প্রফিট শেয়ার করে ড্রপশিপিং জায়েজ হবে কি না?
Business and Job · Hanafi
Question
যে প্রসেসে আমরা কাজ করতে চাচ্ছি:
- যারা আমাদের সাথে যুক্ত হবে পার্টনার হিসেবে, তারা আমাদের পেইজের employee হবে ইন শা আল্লাহ। তাই তারা মূলত আমাদের পেইজের ই প্রচারণা চালাবে। কাস্টমার যে প্রোডাক্ট কিনবে, সে জানবেই যে সে আমাদের পেইজ থেকেই কিনছে। কিন্তু আমাদের পার্টনার/ employees যারা কষ্ট করে কাস্টমার অব্দি আমাদের পেইজ কে রিচ করেছে প্রচারণা চালিয়ে, তাদের মাধ্যমেই যেহেতু আমাদের বিক্রি হয়েছে, তাই তাদের কে আমরা আমাদের প্রফিট থেকে কিছুটা অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে দিব। যেই প্রোডাক্ট তারা আমাদের হয়ে বিক্রি করিয়ে দিবে, সেখানে আমাদের প্রফিট বেশি হলে তাকে বেশি পারিশ্রমিক দিব, আর প্রফিট কম হলে কম পারিশ্রমিক দিব। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এমাউন্ট নেই, প্রোডাক্টে আমাদের প্রফিটের উপর তাদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ হবে। তারা নিজেরাও নিজেদের কে আমাদের পেইজের সদস্যই মনে করবে। আর পণ্যের যেকোন দোষ ত্রুটির জন্য ও তারা নয়,বরঞ্চ আমরাই দায়বদ্ধ থাকবো,যেহেতু কাস্টমারের কাছে সরাসরি আমরাই সেল করছি।
শায়েখ এটা জায়েজ কি? আর জায়েজ না হলে আর কোন প্রসেসে ড্রপশিপিং করা যায়, যেটা জায়েজ?
Answer
উত্তর: ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার বর্ণিত ড্রপশিপিং পদ্ধতিটি ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়। কারণ এতে একটি মৌলিক শর‘ঈ সমস্যা রয়েছে, যা নিম্নরূপ:
যে কারণে পদ্ধতিটি জায়েজ নয়:
-
পারিশ্রমিকের অনিশ্চয়তা (ঘারার): আপনি আপনার পার্টনার/এমপ্লয়ীদেরকে লাভের একটি অংশ দেওয়ার কথা বলছেন, যা লাভের পরিমাণের উপর নির্ভরশীল। ইসলামী ফিকহে এজেন্ট বা দালালের পারিশ্রমিক (উজরত বা কমিশন) নির্দিষ্ট ও সুনির্ধারিত হতে হবে। এটি যদি 'লাভের শতাংশ' হিসেবেও হয়, তাহলে সেই শতাংশের হারটি (যেমন: ১০%) পূর্বেই নির্ধারিত করতে হবে। আপনি বলছেন, "প্রফিট বেশি হলে বেশি পারিশ্রমিক, কম হলে কম পারিশ্রমিক দিব"—এটি একটি অজানা ও অনিশ্চিত চুক্তি, যা জুয়া ও প্রতারণার দিকে নিয়ে যায়। এটি ঘারার (অনিশ্চয়তা) এর অন্তর্ভুক্ত, যা নবী করীম (সাঃ) নিষেধ করেছেন।
- হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘারার (অনিশ্চয়তা) যুক্ত ক্রয়-বিক্রয় নিষেধ করেছেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫১৩)
- হানাফি ফিকহের নীতি: ইসলামী ফিকহে দালালি বা এজেন্সির মজুরি (কমিশন) অবশ্যই নির্ধারিত ও জানা থাকতে হবে। লাভের একটি আনুপাতিক নির্দিষ্ট হার (যেমন: ৫%) নির্ধারণ করলে তা জায়েজ, তবে শর্ত হলো, ব্যবসায় লাভ না হলেও কাজের বিনিময়ে তাকে কিছু না কিছু দিতে হবে অথবা চুক্তি অনুযায়ী কোনো পারিশ্রমিক না-ও দেয়া যেতে পারে। কিন্তু আপনার পদ্ধতিতে পারিশ্রমিক শুধু লাভের উপর নির্ভরশীল, যা জায়েজ নয়।
-
প্রকৃত বিক্রেতা ও এজেন্টের মধ্যে বিভ্রান্তি: যদিও আপনি বলেছেন গ্রাহক জানবে সে আপনার পেইজ থেকে কিনছে, তবুও পার্টনারদের 'এমপ্লয়ি' বা 'সদস্য' বলে অভিহিত করা এবং তাদের মাধ্যমেই গ্রাহক আসা—এতে করে মূল দায়-দায়িত্বের সম্পর্ক অস্পষ্ট হয় না। কিন্তু মূল সমস্যা হলো পারিশ্রমিক নির্ধারণের পদ্ধতি, যা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
জায়েজ ড্রপশিপিং পদ্ধতি:
আপনি যে ড্রপশিপিং ব্যবসা শুরু করতে চান, তা নিম্নলিখিত ইসলামী নীতি অনুসরণ করে জায়েজ করতে পারেন:
শরীয়তসম্মত পদ্ধতি (দালালি বা এজেন্সি চুক্তি):
- পার্টনাররা হবে দালাল (এজেন্ট): তাদেরকে কোম্পানির সদস্য বা এমপ্লয়ি নয়, বরং স্বতন্ত্র দালাল (এজেন্ট) হিসেবে নিয়োগ দিন।
- পারিশ্রমিক নির্ধারণ করুন: তাদের পারিশ্রমিক হবে একটি নির্দিষ্ট লভ্যাংশের হার বা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা, কিন্তু তা অবশ্যই পূর্বনির্ধারিত ও জানা থাকতে হবে।
- উদাহরণ: আপনি তাদের বলবেন, "আপনি যদি আমাদের পেইজের মাধ্যমে একটি পণ্য বিক্রি করিয়ে দেন, তাহলে আমরা আপনাকে সেই পণ্যের বিক্রয় মূল্যের ৫% কমিশন দেব" অথবা "প্রতি পণ্য বিক্রির জন্য আপনাকে ৫০ টাকা করে কমিশন দেব।"
- নীতিগত পার্থক্য: আপনি লাভের ৫% দিচ্ছেন, আর আগের পদ্ধতিতে লাভ বেশি হলে বেশি, কমলে কম—এখানেই পার্থক্য। এখানে হার (৫%) নির্দিষ্ট, ফলে অনিশ্চয়তা দূর হচ্ছে।
- পণ্যের দায়িত্ব: আপনি যেমন বলেছেন, পণ্যের দোষ-ত্রুটি ও গ্রাহক সেবার দায়িত্ব আপনার (মূল মালিকের) থাকবে। এটি জায়েজ পদ্ধতির জন্য সঠিক।
- চুক্তির শর্ত: তাদের সাথে একটি লিখিত বা মৌখিক চুক্তি করুন, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে:
- তারা আপনার পক্ষে পণ্যের প্রচার করবে।
- ক্রেতা সরাসরি আপনার কাছ থেকে কিনবে।
- তাদের কমিশনের হার বা পরিমাণ (নির্দিষ্ট)।
- পণ্যের দোষ-ত্রুটির জন্য আপনি দায়ী।
- কোনো পণ্য ফেরত বা বাতিল হলে তাদের কমিশন প্রযোজ্য হবে কি না (সাধারণত বিক্রয় সম্পন্ন হলেই কমিশন প্রযোজ্য হয়, তবে চুক্তিতে শর্ত দেওয়া যেতে পারে)।
মোটকথা: আপনার বর্তমান পদ্ধতি যেখানে পারিশ্রমিক 'প্রফিট বেশি হলে বেশি, কমলে কম'—এটি জায়েজ নয়। আপনার কমিশনের হার বা পরিমাণ নির্দিষ্ট করতে হবে। তবেই আপনার ড্রপশিপিং ব্যবসা ইসলামী শরী‘আতসম্মত হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): দালালি ও এজেন্সি সংক্রান্ত অধ্যায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, দালালের মজুরি নির্ধারিত ও জানা থাকা জরুরি। (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়াহ, কিতাবুল বুয়ু’)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): এজেন্সির মজুরি সম্পর্কে বলা হয়েছে, মজুরি জানা থাকতে হবে এবং তা সম্পাদিত কাজের বিনিময়ে প্রাপ্য হবে। লাভের অংশ হিসেবে অনির্দিষ্ট মজুরি দেওয়া জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারাহ)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.): দালালির জন্য মজুরি নির্ধারণের সময় অনিশ্চয়তা (ঘারার) এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
- আপনার বর্ণিত পদ্ধতি: না, জায়েজ নয়।
- কীভাবে জায়েজ হবে: পারিশ্রমিকের হার (যেমন: ৫% কমিশন) পূর্বনির্ধারিত করে ফেলুন, তাহলে তা জায়েজ হবে।