“ইস্তিখারার পর বিয়েতে বাধা এবং “নজর ও সিহরের লক্ষণ ও চিকিৎসা” সম্পর্কে জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
গতবার প্রশ্ন ছিল ইস্তিখারা সহ বিয়ের প্রোপোজাল নিয়ে।
যা শুনে উস্তায বলেছিলেন, নজর বা সিহর টাইপ কিছু হতে পারে।
হিফাজতের আমলের সাথে রাতেও আমল চালিয়ে যাচ্ছি ইন্ শা আল্লহ।
তবে এখনো কিছু সমস্যা ফেইস করছি।
কোনোদিকে কোনো সুরাহা হচ্ছে না।
আবার এটি আসলেই ব্যক্তি ভিত্তিক সমস্যা কিনা বুঝতে পারছিনা।
বিয়ের জন্য যখন, পাত্রের সাথে কথা হয়, উনি আর্থিক দিক নিয়ে কিছুটা ভাবাতুর ছিলেন যে,উনি এখনি এগোবেন কি না।
পরবর্তী তে আমি কিছু কথা বলি,এবং উনি সিদ্ধান্ত নেন যে এগোবেন। এর মাঝেও উনি দিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন।
আসার আগ মুহুর্তে ও, সবকিছু জটিল ছিল। এরপর যখন এসে গেলেন, এরপর থেকে ১ সপ্তাহ সব শান্তকর ছিল। হঠাৎ আবার সব বিগড়ে গেল। উনার বাবা আপত্তি জানাচ্ছিলেন। এরপর যোগাযোগ অফ থাকে। তবে উনি আবার যোগাযোগ করেন, উনি এগোতে চাচ্ছেন কিন্তু আবার সেই আর্থিক বিষয়ক সমস্যা। উনি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। উনি বলছেন যে সময় লাগতে পারে, আবার চাচ্ছেন বিয়েতে এগোতে। উনু নিজে তো জটিলতায় আছেন, আবার বলছেন আমি ভালো পেলে চলে যাবো কি না, আবার বলে ভালো পেলে এগিয়ে যান।আমাকেও কেন ২ ধরনের কথার ২টাই বলছেন বুঝে উঠতে পারছিলাম না,কারণ এমন কোনো আশ্বাস ই আমি দেইনি যে এমন ২ রকম কতা বলবেন। এজন্য নিজে থেকেই যোগাযোগ অফ করেছি। কিন্তু, এমন অদ্ভুত সব আচরনের কিছুই আমার মাথায় ঢোকেনি। এগুলো আসলে কী?! আবার বলে, আমাকে চেক করতে যে,আমাকে কেউ যাদু করেছে কি না চেক করতে।
আবার আমি ১মবার ইস্তিখারা করি, দেখতে আসার পরের ১ সপ্তাহের মধ্যেই,স্বপ্ন মনে ছিল না। তবে,খুব সুকুন,ঠান্ডা,শান্তিপূর্ণ মন মেজাজ অনুভূত হচ্ছিল। ওনার টা উনি কনফিউজড জানাচ্ছিল।
আবার শয়তান ও আমাকে সেই সব দিকে আটকাচ্ছে যেগুলো সে জানে যে,আটকালে আমার আমলে ব্যাঘাত পড়বে।
সেগুলো ই হচ্ছে। যেমন বিয়ে নিয়ে কিছুই এগোচ্ছে না। কোনো বায়ো ও কিছুদিন যাবৎ এখন আর দেখতে রুচিতে বাধে। অদ্ভুত লাগে। প্রায় কয়েক বছর যাবৎ পাত্র দেখছে,কিন্তু এগোচ্ছে না কারণ এই পরিবার থেকে এগোয় না,আবার কোনোটা পছন্দ করলে, সেটা আবার হচ্ছেনা। জন-ই দেখতে এসেছিলেন আর উনি-ই কেমন অদ্ভুত কতা বার্তা বললেন। অথচ বড়দের সাথে কতা বলার সময় ওনাকে ম্যাচিউরড দেখেছি। এখন বুঝতে পারছি না আসলে সমস্যা কোথায়। সূরা বাক্বারাহ রেগুলার শোনার চেষ্টা করছি, ১ম দিন ১১৮-১২৪,১৬৬-১৬৮, এবং শেষের কিছু আয়াত শোনাকালীন পূর্বের চেয়ে মাথা ব্যথা তীব্রতর হয়েছে। ২য় দিন, ২৩৩ পর্যন্ত শুনি তবে তেমন কিছু বুঝিনি। সেদিন-ই অ্যাক্সিডেন্টেী শিকার হই, যেভাবে পড়ে গিয়েছিলাম,অলৌকিক ভাবে সেদিন বাঁচিয়ে দিলেন। বাসায় কোনোভাবে এসে বাকিটুকু শুনতে গিয়ে ঘুম চলে আসে। এগুলো কি আমার মনের ভ্রান্তি না আসলেই কিছু? আমার কী কী করা উচিত এবং কীভাবে কী করা উচিত?
এবং শয়তান থেকেও আরও স্ট্রং প্রেটেকশন এ কীভাবে থাকতে পারি?
( আফওয়ান গুছিয়ে সংক্ষেপে বলতে পারিনি)
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু
প্রিয় বোন, আপনার বিস্তারিত বর্ণনা পড়ে বুঝা যাচ্ছে যে, বিয়ে প্রক্রিয়ায় এক ধরনের অস্বাভাবিক বাধা ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। পাত্রের কথাবার্তায় দ্বিধা, পরিবারের আপত্তি, আপনার নিজের মাথাব্যথা ও দুর্ঘটনা—এসব কেবল কাকতালীয় নয় বরং এতে নজর, সিহর (জাদু) বা শয়তানী প্রভাবের মতো বিষয় জড়িত থাকতে পারে। নিচে হানাফি ফিকহ ও মাসায়িলের আলোকে বিশ্লেষণ ও সমাধান পেশ করা হলো।
১. ইস্তিখারা ও তার ফলাফল
- আপনি ইস্তিখারা করার পর প্রথম সপ্তাহে ‘সুকুন, ঠাণ্ডা ও শান্তিপূর্ণ মন’ অনুভব করেছেন—এটি ইস্তিখারার ইতিবাচক লক্ষণ। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন, ইস্তিখারার পর যে কাজের জন্য অন্তর প্রশস্ত হয় ও কল্যাণবোধ হয়, সেটাই উত্তম। (রাদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৭)
- পাত্রের “কনফিউজড” থাকা ইঙ্গিত দেয় যে, তার বেলায়ও বাহ্যিক বাধা বা শয়তানী প্রভাব কাজ করছে। তাই আপনার প্রথম ইস্তিখারার ‘সুকুন’-কে অগ্রাধিকার দিন, তবে নতুন করে আরেকবার ইস্তিখারা করুন।
২. নজর ও সিহরের সম্ভাবনা—লক্ষণ ও ফিকহি বিধান
- মাথাব্যথা তীব্র হওয়া সূরা বাকারা শোনার সময় : এটি সিহর বা নজরের অন্যতম লক্ষণ। ইমাম তাহাবি (রহ.)-এর বর্ণনায় উল্লেখ আছে, ক্বুরআন পড়লে জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। (শারহু মাআনিল আসার, ৪/২৪৩)
- পাত্রের দ্বিধা, অদ্ভুত আচরণ ও পরিবারের অকারণ আপত্তি : এগুলো নজর বা শয়তানী প্রভাবের সাধারণ উপসর্গ। হাদিসে এসেছে, “নজর সত্য এবং তা পাহাড়কেও ঠেলে দিতে পারে।” (মুসলিম, হাদিস: ২১৮৮)
- আপনার দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া : এটি আল্লার রহমত। তবে শয়তান চায় আপনার আমলে ব্যাঘাত ঘটাতে, তাই এ ধরনের বিপদ আসে। (সূরা বাকারা, ২:২৬৮)
হানাফি ফতোয়া : মুফতি শফি উসমানি (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় (৪/৪২৫) সিহরের চিকিৎসায় সূরা বাকারা, আয়াতুল কুরসি ও শেষ দুই আয়াত নিয়মিত পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
৩. করণীয়—কীভাবে এগোবেন?
ক. সিহর/নজর থেকে বাঁচার আমল
- মানযিল (Manzil) নিয়মিত পড়ুন : সূরা ফাতিহা (১ বার), আয়াতুল কুরসি (১ বার), সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস (৩ বার করে), সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (১ বার), সূরা বাকারা ১১৮-১২৪ ও ১৬৬-১৬৮ আয়াত। প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের পর পড়ুন। (বেহেশতি জেওর, ২/২৩০)
- সূরা বাকারা শোনার সময় ঘুম চলে এলে তা শয়তানের প্রভাব। তাই বসে বা শুয়ে নয় বরং মনোযোগ দিয়ে শুনুন। যদি ঘুম আসে, তাহলে বিরতি দিয়ে পরে পুনরায় শুনুন।
- রুকইয়া (Sihr Treatment) : কোনো দ্বীনদার ও অভিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে রুকইয়া করুন। নিচের আয়াতগুলো জাদুগ্রস্তের ওপর পড়ে ফুঁক দেওয়া সুন্নত : সূরা আরাফ ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস ৮১-৮২, সূরা তাহা ৬৯। (ফাতাওয়া আলমগীরি, ৫/৩৫৭)
খ. পাত্র ও বিয়ে সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত
- পাত্রের ‘পরিবার এগোয় না’, ‘নিজে দ্বিধায় ভোগে’—এসব কারণে এখনই বিয়ে চূড়ান্ত করা ঝুঁকিপূর্ণ। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে পুনরায় ইস্তিখারা করুন। যদি অন্তর আরও শান্তি পায় এবং পাত্রের আচরণে স্থিতিশীলতা আসে, তবে এগোন।
- পাত্রের দেওয়া “আপনাকে চেক করতে যাদু আছে কিনা” এই কথা বিভ্রান্তিকর। বরং নিজের চিকিৎসায় মন দিন। তার কথার বিপরীতে আপনি নিজেও সিহরের শিকার হতে পারেন। তাই নিজেকে সুস্থ করে তোলাই প্রথম কর্তব্য।
- নিষেধাজ্ঞা : পাত্রের সঙ্গে একান্তে কথা বলা বা গোপন যোগাযোগ জায়েজ নয় (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৫০)।
গ. শয়তানের প্রটেকশন
- শয়তানের ফাঁদ বোঝা : শয়তান আপনাকে ‘আমলে ব্যাঘাত’ ঘটানোর চেষ্টা করছে। এর প্রতিরোধে সর্বদা ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম’ পড়ুন।
- সকাল-সন্ধ্যার জিকির : সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস প্রতিটি ৩ বার, আয়াতুল কুরসি ১ বার। এতে শয়তান সারা দিন থেকে দূরে থাকে। (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৭১)
- ঘরে নিয়মিত সূরা বাকারা তিলাওয়াত করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, শয়তান সেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।’ (মুসলিম, হাদিস: ৭৮০)
৪. মানসিক ভ্রান্তি না বাস্তব সমস্যা?
- আপনি যে লক্ষণগুলো পেয়েছেন—মাথাব্যথা, দুর্ঘটনা, পাত্রের অস্বাভাবিক আচরণ—এগুলো ‘মনের ভ্রান্তি’ নয় বরং বাস্তব বাহ্যিক প্রভাব। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সিহরকে বাস্তব প্রভাব বলেছেন। (আল-ফিকহুল আকবর, ১/২৫০)
- তবে ভয়ের কিছু নেই। আল্লার কিতাব ও সুন্নাহর আমল দ্বারা সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
৫. সংক্ষেপে করণীয় তালিকা
১. প্রতিদিন মানযিল ও সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ুন।
২. বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে রুকইয়া করান।
৩. বর্তমানে পাত্রের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখুন।
৪. ইস্তিখারা পুনরায় করুন এবং আল্লার ওপর ভরসা রাখুন।
৫. সকাল-সন্ধ্যার জিকিরে অভ্যস্ত হোন।
৬. পরিবারের উস্তায বা মুফতির সঙ্গে পরামর্শ চালিয়ে যান।
আল্লাহ তাআলা আপনার ইচ্ছা পূরণ করুন এবং জটিলতা দূর করুন।
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক, ৬৫:৩)
রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান নার।