কালিমা কয়টি?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
ইসলামী পরিভাষায় ‘কালিমা’ (কলেমা) বলতে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসঘোষণামূলক বাণীসমূহকে বোঝানো হয়। সাধারণত প্রচলিত অর্থে ছয়টি কালিমা উল্লেখ করা হয়—এটি হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ এবং উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষাপদ্ধতিতে ব্যাপকভাবে গৃহীত। তবে কুরআন-হাদিসে নির্দিষ্টভাবে ‘ছয় কালিমা’ বলতে কিছু নেই; বরং প্রতিটি কালিমার আলাদা আলাদা দলিল বিদ্যমান।
প্রচলিত ছয় কালিমার তালিকা (আরবি, অনুবাদ ও দলিল)
১. কালিমা তাইয়্যিবা (পবিত্র বাণী)
আরবি:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ
অনুবাদ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল।
দলিল: সহিহ বুখারি (হাদিস নং ৮) ও সহিহ মুসলিম (হাদিস নং ২২)-এ উল্লেখিত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’–ই কালিমা তাইয়্যিবার মূলভিত্তি।
২. কালিমা শাহাদাত (সাক্ষ্যদানের বাণী)
আরবি:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ
অনুবাদ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।
দলিল: সূরা আলে ইমরান (৩:১৮) ও সূরা হাশর (৫৯:২২-২৩)-এ শাহাদাতের মূল বক্তব্য বিদ্যমান। হাদিসে ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…’ ইসলাম গ্রহণের শর্ত হিসেবে বর্ণিত হয়েছে (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৮)।
৩. কালিমা তামজিদ (মহিমার বাণী)
আরবি:
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ وَلَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيْمِ
অনুবাদ: আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, এবং কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই মহান আল্লাহ ছাড়া।
দলিল: এ বাক্যগুলো একত্রে কুরআন-হাদিসে বহু স্থানে আছে। যেমন—সুবহানাল্লাহ (সূরা আল-ইসরা ১৭:৪৪), আলহামদুলিল্লাহ (সূরা ফাতিহা ১:২), আল্লাহু আকবার (সূরা বাকারা ২:২৫৫) প্রভৃতি। হাদিসে একে ‘বাকিয়াতুস সালিহাত’ (চিরস্থায়ী সৎকর্ম) বলা হয়েছে (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৪০৪)।
৪. কালিমা তাওহিদ (একত্বের বাণী)
আরবি:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، يُحْيِيْ وَيُمِيْتُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ
অনুবাদ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই, তিনি জীবন দেন ও মৃত্যু দেন এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
দলিল: সহিহ মুসলিম (হাদিস নং ২৬৯৩) ও সহিহ বুখারি (হাদিস নং ৪২৯৩)-এ এই বাক্যটি ‘কালিমাতুত তাওহিদ’ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
৫. কালিমা ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনার বাণী)
আরবি:
أَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّيْ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
অনুবাদ: আমি আমার রব আল্লাহর কাছে প্রতিটি পাপ থেকে ক্ষমা চাই এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই (তওবা করি)।
দলিল: হাদিসে ‘আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি’ প্রতিদিন ১০০ বার পড়ার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৭০২)।
৬. কালিমা রাদ্দে কুফর (কুফর অস্বীকারের বাণী)
আরবি:
اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْئًا وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ، تُبْتُ عَنْهُ وَتَبَرَّأْتُ مِنَ الْكُفْرِ وَالشِّرْكِ وَالْكِذْبِ وَالْغِيْبَةِ وَالْبِدْعَةِ وَالْفِسْقِ وَالْمَعَاصِيْ كُلِّهَا، وَأَسْلَمْتُ وَأَقُوْلُ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি জেনে-শুনে আপনার সাথে কাউকে শরিক করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই, এবং যে পাপ আমি জানি না তার জন্যও ক্ষমা চাই। আমি তা থেকে তওবা করছি এবং কুফর, শিরক, মিথ্যা, গিবত, বিদ‘আত, ফাস্ক ও সমস্ত গুনাহ থেকে বিরত থাকছি। আমি ইসলাম গ্রহণ করছি এবং বলছি: আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
দলিল: এই কালিমার মূল বক্তব্য ‘আউযু বিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইয়া’—এ মর্মে হাদিস রয়েছে (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮৫৪; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস নং ১৯৪৪৩)।
হানাফি ফিকহের গ্রন্থে ছয় কালিমার স্বীকৃতি
- বাহিশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ প্রথম অধ্যায়ে ছয় কালিমার তালিকা ও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মাদ শফী উসমানী রহ.)-এ কালিমাসমূহের গুরুত্ব ও আমলের বিবরণ রয়েছে।
- ফাতাওয়া উসমানী ও ফাতাওয়া আলমগীরী-তে কালিমা তাইয়্যিবা ও শাহাদাতের আহকাম বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।
মুতাকাদ্দিমীন ওলামায়ে কেরাম (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ)-এর কোনো নির্দিষ্ট বিবৃতিতে ‘ছয় কালিমা’ শব্দটি পাওয়া না গেলেও, উপমহাদেশের হানাফি ফিকহের শিক্ষাক্রমে এটি সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তা বিদ‘আত নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ কালিমাসমূহের একটি ব্যবহারিক সংগ্রহ।
সারসংক্ষেপ
প্রচলিত হানাফি মতে কালিমা ছয়টি। তবে শুধু কুরআন-হাদিসের ভাষ্যে যে কয়েকটি বাক্য ‘কালিমা’ হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে, সেগুলো প্রধানত দুইটি:
- কালিমাতুত তাওহিদ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু)
- কালিমাতুশ শাহাদাত (আশহাদু আল্লা ইলাহা…)
অবশিষ্ট চারটি মূলত ওপরের বাণীগুলোর সম্প্রসারিত রূপ বা তার সাথে যুক্ত জিকির। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মুসলমানের সুবিধার্থে হানাফি উলামায়ে কেরাম এগুলোকে আলাদাভাবে সংকলন করে ‘ছয় কালিমা’ নামে পরিচিতি দিয়েছেন।