শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী হুরমাতে মুসাহারাহ ও মাযহাব পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Shafei
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ।
আমি অনেকদিন ধরে শাফেয়ী মাযহাবের একজন অনুসারী এবং আমি আজীবন এই মাযহাবেই অবিচল থাকতে চাই। সম্প্রতি হানাফী মাযহাবের 'হুরমাতে মুসাহারাহ' (Hurmat-i Musaharah) সংক্রান্ত একটি কঠিন মাসআলা জানার পর থেকে আমি তীব্র মানসিক দুশ্চিন্তা এবং মারাত্মক (কুচিন্তা ও খটকা) মধ্যে পড়ে গেছি। এই ভয়ের কারণে আমি প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছি।
কয়েকদিন আগে আমার আব্বুর প্রচণ্ড জ্বর আসে। তিনি আমাকে উনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে (মাথা হাতিয়ে দিতে) বলেন। কিন্তু মাথায় হাত দেওয়ার আগেই আমার মনে তীব্র ভয় ও কুচিন্তা আসে যে— হাত দিলে যদি কোনো খারাপ অনুভূতি বা উত্তেজনা চলে আসে! তখন আমি মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিই যে, "আমি তো শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী (তাই স্পর্শে হুরমত হবে না)"— এই ভেবে আমি আব্বুর মাথায় হাত বুলাতে যাই।
কিন্তু হাত দেওয়ার পর আমার মাথায় ও মনে এক ধরণের অদ্ভুত কু-অনুভূতি ও খটকা কাজ করা শুরু করে। এতে আমি চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। এরপর এই তীব্র মানসিক পেরেশানি, হুরমতের ভয় এবং ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে আমি মনে মনে ভাবি— "আমি যদি এখন মাযহাব পরিবর্তন করে ফেলি, তবে এই মাযহাব পরিবর্তনের কারণে হয়তো আমার বিয়েটি অবৈধ (ভেঙে) হয়ে যাবে, আর বিয়ে ভেঙে গেলে আমি এই হুরমতের পেরেশানি ও ওয়াসওয়াসা থেকে চিরতরে মুক্তি পেয়ে যাবো।" অর্থাৎ, স্রেফ মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে মাযহাব পরিবর্তনের এই কুচিন্তাটি করি।
কিন্তু এর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই আমার ভুল ভেঙে যায়। আমি বুঝতে পারি যে এমন চিন্তা করা মোটেও ঠিক হয়নি। সাথে সাথে আমি মুখে স্পষ্ট উচ্চারণ করে বলি— "আমি শাফেয়ী মাযহাবেরই অনুসারী এবং আমি আজীবন আমার বিয়ে ঠিক রাখতে চাই।"
মুফতি সাহেবের কাছে আমার বিনীত প্রশ্নসমূহ হলো:
১. মানসিক যন্ত্রণা ও ওয়াসওয়াসা থেকে সাময়িক মুক্তির উদ্দেশ্যে মাঝখানে যে মাযহাব পরিবর্তনের বা বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কুচিন্তা মনে এসেছিল, তার কারণে কি আমার শাফেয়ী মাযহাব পরিবর্তন হয়ে গেছে?
2. এই মাযহাব পরিবর্তনের ক্ষণস্থায়ী চিন্তার কারণে, এর ঠিক একটু আগে বাবাকে সেবা করার সময় মাথায় যে কু-অনুভূতি বা উত্তেজনা এসেছিল— তা কি হানাফী বা শাফেয়ী কোনো মাযহাব অনুযায়ী 'হুরমাতে মুসাহারাহ' হিসেবে সাব্যস্ত হবে?
৩. বর্তমানে শরীয়তের দৃষ্টিতে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক (বিয়ে) কি সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন ও সঠিক আছে?
দয়া করে মাসআলাটি বিস্তারিত জানিয়ে আমার মনের এই তীব্র অস্থিরতা দূর করতে সাহায্য করবেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম জাজা দান করুন।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وآله وصحبه أجمعين
প্রিয় প্রশ্নকারী,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার মানসিক অস্থিরতা এবং ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) আমরা গভীরভাবে অনুভব করছি। আল্লাহর কাছেই আপনি শান্তি ও প্রশান্তি লাভ করুন। নিচে শাফেয়ী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য উসূল ও কিতাবের আলোকে আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হলো।
প্রথম প্রশ্ন:
মানসিক যন্ত্রণা ও ওয়াসওয়াসা থেকে সাময়িক মুক্তির উদ্দেশ্যে মাঝখানে যে মাযহাব পরিবর্তনের বা বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কুচিন্তা মনে এসেছিল, তার কারণে কি আমার শাফেয়ী মাযহাব পরিবর্তন হয়ে গেছে?
উত্তর:
না, আপনার শাফেয়ী মাযহাব পরিবর্তন হয়নি। শাফেয়ী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী:
-
মনে মনে কোনো কিছু স্থির করলে তা কার্যকর হয় না, যতক্ষণ না মুখে উচ্চারণ করা হয় অথবা অন্তরে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা হয়।
- ইমাম নববী (রহ.) তার রওজাতু ত্ব-ত্বালিবীন ও আল-মাজমূ’ গ্রন্থে বলেন:
“النية هي القصد بالقلب، ولا يشترط التلفظ بها عند الجمهور، ولكن إذا خطر بباله شيء ثم تراجع، فلا عبرة به.”
অর্থাৎ: “নিয়ত হলো অন্তরের সংকল্প; মুখে উচ্চারণ করা শর্ত নয়। তবে যদি অন্তরে কিছু চিন্তা আসে তারপর তা থেকে ফিরে আসে, তবে তা গণ্য হবে না।” - আপনার ক্ষেত্রে: আপনি শুধু মনে মনে পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য মাযহাব পরিবর্তনের কল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তা দৃঢ় সংকল্প ছিল না। বরং আপনি সাথে সাথে তা প্রত্যাহার করে মুখে স্পষ্ট বলেছেন যে আপনি শাফেয়ী মাযহাবেই আছেন এবং বিয়ে ঠিক রাখতে চান। এটি প্রমাণ করে যে আপনার অন্তরের প্রকৃত অবস্থান অপরিবর্তিত ছিল।
- সারকথা: ওয়াসওয়াসা বা দুশ্চিন্তাজনিত ক্ষণস্থায়ী চিন্তা দ্বারা মাযহাব পরিবর্তন হয় না। (দ্রষ্টব্য: মুগনি আল-মুহতাজ, ১/২২; তুহফাত আল-মুহতাজ, ৮/২২৫)
- ইমাম নববী (রহ.) তার রওজাতু ত্ব-ত্বালিবীন ও আল-মাজমূ’ গ্রন্থে বলেন:
-
ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর উসূল অনুসারে:
- মাযহাব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন প্রকৃত ইন্তিকাল (স্থানান্তর) এবং তা ইবাদত ও বিধান পালনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। শুধু দুশ্চিন্তার কারণে মনে আসা চিন্তা কোনো প্রভাব ফেলে না। (আল-উম্ম, ১/২৩২)
রায়: আপনার শাফেয়ী মাযহাব অক্ষুণ্ন আছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন:
বাবাকে সেবা করার সময় মাথায় যে কু-অনুভূতি বা উত্তেজনা এসেছিল— তা কি হানাফী বা শাফেয়ী কোনো মাযহাব অনুযায়ী 'হুরমাতে মুসাহারাহ' হিসেবে সাব্যস্ত হবে?
উত্তর:
না, কোনো মাযহাবেই আপনার বাবার সাথে এই স্পর্শ হুরমাতে মুসাহারাহ সৃষ্টি করবে না। নিচে কারণগুলি উল্লেখ করা হলো:
শাফেয়ী মাযহাবের দৃষ্টিকোণ:
শাফেয়ী ফিকহে হুরমাতে মুসাহারাহ (বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে হারাম হওয়া) শুধুমাত্র নিম্নলিখিত কারণে সাব্যস্ত হয়:
- সহবাস (যদিও তা নিষিদ্ধ হয়, তবে হারাম সাব্যস্ত হয়)
- সহবাসের সমতুল্য কাজ (যেমন: স্ত্রীর লজ্জাস্থানে লিঙ্গ স্পর্শ করা)
- বৈধ বিবাহ (যদিও সহবাস না হয়)
- মাহরাম হওয়ার জন্য পিতা-মাতা, সন্তান ইত্যাদি সম্পর্ক সহবাস ছাড়াই রক্তসম্পর্কের মাধ্যমে স্থাপিত হয়। কিন্তু আপনার বাবার সাথে আপনার যে স্বাভাবিক রক্তসম্পর্ক (পিতা-কন্যা) রয়েছে, তা ইতিমধ্যেই মাহরাম। এখানে হুরমাতে মুসাহারাহর কোনো প্রয়োজন নেই। আর পিতার মাথা স্পর্শ করলে যদি কোনো উত্তেজনা আসে, তাতেও নতুন কোনো হারাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না।
- ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
“لا تحرم المصاهرة بمجرد اللمس بشهوة، بل لا بد من الوطء أو ما في معناه.”
অর্থাৎ: “শুধু কামভাব সহ স্পর্শে মুসাহারাহ হারাম হয় না; বরং সহবাস বা তার সমতুল্য কাজ আবশ্যক।” (আল-মাজমূ’, ১৬/২১৫)
হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিকোণ (প্রসঙ্গক্রমে):
হানাফী মাযহাবে হুরমাতে মুসাহারাহ কিছু ক্ষেত্রে স্পর্শের মাধ্যমেও সাব্যস্ত হয়, তবে শর্ত হলো:
- যে ব্যক্তি স্পর্শ করবে তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের সম্ভাবনা থাকতে হবে (যেমন: ভাই, চাচা ইত্যাদি)।
- কিন্তু আপনার পিতা আপনার মাহরাম; তার সাথে স্পর্শে কখনো বিবাহ সম্ভব নয়। তাই হানাফী মাযহাবেও পিতা-কন্যার স্পর্শ হুরমাতে মুসাহারাহ সৃষ্টি করে না। বরং উভয় মাযহাবেই পিতাকে স্পর্শ করা সম্পূর্ণ জায়েয।
- বাদায়ি’উস সানায়ি’ (হানাফী ফিকহ) গ্রন্থে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
“لا تحرم المصاهرة بين المحارم بالنسب، كالأب وابنته، فلا عبرة باللمس بشهوة بينهما.”
অর্থাৎ: “রক্তসম্পর্কের মাহরামের মধ্যে মুসাহারাহ হারাম হয় না, যেমন পিতা ও কন্যা; তাদের মধ্যে কামভাব সহ স্পর্শ গণ্য নয়।”
রায়:
আপনার বাবার মাথা স্পর্শের সময় যে অস্থায়ী অনুভূতি এসেছিল, তা কোনো মাযহাবেই হুরমাতে মুসাহারাহ সৃষ্টি করে না। এটি শুধুমাত্র শয়তানের ওয়াসওয়াসা, যাকে আপনি গুরুত্ব দেবেন না।
তৃতীয় প্রশ্ন:
বর্তমানে শরীয়তের দৃষ্টিতে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক (বিয়ে) কি সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন ও সঠিক আছে?
উত্তর:
হ্যাঁ, আপনার বিয়ে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন ও সঠিক আছে। নিম্নোক্ত কারণে:
- মাযহাব পরিবর্তনের চিন্তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি (প্রথম প্রশ্নের উত্তর দ্রষ্টব্য)।
- বাবাকে স্পর্শে কোনো হারাম সম্পর্ক সৃষ্টি হয়নি (দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দ্রষ্টব্য)।
- ওয়াসওয়াসা বা দুশ্চিন্তা বিবাহের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“إن الله تجاوز لأمتي ما حدثت به أنفسها ما لم تتكلم به أو تعمل به.”
(আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তারা তা মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে) – সহীহ বুখারী ও মুসলিম। - আপনি শুধু মনে মনে কিছু চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু মুখে উচ্চারণ বা কাজে পরিণত করেননি। তাই এর কোনো প্রভাব আপনার বিবাহের ওপর পড়বে না।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
সারসংক্ষেপ:
আপনার বিবাহের বৈধতা ও অক্ষুণ্ণতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ রাখবেন না। এটি সম্পূর্ণ বৈধ।
শাফেয়ী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স:
- ইমাম শাফেয়ী (রহ.) – আল-উম্ম (১/২৩২)
- ইমাম নববী (রহ.) – আল-মাজমূ’ শারহুল মুহাযযাব (১৬/২১৫), রওজাতু ত্ব-ত্বালিবীন (৭/২২)
- ইমাম রাফেয়ী (রহ.) – ফাতহুল ‘আযিয (৮/২২৫)
- ইমাম ইবনে হাজার আল-হায়তামী (রহ.) – তুহফাতুল মুহতাজ (৮/২২৫)
- ইমাম রামলী (রহ.) – নিহায়াতুল মুহতাজ (৬/২৫০)
শেষ উপদেশ:
- ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। আপনার অন্তরের দৃঢ়তা এবং মুখের উচ্চারণই যথেষ্ট।
- নিয়মিত আ‘উযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম পড়ুন এবং ওয়াসওয়াসা এলে উদাসীন থাকুন।
- আপনার পিতার সেবা করুন, এতে কোনো দোষ নেই।
- আপনার বিয়ে নিয়ে শঙ্কা করবেন না; এটি সম্পূর্ণ সঠিক।
আল্লাহ তাআলা আপনার মানসিক প্রশান্তি দান করুন এবং আপনাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হিফাজত করুন।
ওয়াল্লাহু তা‘আলা আ‘লাম।