নিকাহের আগে বাগদানের পর পাত্র পাত্রী কি স্বাভাবিক কথাবার্তা বলতে পারবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিয়ের আংটি পরিয়ে রেখে পাত্র-পাত্রীর স্বাভাবিক কথাবার্তা বলা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি হলো: বিয়ের আংটি পরিয়ে রাখার পর পাত্র-পাত্রীর মধ্যে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? অনেক সমাজেই আংটি বদল বা আংটি পরানোকে বিয়ের একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়, কিন্তু ইসলামী শরিয়তে এটার প্রকৃত অবস্থান কী?
উত্তর
শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের বৈধতা নির্ভর করে নিকাহ (বিবাহের চুক্তি) সম্পাদনের উপর, কেবল আংটি পরানো বা বাগ্দানের উপর নয়। তাই পাত্র-পাত্রীর কথাবার্তার বৈধতা নির্ভর করবে নিম্নলিখিত অবস্থার উপর:
১. নিকাহ সম্পন্ন হয়ে গেলে
যদি বিয়ের আংটি পরানোর সময় বা তার আগেই নিকাহ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হয়ে যায়, তাহলে পাত্র-পাত্রী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন। তাদের মধ্যে স্বাভাবিক কথাবার্তা, দেখা-সাক্ষাৎ, এমনকি নির্জনতা (খলওয়াত) সবই জায়েজ। তবে ইসলামী শিষ্টাচার ও মার্যাদা বজায় রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কর্তব্য। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৫)
২. নিকাহ সম্পন্ন না হলে (শুধু বাগ্দান বা আংটি পরানো)
যদি শুধু আংটি পরানো হয়, কিন্তু নিকাহ এখনও সম্পন্ন না হয়, তাহলে পাত্র-পাত্রী পরস্পর গায়রে মাহরাম (বিবাহ বহির্ভূত) হিসেবে গণ্য হবেন। অর্থাৎ তারা এখনও স্বামী-স্ত্রী নন। এমন অবস্থায় তাদের মধ্যে স্বাভাবিক ও অবাধ কথাবার্তা বলা জায়েজ নয়। কেননা:
-
ইসলামী বিধান: গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ও কথাবার্তা নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ বলেন: "তোমরা মুমিন নারীদেরকে বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে..." (সূরা নূর ২৪:৩১)
-
হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের কারো জন্য তার (গায়রে মাহরাম) কোনো নারীর সাথে নির্জনতা অবলম্বন করা বৈধ নয়, যদি না তার সাথে মাহরাম কেউ থাকে।" (সহীহ বুখারী, ৩০০৬; সহীহ মুসলিম, ১৩৪১)
-
হানাফী ফিকহ: ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সহ সকল হানাফী ফকীহের মতে, বাগ্দান বা এংগেজমেন্ট কেবল বিবাহের প্রতিশ্রুতি, এটি বিবাহের চুক্তি নয়। তাই এ অবস্থায় পাত্র-পাত্রী পরস্পরের জন্য হালাল হন না। (সূত্র: আল-হিদায়া, ২/৩৬২; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৮৮)
-
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: "বাগ্দানের পরও পাত্র-পাত্রী একে অপরের জন্য বেগানা (গায়রে মাহরাম) থাকে। তাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ বা কথাবার্তা শুধু প্রয়োজন বা জরুরী অবস্থায়, এবং মাহরামের উপস্থিতিতে সীমিত হতে পারে।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৫/৪৬০)
৩. সংক্ষিপ্ত ও জরুরী কথাবার্তা
নিকাহের আগে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে যদি কোনো প্রয়োজনীয় কথাবার্তা (যেমন: বিবাহের শর্তাদি, পণ্য, তারিখ নির্ধারণ) হয়, সেটা মাহরামের উপস্থিতিতে এবং প্রয়োজন সীমিত থাকা উচিত। অবাধ ও স্বাভাবিক কথাবার্তা, যেমন: ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা, সামাজিক মাধ্যমে চ্যাটিং করা, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা—এগুলো জায়েজ নয়।
সংক্ষেপে উত্তর
- যদি নিকাহ সম্পন্ন হয়ে যায়, তাহলে আংটি পরানোর পর উভয়ের মধ্যে স্বাভাবিক কথাবার্তা জায়েজ এবং এতে কোনো অসুবিধা নেই।
- যদি নিকাহ না হয় (শুধু আংটি পরানো, বাগ্দান বা এনগেজমেন্ট), তাহলে পাত্র-পাত্রী পরস্পরের জন্য গায়রে মাহরাম। এমন অবস্থায় স্বাভাবিক কথাবার্তা জায়েজ নয়, বরং শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি গুনাহের কাজ।
উপদেশ: সমাজে প্রচলিত "আংটি পরানো = বিয়ে" এই ধারণাটি সঠিক নয়। প্রকৃত বিয়ে হলো নিকাহ। তাই নিকাহ সম্পন্ন করার আগে পাত্র-পাত্রীর জন্য শরীয়তের সীমারেখা মেনে চলা আবশ্যক।
তথ্যসূত্র (References)
- আল-কুরআন: সূরা নূর (২৪:৩১) - "মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে..."
- সহীহ বুখারী (৩০০৬) - নারী-পুরুষের নির্জনতা নিষেধাজ্ঞা
- সহীহ মুসলিম (১৩৪১) - মাহরাম ছাড়া নির্জনতা হারাম
- রদ্দুল মুহতার (৩/৫৬৮) - ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) - বিবাহের পর স্বামী-স্ত্রীর অধিকার
- ফাতাওয়া আলমগীরী (১/২৮৮) - বাগ্দানের বিধান
- আল-হিদায়া (২/৩৬২) - ইমাম মুরগীনানী (রহ.) - বিবাহের পূর্বে সম্পর্ক
- মা'আরিফুল কুরআন (৫/৪৬০) - মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫০) - মুফতী তাকী উসমানী (দা.ব.) - বাগ্দানের বিধান
- বেহেশতী জেওর (২/৩২) - মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) - নারী-পুরুষের মেলামেশা