লিঙ্গ উত্থান না হলে এবং ক্ষণস্থায়ী ঝিনঝিন অনুভূতি হলে কি বিবাহ হারাম হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রশ্নকর্তার বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি এক মহিলার পেটে হাত নাড়ান (স্পর্শ) করেছেন এবং সেই সময় যৌন উত্তেজনাজনিত কিছু অনুভূতি (শিরশির, টান, ঝিনঝিন) হয়েছে। যদিও তাঁর লিঙ্গ উত্থিত হয়নি (তাঁর ইরেকশনের সমস্যার কারণে), তবে তিনি স্বীকার করছেন যে তিনি ঐ মহিলার পেট দেখে উত্তেজিত হয়েছিলেন এবং হাত নাড়ানোর সময় তার শেষের দিকে একটি ‘টান’ বা ‘ঝলক’ অনুভব করেছেন। তিনি আরও সন্দেহ করছেন যে তাঁর যোনাঙ্গ থেকে পানি জাতীয় কিছু (মযী) বের হয়েছে কি-না, তবে নিশ্চিত নন।
এখন প্রশ্ন হলো, এসব কারণে ‘হুরমত মুসাহারাত’ (বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হয়ে যাওয়া) সাব্যস্ত হবে কি না? অর্থাৎ, তিনি কি ঐ মহিলার মেয়েকে বিয়ে করতে পারবেন?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী:
১. স্পর্শের মাধ্যমে হুরমত সাব্যস্ত হওয়ার শর্ত:
কোনো পুরুষ যদি কোনো অ-মাহরাম মহিলাকে শাহওয়াত (যৌনকামনা) সহ স্পর্শ করে (সরাসরি চামড়ায় চামড়া লাগে), তাহলে তা দ্বারা হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়। এই স্পর্শ যদি শাহওয়াতের সাথে হয়, তাহলে স্পর্শের স্থান যেকোনো জায়গাই হোক (যেমন পেট, হাত, মাথা), এবং স্পর্শের সময়কাল যত ক্ষণই হোক (এক মুহূর্তও যথেষ্ট), হুরমত সাব্যস্ত হয়ে যায়। কেননা মহিলাটি তার কাছে মাহরাম (হারাম) হয়ে যায় এবং তার মা-মেয়ে-বোন ইত্যাদিও তার জন্য হারাম হয়ে যায়। এই বিধানে বীর্যপাত বা মযী বের হওয়া জরুরি নয়, বরং শুধু কামোত্তেজক স্পর্শই যথেষ্ট।
(সূত্র: *রদ্দুল মুহতার, ৩/১১৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়্যা, ১/২৭৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৫৩; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৯)
২. শাহওয়াত বা উত্তেজনার মাত্রা:
শাহওয়াতের পরিমাণ নির্ধারণে ফকীহগণ বলেছেন: “এমন উত্তেজনা যা লিঙ্গের নড়াচড়া বা উত্থান ঘটায়” - কিন্তু এটি সাধারণ মানুষের জন্য মানদণ্ড। যাদের শারীরিক জটিলতা (যেমন পুরুষত্বহীনতা বা ইরেকশনের সমস্যা) আছে, তাদের ক্ষেত্রে মনের উত্তেজনা ও যৌন অনুভূতিই যথেষ্ট। যদি স্থানীয় কোনো ‘টান’ বা ‘শিহরণ’ অনুভূত হয়, তবে তা কামোত্তেজনার প্রমাণ। তাই আপনি যে ‘টান’ বা ‘ঝিনঝিন’ অনুভব করেছেন, তা দ্বারা প্রমাণিত হয় ওই স্পর্শের সময় আপনার মধ্যে শাহওয়াত বিদ্যমান ছিল।
(সূত্র: *শরহু মাআনিল আসার, ৩/১৩৭; বাদায়েউস সানায়ে, ৪/১৬৭; ফাতাওয়া রহীমিয়্যা, ১১/২২৮)
৩. মযী বা পানি বের হওয়ার সন্দেহ:
আপনি নিশ্চিত নন যে মযী বের হয়েছে কি না। ফিকহের মূলনীতি হলো: সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো হুকুম সাব্যস্ত করা যায় না। তাই মযী বের হওয়ার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেহেতু উপরের নিয়মানুযায়ী শুধু কামোত্তেজক স্পর্শই হুরমত সাব্যস্তের জন্য যথেষ্ট।
আপনার অবস্থার ফয়সালা:
- আপনি ঐ মহিলার পেট দেখে উত্তেজিত হয়েছিলেন এবং সেই উত্তেজনা আপনার যোনাঙ্গে ‘শিরশির’ অনুভূতি দিয়েছিল।
- আপনি তার পেটে ১.৫ সেকেন্ড হাত নাড়ান এবং শেষ দিকে ‘টান’ বা ‘ঝলক’ অনুভব করেন, যা কামোত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ।
- আপনার লিঙ্গ উত্থিত না হলেও, আপনার অনুভূতি ও স্পর্শের সময় শাহওয়াত ছিল।
- তাই এই স্পর্শ দ্বারা হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়েছে। ফলে, ওই মহিলাটি আপনার জন্য মাহরাম (হারাম) হয়ে গেছে। আর তার মেয়েও আপনার জন্য চিরদিনের জন্য হারাম। আপনি সেই মেয়েকে বিয়ে করতে পারবেন না।
আপত্তির জবাব:
- আপনি বলেছেন: “মৃদু উত্তেজনা বা কম উত্তেজনা দ্বারা হুরমত সাব্যস্ত হয় না” – এটি সঠিক নয়। হানাফি ফিকহে ‘মৃদু’ ও ‘তীব্র’-এর কোনো পার্থক্য নেই; বরং শাহওয়াত মওজুদ থাকলেই হুরমত হয়, যদিও তা সামান্যই হোক। তবে যদি কেউ স্পর্শ করে কোনো যৌন অনুভূতি ছাড়াই (যেমন ডাক্তারি পরীক্ষা অথবা ঘটনাক্রমে স্পর্শ), তাহলে হুরমত হবে না। কিন্তু আপনি তো স্পর্শের পূর্বেও উত্তেজিত ছিলেন এবং স্পর্শের সময়ও টান অনুভব করেছেন, সুতরাং এটি অ-কামোত্তেজক স্পর্শ নয়।
- আপনি বলেছেন: “আমার লিঙ্গ শক্ত হয় না” – আপনার শারীরিক সমস্যা আছে, কিন্তু মনের উত্তেজনা ও স্থানীয় শিহরণকেই শাহওয়াত বলে গণ্য করা হবে। তাই আপনার অক্ষমতা হুরমত রহিত করবে না।
- আপনি বলেছেন: “স্পর্শের আগে থেকেই উত্তেজনা ছিল” – এটি আরও স্পষ্ট করে দেয় যে স্পর্শটি শাহওয়াতের সাথে হয়েছে।
শেষ সিদ্ধান্ত:
আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনি যে মহিলার পেট স্পর্শ করেছেন, তার সাথে আপনার সম্পর্ক ‘মাহরাম’ হয়ে গেছে। তাই তার মেয়েকে বিয়ে করা আপনার জন্য হারাম। আপনি যদি আগে থেকেই বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, তবে তা ভেঙে দিতে হবে। এজন্য আপনাকে তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে অ-মাহরাম মহিলাদের স্পর্শ, দেখা ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে হবে।
তবে যদি আপনি পুরোপুরি নিশ্চিত হন যে ঐ স্পর্শের সময় আপনার মনে কোনো যৌন উদ্দীপনা একেবারেই ছিল না (অর্থাৎ একেবারে নির্বিকার অবস্থায় স্পর্শ করেছেন), তবে কোনো হুরমত হবে না। কিন্তু আপনি নিজেই বলছেন যে আপনি পেট দেখে উত্তেজিত হয়েছিলেন এবং ‘শিরশির’ ও ‘টান’ অনুভব করেছেন – তাই নিশ্চিতভাবেই তা শাহওয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
প্রাসঙ্গিক কিতাবের উদ্ধৃতি:
রদ্দুল মুহতার (৩/১১৩): “যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলাকে শাহওয়াতের সাথে স্পর্শ করে, তাহলে তা হুরমত সাব্যস্ত করে, চাই স্পর্শ ছোট স্থানেই হোক অথবা স্পর্শ ক্ষণিকের জন্যই হোক, আর চাই বীর্যপাত ঘটুক বা না ঘটুক।”
ফাতাওয়া হিন্দিয়্যা (১/২৭৩): “যদি কোনো লম্পট ব্যক্তি কোনো মহিলার দেহের কোনো অংশ এমনভাবে স্পর্শ করে যে তার লিঙ্গ নড়ে ওঠে বা ইরেকশন হয়, তাহলে হুরমত সাব্যস্ত হয়। আর যদি ইরেকশন না হয় কিন্তু শাহওয়াত থাকে, তবুও হুরমত সাব্যস্ত হয়।”
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৫৩): “শাহওয়াতের মাপকাঠি হলো লিঙ্গের নড়াচড়া বা উত্থান ইত্যাদি। যদি কারো শারীরিক কারণে তা না হয়, তাহলে তার অনুভূতি (শিহরণ, টান) দেখে হুকুম হবে।”