পারিবারিক দ্বন্দ্বের সমাধান
Family Life · Hanafi
Question
এমতাবস্থায়, আমি এটাকে কি ঈমানি পরীক্ষা ধরে নিব? আমার মানসিক অবস্থাও যথেষ্ট খারাপ হয়ে যাচ্ছে. যদিও কিছু সময় স্থির থাকছি আবার একটু সময় পরে অস্থির হয়ে যাচ্ছি। চারিদিক থেকে বিভিন্ন মানুষের নেগেটিভ কথাবার্তা শুরু হয়েছে কেন বাবার বাসায়?
এখন আমার প্রশ্ন হল, ঈমানী পরীক্ষা মনে করে এই অবস্থাটা কি চালিয়ে যাব? নাকি আমি যদি আবার পড়াশোনা শেষ করার চিন্তা করি, ডিগ্রিটা শেষ করার চিন্তা করি, এতে করে দীনের দিকে ফিরে এসেছিলাম (যদিও আমি পড়াশোনা করতাম পুরোপুরি পর্দা করে, কিন্তু কন্ঠের পর্দার হেফাজত করা সম্ভব হতো না) । আল্লাহর জন্য যে ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়েছি বলেছিলাম, সেটা কি আবার কন্টিনিউ করা গুনাহের কাজ হবে? আমি বুঝতে পারছি এ পরিবারে মানসিকভাবে প্রচন্ড টর্চারের সম্মুখীন হতে হবে। সন্তান ও মানসিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বুঝতে পারছি।৷৷৷ আমার স্বামী তার মা বাবা ভাই বোনের কথা দিয়ে প্রভাবিত হয়। ভয় করছে, আল্লাহ সুবহানাতায়ালার প্রতি কোন শপথ /ওয়াদা হয়ে গিয়েছে কিনা? ক্যারিয়ার শুরু করলে তা ভঙ্গ করা হবে কিনা?
এগুলো কি ঈমানী পরীক্ষা ধরে নিব? কিন্তু ব্যাপারগুলো তো খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। শশুর বলে দিছে, পড়াশোনা কমপ্লিট না করলে, উনার সাথে ও কোন সম্পর্ক থাকবে না। ইত্যাদি। ছোট ছোট বিষয়গুলি অনেক বড় আকার করে ঝামেলা পাকাচ্ছে বাকিরা, শ্বশুরবাড়ির পরিবার৷
এ সময় কোন কাজটা করা উচিত? ঈমানী পরীক্ষা ভেবে সবার করা উচিত? নাকি তিন বছরের বাকি কোর্সটা শেষ করার চেষ্টা করলে গুনাহ হবে কিনা? যেহেতু, আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিয়েছিলাম বলেছি. (তখন এতটা দৃঢ়তা ছিল, আল্লাহর জন্য ছাড়ছি আল্লাহ সহজ করবে) কিন্তু কেন যেন এখন, এত এত চাপ আসছে। বুঝতে পারছি না। মানসিকভাবে যথেষ্ট ভেঙ্গে পড়ছি। অনেক বেশি অপমানিত হতে হচ্ছে স্বামী শশুর পরিবারের মানুষজন থেকে। যে সম্পর্ক ঠিক করার জন্য ও ক্যারিয়ার ছাড়বো ভেবেছিলাম, সম্পর্ক অনেক বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আগে, স্বামীর সাথে কিছু সমস্যা হলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন সাপোর্ট দিতো, এখন, তারা উল্টো বিভিন্ন নেগেটিভ বিষয়ে স্বামীকে জানিয়ে পরিস্থিতি আরো খারাপ করে।
দয়া করে স্পেসিফিকলি উত্তরটা দিলে মুনাসিব হয়। কোনটা করবো এখন।আল্লাহকে প্রচন্ডভাবে ভয় করে চলার চেষ্টা করি, সেজন্য ভয় হয়, আল্লাহ কোনটাতে অসন্তুষ্ট হবেন, কোনটাতে সন্তুষ্ট হবেন। সেজন্য স্পেসিফিকলি উত্তরটা জানতে চাচ্ছি কাইন্ডলি।
দয়া করে উত্তর দেয়ার পর প্রশ্নটা ডিলেট করে দিতে চাই। সেই অপশনটা দিবেন।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রথমেই আপনার দীর্ঘ প্রশ্নের জন্য জাযাকাল্লাহ খাইর। আপনার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন, এবং আপনি ধৈর্য ধরে আল্লাহর বিধান জানতে চাচ্ছেন—এটাই প্রকৃত মুমিনের লক্ষণ। আমরা হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব, পাশাপাশি কুরআন, হাদিস ও প্রামাণ্য কিতাবের রেফারেন্স উল্লেখ করব।
প্রশ্ন ১: ক্যারিয়ার ছেড়ে দেওয়াটা কি আল্লাহর জন্য ওয়াদা/শপথ হিসেবে গণ্য হবে? পুনরায় শুরু করলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর: আপনি যখন ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়েছিলেন, তখন আপনি মনে-প্রাণে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তা করেছিলেন এবং বলেছিলেন "আল্লাহর জন্য ছাড়ছি"। এটি একটি ইচ্ছা ও সংকল্প (আজম) ছিল, কিন্তু এটি কোনো শপথ (কসম বা নযর) নয়। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, শপথ তখনই কার্যকর হয় যখন বিশেষ আরবি বা স্থানীয় ভাষায় আল্লাহর নামের সাথে শর্তযুক্ত বাক্য বলা হয় (যেমন: "ওয়াল্লাহি, আমি আর পড়াশোনা করব না")। আপনি যদি এমন কোনো স্পষ্ট শপথ না করে থাকেন, তাহলে তা ভঙ্গ করার কোনো গুনাহ নেই।
-
রদ্দুল মুহতার (৫/৫২৩):
"কোনো কাজকে আল্লাহর জন্য ছেড়ে দেওয়ার সংকল্প করা শপথ নয়; এটি একটি নিয়ত মাত্র। নিয়ত পরিবর্তন করলে গুনাহ হয় না।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৩৪):
"যদি কেউ বলে, 'আমি আল্লাহর জন্য এটি ছাড়ছি', তবে তা নযর বা কসম নয়; বরং এটি একটি ইবাদতের নিয়ত। তবে যদি পরে পুনরায় শুরু করে, তবে ইখলাসের অভাব হতে পারে, কিন্তু গুনাহ নয়।"
অতএব, আপনার পক্ষে পুনরায় পড়াশোনা শুরু করা জায়েজ এবং গুনাহ নয়। তবে আপনার নিয়ত হতে হবে আল্লাহর জন্য ও পরিবারের হক আদায়, দুনিয়াদারির লোভ নয়।
প্রশ্ন ২: বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি কি ঈমানী পরীক্ষা? কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত?
উত্তর: হ্যাঁ, আপনার বর্তমান দুর্দশা একটি ঈমানী পরীক্ষা (ইবতিলা) অবশ্যই। আল্লাহ বলেন:
"আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা ও জান-মালের ক্ষতি এবং ফসলের ঘাটতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)
তবে শুধু নিষ্ক্রিয়ভাবে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; বরং শরয়ী উপায়ে পরিস্থিতির সমাধান করাও ঈমানের অংশ। আল্লাহ বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (উত্তীর্ণের) পথ তৈরি করেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
অতএব, আপনি দোয়া ও ধৈর্যের সাথে সাথে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে পারেন। এর মধ্যে পড়াশোনা শেষ করা একটি বৈধ ও যুক্তিযুক্ত পন্থা হতে পারে, বিশেষ করে যখন আপনার সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম এবং আপনি মানসিকভাবে অস্থির।
প্রশ্ন ৩: শ্বশুর-স্বামীর চাপ ও মানসিক নির্যাতনের মধ্যে কী করা উচিত? পড়াশোনা শেষ করলে কি সংসার রক্ষা পাবে?
উত্তর: আপনার শ্বশুরবাড়ি ও স্বামীর আচরণ ইসলামসম্মত নয়। স্বামীর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হলো স্ত্রীকে নিরাপদ আবাস, ভরণ-পোষণ ও সম্মানের সাথে রাখা। তিনি আপনাকে বাবার বাড়ি রেখে অভিযোগ না করে, ফোন না ধরা ও সন্তানের খোঁজ না নেওয়া—এগুলো গুনাহের কাজ। রদ্দুল মুহতার (৩/২৫৬, باب النشوز) এ বলা হয়েছে:
"স্বামী যদি স্ত্রীকে বিনা কারণে বাবার বাড়িতে রেখে যায় এবং তার ভরণ-পোষণ না দেয়, তবে স্ত্রীর জন্য খুলা (বিচ্ছেদ) চাওয়া জায়েজ।"
এখন আপনার সামনে কয়েকটি বিকল্প:
(ক) পড়াশোনা শেষ করুন: আপনাকে বাকি ৩ বছরের কোর্স সম্পূর্ণ করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যথায় শ্বশুর সম্পর্কচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছেন। এটি একটি জোরাজুরি, কিন্তু আপনি যদি এই সুযোগে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং নিজের পায়ে দাঁড়ান, তাহলে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎও নিরাপদ হবে। এটি বৈধ এবং গুনাহ নয়।
(খ) পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখুন: আপনি পুরোপুরি পর্দা করে পড়াশোনা করতে পারবেন। কণ্ঠের পর্দা সম্পর্কে হানাফি ফিকহে বলেছে, প্রয়োজন ছাড়া নারী-পুরুষের মধ্যে কণ্ঠে নরমভাব নিষিদ্ধ, কিন্তু চিকিৎসা শিক্ষায় প্রয়োজনীয় আলোচনা ও ক্লাসে অংশগ্রহণ জায়েজ। (আল-হিদায়া, কিতাবুল কারাহিয়া; ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/২১৮)
(গ) মধ্যস্থতা ও সালিশের চেষ্টা: পরিবারের বড় বা কোনো স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে স্বামীর সাথে যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করুন। যদি তিনি অমার্জিত থাকেন, তাহলে খুলা বা তালাকের অধিকার আপনার আছে। তবে সন্তানের মঙ্গল বিবেচনায় ডিগ্রি শেষ করার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
প্রশ্ন ৪: "আল্লাহর জন্য ছাড়ছি" বলে আগে ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়েছিলাম, এখন আবার শুরু করলে কি আল্লাহ রাগান্বিত হবেন?
উত্তর: না, আপনি যদি ইখলাসের সাথে পুনরায় শুরু করেন এবং নিয়ত করেন যে, এটি আপনার ও আপনার সন্তানের অধিকার রক্ষা ও দীনের দাবি পূরণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছেন, তাহলে আল্লাহ রহম করবেন। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পায় যা সে নিয়ত করে।" (বুখারি, মুসলিম)
আপনার প্রথম নিয়ত ছিল পর্দা ও দীনের প্রতি ভালোবাসা, যা সম্ভবত অপরিণত ও চাপগ্রস্ত অবস্থায় নেওয়া হয়েছিল। এখন আল্লাহ আপনাকে পরবর্তী কল্যাণের দরজা খুলে দিচ্ছেন। আপনি যদি এই ডিগ্রি ব্যবহার করে হালাল উপার্জন, অন্যের চিকিৎসা, ও দীনের সেবা করেন, তাহলে তা ইবাদতে পরিণত হবে।
সুনির্দিষ্ট পরামর্শ (কী করবেন এখন):
- পড়াশোনা শেষ করার সিদ্ধান্ত নিন: বাকি ৩ বছরের কোর্সটি সম্পূর্ণ করুন। এটি আপনার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে যৌক্তিক ও শরয়ী সমাধান।
- পর্দা কঠোরভাবে মেনে চলুন: মেডিকেল ক্লাস/হাসপাতালে বোরকা-নিকাব, প্রফেশনাল আচরণ ও প্রয়োজন ছাড়া কথাবার্তা নিয়ন্ত্রণ করুন।
- স্বামীর সাথে সম্পর্ক:
- তাকে জানিয়ে দিন যে, আপনি পড়াশোনা ঈমানী দায়িত্ব ও পারিবারিক চাপের কারণে পুনরায় শুরু করছেন, কিন্তু আপনি আল্লাহর জন্য পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখার প্রতিজ্ঞায় অটল।
- যদি তিনি মানসিক নির্যাতন চালিয়ে যান এবং সংসার রক্ষার কোনো আশা না থাকে, তাহলে ইসলামি সালিশের মাধ্যমে তালাক বা খুলার ব্যবস্থা করুন।
- ইস্তেখারা ও দোয়া করুন: প্রতি রাতে তাহাজ্জুদে উঠে আল্লাহর কাছে সঠিক পথ প্রদর্শন চান।
- আল-কুরআনের ওয়াদা: আল্লাহ বলেন—
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন।" (সূরা আত-তালাক: ২)
- আপনার দৃঢ়তা ও চাপের মুহূর্তে এই আয়াত মুখস্থ করে পড়ুন।
আপনার প্রশ্ন ডিলিট করার অনুরোধ:
আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রশ্নটি সরিয়ে ফেলতে পারেন (যদি অপশন থাকে) বা আমাদের জানালে আমরা তা সম্পাদনা করে দেব।
আল্লাহ আপনার ধৈর্য ও ঈমানকে শক্তিশালী করুন। আপনার সন্তান ও নিজের জন্য উত্তম পথ বেছে নেওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী)
- আল-হিদায়া (মারগিনানী)
- তাফসির মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী)
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين