখন আপনার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে চান এবং আপনার স্বামীও অনুতপ্ত, তা জেনে আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু ইসলামী শরী‘আতে তালাকের বিধান অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটি শুধুমাত্র আবেগ বা রাগের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্দিষ্ট শর্ত ও নিয়মের ভিত্তিতে কার্যকর হয়।

নিম্নে আপনার বর্ণিত ঘটনার ধারাবাহিক বিশ্লেষণ এবং হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ফতোয়া প্রদান করা হলো।


ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ

  1. প্রথম ঘটনা: বিয়ের ১ বছর পর স্বামী ফোনে বলেন: "এক তালাক, দুই তালাক (অথবা এক তালাক, দুই তালাক বলে) দিলাম।" (এর মানে কী? আসলে আপনি লিখেছেন "এক তালাক, দুই তালাক" - এর দ্বারা তিনি কি তিন তালাক দিতে চেয়েছিলেন? নাকি শুধু গণনা করেছিলেন? এটি গুরুত্বপূর্ণ।)
  2. দ্বিতীয় ঘটনা: ৬ মাস পর ঝগড়ার সময় রাগের মাথায় বলেন: "এক তালাক।" কিন্তু সেদিন রাতে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে সহবাস করেন।
  3. তৃতীয় ঘটনা: আরও ৬ মাস পর (মোট বিয়ে ৩ বছর) ঝগড়ার সময় রাগের মাথায় বলেন: "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।" পরের দিন রাতে আবার স্বাভাবিকভাবে থাকেন।

হানাফী ফিকহের আলোকে উত্তর

প্রথম ঘটনা (ফোনে 'এক তালাক, দুই তালাক' বলা):

  • হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, ফোনে বা লিখিতভাবে তালাক দেওয়া বৈধ। যদি স্বামী স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করেন, তাহলে তা গণ্য হয়।
  • কিন্তু "এক তালাক, দুই তালাক" বলার অর্থ কী? যদি তিনি বলেন "আমি তোমাকে এক তালাক দিলাম, দুই তালাক দিলাম" - এটি মোট তিন তালাক গণ্য হবে না যদি না তিনি স্পষ্টভাবে তিন তালাকের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
  • হানাফী মত: কোনো ব্যক্তি যদি "তুমি এক তালাক, দুই তালাক" বলেন, তাহলে একটি তালাক পতিত হবে। কারণ তিনি "এক তালাক" বলার পর "দুই তালাক" বলে ফেলেছেন, কিন্তু এটি একই মজলিসে হলেও তিনি যেহেতু সংখ্যার উল্লেখ করেছেন, তাই এটি একটি তালাক হিসেবেই গণ্য হবে (রদ্দুল মুহতার)। কিন্তু অনেক ফুকাহা বলেন, যদি "দুই তালাক" এর উদ্দেশ্য দ্বিতীয় তালাক না করে শুধু গণনা করা হয়, তাহলে একটি তালাকই পতিত হয়। সুতরাং, এই ঘটনায় একটি তালাক পতিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া উচিত। (ফতোয়ায়ে উসমানী)

দ্বিতীয় ঘটনা ('এক তালাক' বলা ও পরে সহবাস):

  • এটি দ্বিতীয় তালাক। যেহেতু তিনি "এক তালাক" স্পষ্টভাবে বলেছেন, একটি তালাক পতিত হয়েছে।
  • প্রশ্ন: রাগের মাথায় দেওয়া তালাক কি বৈধ?
  • উত্তর: হানাফী মতে, অতিরিক্ত রাগ যা মানুষকে পাগল বা বেহুঁশ করে দেয় (যে অবস্থায় সে নিজের কথা বুঝতে পারে না), সেই রাগে দেওয়া তালাক বৈধ নয়। কিন্তু সাধারণ রাগ বা ক্রোধের অবস্থায় দেওয়া তালাক সম্পূর্ণরূপে বৈধ এবং গণ্য হয়। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী, রদ্দুল মুহতার)
  • যেহেতু আপনি সেদিন রাতে সহবাস করেছেন এবং তিনি তার কাজ বুঝতে পেরেছেন, বোঝা যায় তিনি সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন না। তাই এই তালাকটি পতিত হয়েছে।
  • এখন পর্যন্ত মোট তালাক: প্রথমটি + দ্বিতীয়টি = ২টি তালাক

তৃতীয় ঘটনা ('এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক' বলা):

  • এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "আমি তোমাকে এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক দিলাম" অথবা "তোমাকে আমি তিন তালাক দিলাম" - এটা মুহাল্লাজাত (তিন তালাক) গণ্য হবে।
  • হানাফী মতে, এক সাথে তিন তালাক দেওয়া (যেমন: তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক বা তিন তালাক বললাম) সম্পূর্ণরূপে কার্যকরী হয় এবং বিবাহ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায়। এটি একটি নিষেধাজ্ঞাপূর্ণ কাজ (গুনাহ) হলেও তালাক পতিত হয়। (সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
  • **তাই এই তৃতীয় ঘটনার সাথে সাথে তৃতীয় তালাক পতিত হয়ে যায় এবং আপনার বিবাহ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

উপসংহার:

আপনার বর্ণিত ধারাবাহিকতায় নিম্নরূপ রায়:

  1. প্রথম তালাক: ফোনে "এক তালাক, দুই তালাক" বলায় ১টি তালাক পতিত হয়েছে (হানাফী মতে গণনাটি একটি তালাক হিসেবে বিবেচিত)।
  2. দ্বিতীয় তালাক: "এক তালাক" বলায় ১টি তালাক পতিত হয়েছে।
  3. তৃতীয় তালাক: "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" বলায় তৃতীয় তালাক পতিত হয়েছে।

সুতরাং, বর্তমানে আপনার ও আপনার স্বামীর মধ্যে বিবাহ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে (বাইনুল মুগাল্লাজা তালাক)। আপনি এখন তার জন্য 'মাহরাম' নন। একসাথে থাকা, সহবাস করা বা স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবন যাপন করা হারাম ও জিনা


এখন আপনি কীভাবে আপনার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারেন?

ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী, যখন তৃতীয় তালাক পতিত হয়, তখন পুনরায় একই স্বামীর সাথে বিয়ে করা সম্ভব নয় যতক্ষণ না নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূর্ণ হয় (যাকে তাহলিল বা হালালা বলে):

  1. আপনি (স্ত্রী) ইদ্দত (তিনটি হায়েজ বা মাসিক চক্র) পালন করবেন।
  2. তারপর আপনি কোনো অন্য পুরুষ (যিনি আপনার জন্য বৈধ) এর সাথে সঠিক নিয়তে বিয়ে করবেন এবং সেই বিয়ে সম্পূর্ণ ও বৈধ্যভাবে সম্পন্ন হবে। সেই স্বামী আপনাকে পূর্ণাঙ্গরূপে গ্রহণ করবেন (সহবাস করবেন)।
  3. এরপর সেই দ্বিতীয় স্বামী স্বেচ্ছায় বা মৃত্যুবশত আপনাকে তালাক দিলে অথবা তিনি মারা গেলে, ইদ্দত পালনের পর আপনার পূর্বের স্বামী আপনাকে নতুন বিয়ে করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে একটি নতুন বিবাহ (নতুন মোহর, নতুন আকদ) প্রয়োজন হবে।

এটি কোনো সহজ বা কাম্য পদ্ধতি নয়। আপনি যদি বলেন "আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না" – তাহলে একমাত্র পথ হলো স্বামীর এই কাজের জন্য তওবা ও ইস্তেগফার করা এবং আপনার জন্য অপেক্ষা করা যে আল্লাহ কোনো পথ সুগম করেন। কিন্তু শরীয়তের বিধান অমান্য করে একসাথে থাকা বা হালালা পদ্ধতি ছাড়া ফিরে যাওয়া হারাম

তবে, একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

যদি স্বামী স্পষ্টভাবে "তিন তালাক" না দিয়ে শুধু "এক তালাক" বলেই থেমে যান (অর্থাৎ তিনি আসলে "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" বলে তিনটি আলাদা শব্দ না দিয়ে শুধু "এক তালাক" বলেন, যা আমরা দ্বিতীয় ঘটনায় দেখেছি), তাহলে হিসাব পরিবর্তন হবে। কিন্তু আপনি স্পষ্ট লিখেছেন "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" – যা তিন তালাকের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

আপনার জন্য সর্বোত্তম পথ:

যেহেতু আপনার স্বামী অনুতপ্ত এবং নিজেও জানেন না, অতএব আপনি দ্রুত আপনার এলাকার কোনো প্রতিষ্ঠিত মুফতি বা ইসলামি স্কলারের কাছে সরাসরি উপস্থিত হন অথবা কোনো বড় ফতোয়া বিভাগের (যেমন: দারুল উলুম দেওবন্দ, মাজহারে উলুম, জাতীয় ইমামত ইত্যাদি) কাছে লিখিতভাবে বিস্তারিত জানান। কারণ তালাকের সংখ্যা ও পরিস্থিতি নিয়ে সন্দেহ থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ মুফতি সাহেবের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করানো অত্যন্ত জরুরি।

কিন্তু বর্তমানে এই অনলাইন ফতোয়ার ভিত্তিতে নিম্নরূপ সিদ্ধান্ত নিন:

  • আপনার বিবাহ ভেঙে গেছে বলে গণ্য করুন।
  • স্বামীর সাথে কোনো প্রকার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করবেন না (একত্রে ঘুমানো, স্পর্শ করা ইত্যাদি) - এটি জিনার শামিল।
  • ইদ্দত (প্রায় তিন মাস) অপেক্ষা করুন এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পর আপনার অভিভাবকের মাধ্যমে নতুন করে বিয়ের প্রস্তাব দিন (যদি হালালা পদ্ধতির মাধ্যমে পুনরায় বিয়ে সম্ভব না হয়) অথবা আপনার স্বামীর জন্য দোয়া করুন যে আল্লাহ তাকে তওবা করার তৌফিক দিন এবং তিনি যদি সত্যিই অনুতপ্ত হন, তাহলে তিনি যেন একমাত্র আল্লাহর সাহায্য চান।

ফতোয়া ও উদ্ধৃতি

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): "এক সাথে তিন তালাক দেওয়া জায়েজ না হলেও তা কার্যকর হয় এবং স্ত্রী হারাম হয়ে যায়।" (খণ্ড ৩, তালাক অধ্যায়)
  • ফতোয়ায়ে আলমগীরী: "রাগের মাথায় দেওয়া তালাক, যদি রাগ অত্যন্ত তীব্র হয় যাতে মানুষ পাগল বা অচেতন হয়ে যায়, তাহলে তা পতিত হবে না; কিন্তু সাধারণ রাগের তালাক পতিত হয়।"
  • ফতোয়ায়ে উসমানী: "ফোনে তালাক দেওয়া বৈধ এবং তালাক পতিত হয় যদি স্ত্রী জানতে পারে।"

সতর্কীকরণ: এই ফতোয়া সম্পূর্ণরূপে আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রদত্ত। বাস্তবে ঘটনার বিভিন্ন সূক্ষ্মতা (যেমন স্বামীর মানসিক অবস্থা, সাক্ষী, ইত্যাদি) থাকতে পারে। তাই সরাসরি কোনো মুফতি সাহেবের সাথে যোগাযোগ করাই সর্বোত্তম। আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং আপনার সংসারে শান্তি ফিরিয়ে আনুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.