আমি একজন মেয়ে হিসেবে কি জরুরতে চাকুরী করতে পারবো?

Business and Job · Hanafi

Question No: 1782
Questioner: Ananya
Question Asked: 18 Jun 2026, 09:34 PM
Reviewed & Published: 18 Jun 2026, 09:40 PM
Views: 59
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমরা তিন ভাই বোন। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি মেজো। পড়াশোনা শেষ করে ২ বছর হল বাড়িতে বসে আছি। পর্দার কারনে চাকরি জন্য ট্রাই করিনি। আর ভাই অনার্সে পড়ে। আমার বিয়ের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে পড়া অবস্থা থেকেই কিন্তু এখনও হয়নি। আব্বুরও বয়স হয়েছে। বাসা থেকে মাঝে মাঝে বলে চাকরির জন্য। আপু সাংসারিক লাইফে ভীষণ সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে না যাবে এই পর্যায়ে প্রায়। আপুর দুইটা ছোট বাচ্চা আছে।বড় কথা আব্বুর বয়স। এদিকে বড় মেয়ের এই সমস্যা, আমার এখনও বিয়ে দিতে পারিনি, আমি কিছু করছিও না, বাড়িতে বসে আছি পড়াশোনা শেষ করে। আব্বু আম্মুর জন্যও আমার ভীষণ খারাপ লাগে। সব মিলিয়ে আমি টেনশনে আছি । এমতাবস্থায় আমি কি চাকরি করতে পারবো? আর চাকরি তে আবেদন করতে গেলে ছবি লাগে। পরীক্ষা এবং ভাইভাতে কান মুখ দেখানে লাগে। পর্দা লংঘন হবে, এখন আমি কি করবো?

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই বলব, আপনার অবস্থা বুঝতে পারছি। পরিবারের দায়িত্ব, বোনের সংসারিক সমস্যা, বাবা-মায়ের বয়স, নিজের বিয়ে না হওয়া—এসব মিলিয়ে আপনি মানসিকভাবে চাপে আছেন। আল্লাহর কাছে সাহায্য চান এবং ধৈর্য ধরুন।

২টি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ:

  1. চাকরি করার শর’ঈ বিধান
  2. পর্দার সাথে চাকরির সামঞ্জস্য

১. নারীর জন্য চাকরি করা জায়েজ কি না?

ইসলামে নারীর জন্য মূল নির্দেশনা হলো: ঘরে বসে পর্দা রক্ষা করা এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করা। তবে যদি চরম প্রয়োজন হয় (যেমন- পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অন্য কোনো উপায় না থাকে, বাবার বয়স বেশি, ভাইয়ের আয় অপ্রতুল, বোনের সংসার ভাঙনের উপক্রম, নিজের বিয়ের দাবি ইত্যাদি) তাহলে প্রয়োজন সাপেক্ষে এবং পর্দার শর্ত রক্ষা করে চাকরি করা জায়েজ।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের মতে:

"যদি কোনো নারী তার পর্দা রক্ষা করে এবং পুরুষের সাথে মেলামেশা না করে, তাহলে তার জন্য বাড়ির বাইরে কাজ করা জায়েজ। তবে অপ্রয়োজনে তা মাকরুহ।"
(রদ্দুল মুহতার, ২/৪১৩; ফাতাওয়া শামী, ৬/৩৩৭)

মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

"বর্তমান যুগে নারীরা যদি পর্দা রক্ষা করে, শুধু নারীদের প্রতিষ্ঠানে বা নারী-শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে, তাহলে তা জায়েজ। কিন্তু সাধারণ পুরুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ও পর্দা লঙ্ঘন করে কাজ করা নাজায়েজ।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫০)

আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা:

  • আপনার বাবার বয়স হয়েছে, ভাই পড়াশোনা করে, বড় বোনের সংসার ভাঙার উপক্রম, নিজের বিয়েও হয়নি – এটি চরম প্রয়োজন বলে গণ্য হবে।
  • তাই আপনি পর্দার শর্ত রক্ষা করে চাকরি করতে পারেন।

২. চাকরির আবেদনে ছবি ও ভাইভার পর্দা লঙ্ঘন:

আপনি ঠিকই বলেছেন, চাকরির আবেদনে ছবি লাগে, পরীক্ষা ও ভাইভাতে মুখ দেখানো লাগে। এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে পর্দা লঙ্ঘন। তবে প্রয়োজনের সময় সীমিত আকারে নিম্নোক্ত শর্ত মেনে তা জায়েজ হবে:

যেসব শর্তে জায়েজ বলেছেন হানাফি ফুকাহারা:

  1. ছবি তোলা: শুধুমাত্র প্রয়োজনে, হিজাবসহ (মাথা ও গলা ঢেকে) ছবি তোলা জায়েজ। তবে এই ছবি যেন প্রকাশ্য না হয় এবং অপরিচিত পুরুষ দেখতে না পায়।
    (ফাতাওয়া দারুল উলুম দিয়োবন্দ, ৪/২৩৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩৪)

  2. ভাইভা: ভাইভা বোর্ডে যাওয়া জায়েজ যদি পর্দা করা সম্ভব হয় (যেমন- বোরকা বা হিজাব পরে, পুরুষের সাথে সীমিত ও প্রয়োজনীয় কথোপকথন)।
    (মারাক্বিল ফালাহ, ১/২২২; রদ্দুল মুহতার, ২/৩১৩)

  3. পরীক্ষা: নারী-পুরুষের পৃথক ব্যবস্থা না থাকলে, পর্দা রেখে পরীক্ষা দেওয়া জায়েজ। তবে যেখানে গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা বেশি (যেমন- খোলামেলা পরিবেশ, ফিতনা), সেখানে না দেওয়াই ভালো।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"প্রয়োজনের তাগিদে পর্দার সীমার মধ্যে কাজ করা জায়েজ। কিন্তু পর্দা লঙ্ঘন করে চাকরি করা নাজায়েজ।"
(মা’আরিফুল কুরআন, ৪/১২১)

আপনার জন্য করণীয়:

  1. প্রথমে বাড়িতে বসে কাজের চেষ্টা করুন: অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং, টিউশনি, বা কোনো নারীদের প্রতিষ্ঠানে অনলাইন জব (যেমন- নারী কলেজের অনলাইন শিক্ষিকা) – এতে পর্দা পুরোপুরি রক্ষা হবে।
  2. যদি বাইরে যেতেই হয়:
    • শুধু নারী প্রধান্য প্রতিষ্ঠান (যেমন- স্কুল, মাদ্রাসা, নারী ব্যাংক) এ আবেদন করুন।
    • আবেদনে পূর্ণ হিজাবসহ (নেকাব, চোখ ছাড়া) ছবি দিন। যদি প্রতিষ্ঠান এতে না মানে, তাহলে অন্য উপায় দেখুন।
    • ভাইভায় মাহরাম (পিতা, ভাই) সাথে নিন।
  3. যদি এতেও সুযোগ না হয়: বাধ্য স্থলে বোরকা ও হিজাব পরে আবেদন করতে পারেন। তবে নেক নিয়তে করুন, আল্লাহ সহায় হবেন।

নোট: কোনো অবস্থাতেই পুরুষের সাথে ফ্রি মিক্সড (খোলামেলা মেলামেশা), অশ্লীল পোশাক, বা গায়র-মাহরামের সাথে নিষিদ্ধ সময় কাটানো জায়েজ নয়।


সারসংক্ষেপ:

  • আপনি পর্দার শর্ত রক্ষা করে চাকরি করতে পারেন, কারণ এটা আপনার জন্য প্রয়োজনীয় (পরিবারের দায়িত্ব, আর্থিক সঙ্কট)।
  • ছবি ও ভাইভার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন।
  • অনলাইন বা নারী প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করাই উত্তম।
  • যদি বাধ্য হয়ে বাইরে যেতে হয়, তাহলে বোরকা/হিজাব ও মাহরামের সঙ্গ নিন।

দুআ:

“রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া ক্বিনা আযাবান নার।”
(হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দিন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।)

আল্লাহ আপনার উত্তম ব্যবস্থা করে দিন। ধৈর্য ধরুন, নেক নিয়ত রাখুন।

আল্লাহু আলাম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.