এ আই দিয়ে প্রাণীর ছবি তৈরি ও ভিডিও এডিটে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হালাল নাকি হারাম?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত:
(১) এআই দিয়ে প্রাণীর ছবি তৈরি করা এবং
(২) ভিডিও এডিটে হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যুক্ত করা — হালাল না হারাম?
নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে প্রতিটি অংশের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. এআই দিয়ে প্রাণীর ছবি তৈরি করা
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
প্রাণীর ছবি (চিত্র) তৈরি করা ইসলামে সাধারণত নিষিদ্ধ (হারাম)। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ"
“কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে ছবি তৈরি কারীরা।”
(সহিহ বুখারি: ৫৯৫০, সহিহ মুসলিম: ২১০৯)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যে কোনো সম্পূর্ণ প্রাণী বা মানুষের ছবি তৈরি করা হারাম — তা হাতে আঁকা হোক বা ডিজিটাল মাধ্যমেই হোক, যদি তা ‘তাসবির’ (সৃষ্টির মতো বানানোর ইচ্ছা) হয়।
রদ্দুল মুহতার (১/৬১৭) ও ফাতাওয়া আলমগিরী (৫/৩৫৭) তে উল্লেখ আছে: প্রাণীর ছবি তৈরি করা নিষিদ্ধ, এবং তা কাপড়, দেওয়াল, কাগজ যেখানেই হোক না কেন।
এআই দিয়ে তৈরি প্রাণীর ছবি:
এআই টুল (যেমন Dall-E, Midjourney) দিয়ে প্রাণীর ছবি তৈরি করলেও তা উক্ত হুকুমের আওতায় পড়ে, কেননা এটি ‘তাসবির’ (ছবি বানানো)-এর অন্তর্ভুক্ত। তবে ফিকহে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে:
- অসম্পূর্ণ ছবি: যদি মাথা বা চোখ-মুখ স্পষ্ট না হয়, কিংবা গাছপালা, পাহাড় ইত্যাদি অপ্রাণীর ছবি হয়, তবে তা জায়েজ।
- প্রয়োজনীয়তা: শিক্ষা, গবেষণা বা শিশুদের খেলনার জন্য কখনো কখনো অনুমতি দেওয়া হয়েছে (যেমন পুতুল), তবে সেটি শর্তসাপেক্ষ।
মুফতি তকি উসমানি (দা. বা.) বলেন:
“বর্তমানে ডিজিটাল ছবিও তাসবিরের মধ্যে গণ্য হবে, যদি তা প্রাণীর সম্পূর্ণ আকৃতি ধারণ করে। তবে যদি ছবি তোলা হয় (ফটোগ্রাফি) বা ভার্চুয়াল বাস্তবতার মতো হয়, সেটি সম্পর্কে ফিকহে মতভেদ আছে। এআই দিয়ে বানানো ছবি সরাসরি ‘তাসবির’-এর মতোই। তাই এড়িয়ে চলা উচিত।”
(ইসলাহি খুতুবাত, জাওয়াহিরুল ফিকহ)
সিদ্ধান্ত:
এআই দিয়ে প্রাণীর সম্পূর্ণ ও স্পষ্ট ছবি তৈরি করা (যাকে প্রাণী হিসেবে চেনা যায়) হারাম।
হ্যাঁ যদি ছবিটি কোন মহিলার না হয় এবং তাহা যদি প্রিন্ট না করা হয় সেক্ষেত্রে কিছু আলেমদের মতে এর অনুমতি আছে, তবে অনেকের মতে এ ক্ষেত্রেও তাহা অবৈধই থাকবে। তাই বিনা প্রয়োজনে এ ধরনের ছবির কাজ করা না করাই সতর্কতা।
২. ভিডিও এডিটে হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দেওয়া
হানাফি ফিকহে সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের বিধান:
হানাফি মাজহাবের মূল অবস্থান হলো:
- বাদ্যযন্ত্রযুক্ত সঙ্গীত (Music with instruments) হারাম।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতানুযায়ী, গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার নাজায়েজ।
দলিল: কুরআনে বলা হয়েছে:
"وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ"
“আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে, যাতে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে…” (সূরা লুকমান: ৬)
ইমাম তাবারি, ইবনে কাসির ও অন্যান্য মুফাসসিরগণ ‘লাহওয়াল হাদিস’ এর তাফসিরে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র উল্লেখ করেছেন।
সহিহ বুখারিতে হাদিস:
"لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ"
“অবশ্যই আমার উম্মতের এমন কিছু লোক হবে যারা যিনা, রেশমি কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” (সহিহ বুখারি: ৫৫৯০)
- শুধু কণ্ঠসঙ্গীত (নাশিদ) — তা যদি অশ্লীলতা বা নারী-পুরুষের উত্তেজনা না থাকে — তাহলে অনেক হানাফি আলিম একে জায়েজ বলেছেন, তবে বাদ্যযন্ত্র ছাড়া।
হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের বিধান:
‘হালকা’ বললে ফিকহে কোনো পার্থক্য হয় না। বাদ্যযন্ত্রের শব্দ যতই হালকা হোক, তা বাদ্যযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত। তাই যেকোনো রকম বাদ্যযন্ত্রযুক্ত মিউজিক (যেমন পিয়ানো, গিটার, ইলেক্ট্রনিক মিউজিক) ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ডে দেওয়া হারাম।
বিকল্প সমাধান:
- শুধু কণ্ঠের নাশিদ (বাদ্যযন্ত্র ছাড়া) ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহার করা জায়েজ হতে পারে, তবে তা উত্তেজক না হয়।
- প্রাকৃতিক শব্দ (নদীর ধারা, পাখির ডাক) বা সাউন্ড ইফেক্ট (যেমন ঘড়ি, বৃষ্টি) ব্যবহার করা যায়।
- মিউজিক ছাড়াই ভিডিও এডিট করা উত্তম।
মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.) মা’আরিফুল কুরআন (সূরা লুকমানের তাফসিরে) বলেন:
“গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র শোনা জায়েজ নয়। যে কাজে এগুলো থাকে, তা হারাম।”
আর ফাতাওয়া উসমানি (২/২২১) তে উল্লেখ: ইলেক্ট্রনিক মিউজিকও বাদ্যযন্ত্রের হুকুমেই পড়ে।
সারসংক্ষেপ
ফ্রিলান্সিংয়ের জন্য এই কাজ করলে উপার্জিত অর্থও হারাম (নাজায়েজ) হবে, কারণ হারাম কাজের বিনিময় গ্রহণ নিষিদ্ধ।
তবে যদি ক্লায়েন্টকে জানিয়ে আপনি বিকল্প (প্রাণীর ছবি না করা, মিউজিক না দেওয়া) প্রস্তাব দেন এবং ক্লায়েন্ট রাজি হয়, তাহলে তা জায়েজ হতে পারে।
সর্বোত্তম পথ:
এমন কাজ বেছে নিন যাতে উভয় বিষয় থেকে মুক্ত থাকা যায়। আল্লাহ তাআলা হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।
রেফারেন্স সমূহ (হানাফি কিতাব):
- সহিহ বুখারি – হাদিস নং ৫৯৫০, ৫৫৯০
- সহিহ মুসলিম – হাদিস নং ২১০৯
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন) – ১/৬১৭, ৬/৩৯২
- ফাতাওয়া আলমগিরী – ৫/৩৫৭
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি) – ৪/২৭৫
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তকি উসমানি) – ২/২২১, ৩/২৮৯
- মা’আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি) – সূরা লুকমানের তাফসির
- আল-হিদায়া – ২/৩১১ (ছবি ও সঙ্গীত প্রসঙ্গে)
- বেহেশতি জেওর – ৩/৩১-৩৫
- উসুলুশ শাশি – কিয়াস ও ইজতিহাদের আলোকে তাসবির ও মিউজিকের হুকুম