স্বপ্নে যুদ্ধ, প্লেন বিধ্বস্ত, বিয়ে ও সন্তান দেখা নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি ও করণীয়।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3403
Questioner: 098765
Question Asked: 02 Aug 2026, 02:13 AM
Reviewed & Published: 02 Aug 2026, 04:11 AM
Views: 16
Tokens: 11,304
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু‌ আলাইকুম

আমি প্রায়ই এই স্বপ্নগুলো দেখি। ঘুম ভাঙ্গার পর বরাবরই অস্বস্তি বোধ হয়।

১. স্বপ্নে মনে হয় যুদ্ধ‌চলাকালীন কোন অবস্থায় আছি। অধিকাংশ সময় আমার সাথে আমার বোন থাকে। কখনো দেখি বিল্ডিং বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে, আমি দেখছি। আবার কখনো দেখি আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অন্য দের সাথে নিরাপত্তার জন্য পালাচ্ছি।

২. প্লেনে আগুন ধরে যাওয়া। আকাশে কোনো প্লেন যাওয়ার সময় আগুন ধরে নিচে পড়ছে আর আমি দাঁড়িয়ে দেখছি।‌‌ বেশ‌‌ কয়েকবার এই স্বপ্ন দেখেছি।‌কিছুদিন আগে দেখি পরিবারসহ ঘুরতে গিয়েছিলাম, সেখানে প্লেন থেকে বিশাল আকারের বোমা আমাদের দিকে টার্গেট করেছে। আরেকদিন দেখি প্লেন থেকে আমাকে মারার জন্য তাড়া করছে। আমি পানিতে ভয়ে ঝাঁপ দেই।

৩. স্বপ্ন দেখি আমার অন্য আরেকজনের সাথে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। সব সময় দেখি বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। বিয়ে ঠিক হলেও আমি পাত্রকে দেখিনি। অথচ আমি বিবাহিত। আমাদের সংসার জীবনে অনেক বেশি দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকে, অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে।

৪. বিয়ের তিন বছর হয়েছে কিন্তু আমাদের এখনো সন্তান নেই। মেডিকেলে তেমন কোন সমস্যা ধরা পড়েনি। কিন্তু প্রায়ই স্বপ্ন দেখি আমাদের সন্তান হয়েছে। এবং সেটা সব সময় ছেলে সন্তান। আমি আমার হাসবেন্ড প্রায়ই এই স্বপ্ন দেখি।

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বর্ণিত স্বপ্নগুলো এবং ঘুম ভাঙার পর যে অস্বস্তি বোধ হয়—এটি অনেক মানুষেরই হয়ে থাকে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্ন নিয়ে চিন্তিত না হয়ে বরং শরিয়ত সম্মত পদ্ধতিতে সাড়া দেওয়াই হলো করণীয়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. ইসলামী দৃষ্টিতে স্বপ্নের প্রকারভেদ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

الرُّؤْيَا ثَلَاثٌ: فَبُشْرَى مِنَ اللَّهِ، وَحَدِيثُ النَّفْسِ، وَتَخْوِيفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ "স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) মনের (দৈনন্দিন চিন্তার) কথা, এবং (৩) শয়তানের ভয় দেখানো।" (সহীহ বুখারী: ৬৯৮৫; সহীহ মুসলিম: ২২৬১)

  • রহমানী স্বপ্ন: যে স্বপ্ন দেখে ভালো লাগে, যা সত্য ও সুসংবাদ বহন করে।
  • নফসের খেয়াল: দিনের বেলায় মানুষ যা নিয়ে ভাবে, চিন্তা করে, দুশ্চিন্তা করে—ঘুমে তার প্রতিফলন দেখা যায়।
  • শয়তানী স্বপ্ন: এটি দুঃস্বপ্ন, যাতে মানুষকে ভয় দেখানো হয়, অস্থির করা হয় এবং ঘুম ভাঙার পর অস্বস্তি লাগে।

আপনি যে যুদ্ধ, প্লেন বিধ্বস্ত, বোমা, পালানো, অন্য কারো সাথে বিয়ে ইত্যাদি স্বপ্ন দেখেন—এগুলো মূলত দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা, অর্থনৈতিক চাপ এবং মানসিক অস্থিরতার প্রতিফলন। যখন মানুষ দীর্ঘদিন উদ্বেগ ও সংকটের মধ্যে থাকে, তখন মস্তিষ্কের অবচেতন অবস্থা এরূপ অস্থির দৃশ্য তৈরি করে। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এও উল্লেখ আছে যে, অধিকাংশ স্বপ্নই মনের খেয়াল ও চিন্তার ফল। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুস সাওম, বাবু মা ইয়ুফসিদুস সাওম)

আপনার সন্তান হয়েছে (ছেলে) —এই স্বপ্নটিও সন্তানের প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষার কারণে হতে পারে; কেননা আপনি ও আপনার স্বামী উভয়ে প্রায়ই এ স্বপ্ন দেখেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদও হতে পারে। কিন্তু স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা অতিরিক্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা উচিত নয়।


২. হানাফি ফিকহ ও হাদিস অনুযায়ী দুঃস্বপ্ন দেখলে করণীয়

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি এমন স্বপ্ন দেখে যা তার অপছন্দনীয়, সে যেন নিম্নোক্ত কাজগুলো করে:

১. ঘুম থেকে জেগে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে (শুকনো বা হালকা লালা, কাপড়ে দিলেও চলবে)। ২. শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া পড়বে:

أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ وَمِنْ شَرِّ هَذِهِ الرُّؤْيَا "আমি অভিশপ্ত শয়তান এবং এই স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।" ৩. ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়বে অথবা উঠে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়বে। ৪. কারো কাছে এই স্বপ্নের কথা বলবে না, বিশেষ করে অমঙ্গলজনক স্বপ্ন। ৫. এতে কোনো ক্ষতি হবে না, ইনশাআল্লাহ। (সহীহ বুখারী: ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম: ২২৬১)

বেহেশতী জেওর-এ আশরাফ আলী থানবী (রহ.) লিখেছেন:

"দুঃস্বপ্ন দেখলে ভয় পেয়ো না, এটা শয়তানের প্ররোচনা। জাগলেই উপরোক্ত আমল করো এবং মনে মনে ভাবো—এতে কোনো বালা-মুসিবত নেই। স্বপ্নকে কখনো ভবিষ্যদ্বাণী মনে করা উচিত নয়।" (বেহেশতী জেওর, স্বপ্নের আদব অধ্যায়)

ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

"যে স্বপ্নে ভয় বা অস্থিরতা লাগে, তা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। এ নিয়ে চিন্তা করা, লোকের কাছে বলা বা ব্যাখ্যা তালাশ করা উচিত নয়। বরং সাথে সাথে আল্লাহর জিকির করা এবং উপরোক্ত আমলগুলো করা দরকার।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ২, স্বপ্ন সংক্রান্ত ফতোয়া)

ফাতাওয়া আলমগীরী-তেও উল্লেখ আছে, মুসলমানের উচিত স্বপ্ন দেখে অস্থির না হয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করা এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাওয়া। (ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)


৩. সন্তান না হওয়া ও স্বপ্নে সন্তান দেখা সম্পর্কে ইসলামি দিকনির্দেশনা

সন্তান আল্লাহর দান। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ "আসমান ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন, যাকে চান কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে চান পুত্র সন্তান দান করেন।" (সূরা আশ-শূরা: ৪৯)

সুতরাং সন্তান হওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। স্বপ্নে সন্তান দেখার কারণে ভাববেন না যে তা অবশ্যই সত্য হবে, আবার এটাকে অমঙ্গলের লক্ষণও মনে করবেন না। বরং নিয়মিত দুআ ও ইস্তিগফার করুন। বিশেষ করে এই দুআটি পড়ুন:

رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ "হে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ থেকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দুআ শ্রবণকারী।" (সূরা আলে ইমরান: ৩৮)

মাআরিফুল কুরআনে মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, জাকারিয়া (আ.)-এর মতো দীর্ঘকাল সন্তান না হয়েও দুআ করতে থাকা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা আমাদের জন্য শিক্ষা। (মাআরিফুল কুরআন, ২/৩৩২)

তিন বছর হয়ে গেছে—এখনো সন্তান হয়নি, এতে হতাশ না হয়ে:

  • ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান
  • স্বামী-স্ত্রী উভয়ে নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ে দুআ করুন
  • দান-সাদকা করুন
  • ইস্তিগফার বেশি বেশি করুন
  • ধৈর্য ধারণ করুন, কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন

৪. অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা ও সংসার জীবনের অস্থিরতা

আপনি বলেছেন, সংসারে অর্থনৈতিক কারণে অনেক দুশ্চিন্তা থাকে। এটা বর্তমান যুগের একটি সাধারণ সমস্যা। কিন্তু মনে রাখবেন, রিজিকের মালিক আল্লাহ:

وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)

আর্থিক চাপের কারণে মানসিক অস্থিরতা থেকেই এই ধরনের স্বপ্নগুলো আসে। তাই দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য:

  • নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন
  • সালামুল ক্বলব: অর্থাৎ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকুন, তওবা-ইস্তিগফার করুন
  • সকাল-সন্ধ্যার যিকির (মাসনূন দুআ) পড়ুন
  • প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেমের সাথে পরামর্শ করুন, ইসলামি পরামর্শ নিন

৫. স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে সাধারণ নিয়ম

ইসলামী স্কলারগণ বলেন:

  • ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং প্রিয়জনকে বলা মুস্তাহাব।
  • খারাপ স্বপ্ন দেখলে উপরোক্ত আমল করা এবং কাউকে না বলা—এটাই সুন্নাহ।
  • স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা বা ব্যাখ্যা তালাশ করা শরিয়তে উৎসাহিত নয়, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জন্য।
  • স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তব জীবনে আমল ও দুআর প্রতিই নির্ভর করতে হবে।

৬. সারকথা ও দিকনির্দেশনা

| বিষয় | ইসলামি নির্দেশনা | |---|---| | যুদ্ধ, প্লেন বিধ্বস্ত, বোমার স্বপ্ন | শয়তানের ভয় দেখানো বা মনের দুশ্চিন্তার প্রতিফলন। করণীয়: বাম দিকে ৩ বার থুথু ফেলা, শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া, ডান কাত হয়ে শোয়া, কাউকে না বলা। | | অন্য কারো সাথে বিয়ের স্বপ্ন | নফসের খেয়াল বা দুশ্চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। এতে সংসার নিয়ে কোনো ভয় নেই। | | সন্তান হয়েছে (ছেলে) | সন্তানের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। হতে পারে আল্লাহর সুসংবাদ, তবে স্বপ্নের ওপর নির্ভর না করে দুআ ও চিকিৎসা চালিয়ে যান। | | ঘুম ভাঙার পর অস্বস্তি | স্বপ্নের কারণে নয়, নিয়মিত আমল করলে এবং মানসিক চাপ কমালে ইনশাআল্লাহ কমে যাবে। |

মনে রাখবেন—রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا يَقُصُّ رُؤْيَا إِلَّا عَلَى حَبِيبٍ أَوْ لَبِيبٍ "স্বপ্ন শুধু কোনো প্রিয়জন বা জ্ঞানী ব্যক্তিকেই বলবে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫০২০)

আপনি যদি কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যাই শুনতে চান, তাহলে কোনো দ্বীনদার ও বিজ্ঞ আলেমকে বলুন, কিন্তু মনে রাখবেন—স্বপ্ন কখনো ভাগ্য নির্ধারণ করে না। ভাগ্য নির্ধারণ করে আল্লাহর ফয়সালা, আর আমাদের কর্তব্য হলো আমল, দুআ ও ধৈর্য


আল্লাহ তাআলা আপনার সংসারে শান্তি, বরকত ও নেক সন্তান দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.