ইসলামে সন্তান দত্তক নেওয়ার বিধান কী?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান দত্তক নেওয়ার বিধান
প্রশ্ন: আমি বিয়ে করেছি প্রায় ১২ বছর। এখনও পর্যন্ত আমাদের কোনো সন্তান হয়নি। এমন অবস্থায় আমরা কি কোনো সন্তান দত্তক নিতে পারি? এ ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কী?
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ। আপনার দীর্ঘ অপেক্ষা ও সন্তানহীনতার কষ্ট আমরা বুঝতে পারছি। ইসলাম সন্তান লালন-পালনের ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহিত করে, বিশেষ করে এতিম ও অসহায় শিশুদের। তবে দত্তক (Adoption) শব্দটির পাশ্চাত্য অর্থে—অর্থাৎ সন্তানের বংশপরিচয় পরিবর্তন করে নিজের সন্তান বানিয়ে নেওয়া—ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বরং ইসলাম ‘কাফালা’ (Kafala) বা ‘সৎভাবে লালন-পালন’-কে অনুমতি দেয় এবং এর জন্য বিশেষ সওয়াবের ঘোষণা দিয়েছে।
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দত্তক (Tabanni) নিষিদ্ধ কেন?
ইসলামে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, কোনো শিশুকে নিজের সন্তান বলে দাবি করা এবং তার বাবা-মায়ের নাম বদলে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া বৈধ নয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ قَوْلُكُم بِأَفْوَاهِكُمْ ۖ وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ “আর তিনি তোমাদের পোষ্য সন্তানদেরকে তোমাদের নিজ সন্তান করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আর আল্লাহ সত্য বলেন এবং তিনিই পথ প্রদর্শন করেন। তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সংগত।” (সূরা আল-আহযাব: ৪-৫)
এ আয়াতের ভিত্তিতে ইসলামী আইনবিদরা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, কোনো শিশুকে দত্তক নিয়ে তার বংশগত পরিচয় (নাসাব) পরিবর্তন করা হারাম। এটি কেবল মিথ্যাচার নয়, বরং ইসলামী সমাজব্যবস্থায় বংশ ও উত্তরাধিকারের ন্যায়বিচার নষ্ট করে।
২. ‘কাফালা’ বা লালন-পালন (Fostering) জায়েজ ও সওয়াবের কাজ
ইসলাম যদি দত্তকের মাধ্যমে বংশ পরিবর্তন নিষিদ্ধ করে, তবে এতিম ও অসহায় শিশুদের লালন-পালন, তাদের ভরণপোষণ, শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়া এবং স্নেহ-মমতা দিয়ে বড় করার ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহিত করেছে। একে বলা হয় ‘কাফালাতুল ইয়াতিম’ (এতিমের দায়িত্ব গ্রহণ) বা ‘রিবায়াতুত তিফল’ (শিশু লালন-পালন)।
হাদিসে এসেছে:
أَنَا وَكَافِلُ الْيَتِيمِ فِي الْجَنَّةِ هَكَذَا وَقَالَ بِإِصْبَعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى “আমি এবং এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তি জান্নাতে এভাবে একত্রে থাকবো” – (ইশারা করে) শাহাদাত ও মধ্যমা আঙুল একত্র করে দেখালেন। (সহিহ বুখারি: ৬০০৫)
এ হাদিসে ‘কাফিল’ শব্দটি শুধু রক্তসম্পর্কের জন্যই নয়, বরং বোঝায়—যে ব্যক্তি এতিমের ভরণপোষণ, পড়াশোনা, মৌলিক চাহিদা ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে বড় করে তোলে।
৩. দত্তক নেওয়ার সময় যে শর্তগুলো মেনে চলতে হবে
আপনি যদি সন্তান দত্তক (নিয়ে লালন-পালন) করতে চান, তাহলে নিচের শর্তগুলো মানা জরুরি:
| শর্ত | বর্ণনা | |------|--------| | বংশ পরিচয় অপরিবর্তিত রাখা | সন্তানের নিজ পিতার নাম ও বংশানুক্রম কখনো বাদ দেওয়া যাবে না। তাকে নিজের সন্তান বলে প্রচার করা বা নামের শেষে নিজের উপাধি যুক্ত করা জায়েজ নয়। | | উত্তরাধিকার | দত্তক নেওয়া সন্তান নিজের পিতার সম্পদের ওয়ারিস হবে। আপনি আপনার সম্পদ থেকে তাকে কিছু দিতে চাইলে ওসিয়াত করতে পারেন, তবে তা মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি হতে পারবে না (অন্য ওয়ারিসদের অনুমতি না থাকলে)। | | পর্দা ও মাহরাম | দত্তক নেওয়া সন্তান আপনার সন্তান নয়। তাই প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার সাথে পর্দার বিধান প্রযোজ্য। ছেলে হলে আপনাকে তার প্রতি পর্দা করতে হবে না (কারণ আপনি তার মায়ের মতো নন)। তবে মেয়ে হলে আপনার স্ত্রী তার পর্দা করবেন—তবে শর্ত হচ্ছে মেয়েটি যদি শিশু হয় এবং স্তন্য দানের সম্পর্ক স্থাপন না করা হয়, তাহলে বয়ঃসন্ধির পর আপনিও তার জন্য ‘নন-মাহরাম’ হয়ে যান। তাই অনেকে স্তন্য দানের মাধ্যমে তাকে রিযাঈ (দুধ) সন্তান করে নেন—যাতে পর্দার সমস্যা না থাকে। | | স্তন্য দান (রিযা’আ) | আপনি চাইলে আপনার স্ত্রী যদি দত্তক নেওয়া ছেলে শিশুকে (২ বছর বয়সের মধ্যে) বুকের দুধ পান করান, তাহলে সে আপনার স্ত্রীর ‘দুধের ছেলে’ হবে এবং আপনার ‘দুধের বাবা’ হবে। এর ফলে সে চিরকালের জন্য আপনার মাহরাম হয়ে যাবে এবং পর্দার সীমা শিথিল হবে। তবে এটি ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য, তবে মেয়েদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। |
৪. আপনার করণীয়
আপনি যদি চিকিৎসা ও দুআর পরও সন্তান না পান, তাহলে হতাশ না হয়ে নিচের কাজগুলো করতে পারেন:
- চিকিৎসা চালিয়ে যান: আল্লাহর রহমতে অনেক দম্পতি দীর্ঘ অপেক্ষার পর সন্তান লাভ করেন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
- দুআ করুন: কুরআনের দুআ যেমন— رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ (সূরা আস-সাফফাত: ১০০) এবং رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪) বেশি পড়ুন।
- এতিম লালন-পালনের নিয়ত করুন: আপনি যদি দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে শর্তগুলো মেনে নিন। এটি একটি মহান ইবাদত। তবে মনে রাখবেন, দত্তক নেওয়া সন্তান আপনার নিজের সন্তানের মতো না হলেও, আপনি তাকে ভালোবাসতে পারেন এবং আপনার স্নেহ তাকে দিতে পারেন—যতক্ষণ পর্যন্ত শরয়ি সীমারেখা লঙ্ঘন না হয়।
৫. হানাফি ফিকহের রেফারেন্স
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যগণ স্পষ্টভাবে বলেন: দত্তক নেওয়া ও বংশ পরিবর্তন করা নাজায়েজ। কিন্তু এতিম ও অসহায় শিশুদের লালন-পালন করা জায়েজ ও মুস্তাহাব। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৭২; রদ্দুল মুহতার, ৬/৭৩৪)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা‘আরিফুল কুরআনে (সূরা আহযাবের তাফসিরে) বলেন: “দত্তক পুত্রের ক্ষেত্রে তাদেরকে পিতার নামে ডাকা ওয়াজিব। নিজের পুত্র বলা জায়েজ নয়।” (মা‘আরিফুল কুরআন, ৭/১২০)
- মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহু) ফাতাওয়া উসমানিতে লিখেছেন: “ইসলাম ‘অ্যাডপশন’-এর বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতির অনুমতি দেয় না, কিন্তু ‘ফস্টারিং’ বা ‘কাফালা’-কে বৈধ ও সওয়াবের কাজ বলে ঘোষণা দেয়।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫৪১)
৬. উপসংহার
আপনি দত্তক নিতে পারেন—কিন্তু শর্ত হলো বংশগত পরিচয় বজায় রাখা, নিজের সম্পদ থেকে ওয়ারিস বানানো না, এবং পর্দা ও মাহরামের বিষয়গুলো মেনে চলা। এভাবে আপনি একটি অসহায় শিশুর জীবন আলোকিত করতে পারেন এবং আল্লাহর কাছ থেকে মহা পুরস্কার লাভ করতে পারেন।
দুআ করি, আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দান করুন এবং যদি আপনার জন্য কল্যাণ হয়, তাহলে সন্তান দান করুন। আর যদি সন্তান না-ও হয়, তাহলে ‘কাফালা’-এর মাধ্যমে আপনার সন্তানহীনতার শূন্যতা পূরণ করুন। আল্লাহ তাআলা সব ভালো কাজের প্রতিদান দেন।
আল্লাহু আলাম (আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)।