পরিবারিক জটিলতা, মায়ের অসুস্থতা ও বিয়ে না হওয়ার কারণে ডিপ্রেশন.

Family Life · Hanafi

Question No: 1693
Questioner: Khadiza Rini
Question Asked: 16 Jun 2026, 06:50 PM
Reviewed & Published: 16 Jun 2026, 07:16 PM
Views: 51
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মা সিহরে আক্রান্ত, বাবা ২য় বিয়ে করেন। বাবা-মায়ের আনঅফিশিয়াল সেপারেশন চলে। বাচ্চারা স্টেপ মাদারের ছায়ায় বেড়ে উঠে। ১১ বছর পর ছেলেরা বড় হলে,জব করলে মাকে নিয়ে আসে।আলোচনা করে ফয়সালা হয়, বাবা তার ২য় ফেমিলি নিয়ে আলাদা হয়, মা-বোনদের দায়িত্ব দিয়ে তাদের আলাদা করে দেয় কিন্তু থাকার জায়গা দেয়,যেহেতু আর্থিক অবস্থা খারাপ। এখন বাবার বাড়িতেই সবাই আলাদা আলাদা বিল্ডিংয়ে থাকে। ১ম পক্ষের ছেলেরা পুরো পরিবারের দায়িত্বে থাকেন।
উল্লেখ্য ১ম পক্ষের ৩ ছেলে,৩ মেয়ে। ২য় পক্ষে ২ মেয়ে, ১ ছেলে।
১ম পক্ষের: মা এখনও অসুস্থ, মাসের ১৫ -২০ দিনই যায় পাগলামি করে। বড় দুই ছেলে বিয়ে করে, মা পাগলামি করলে বউদের সাথে প্রায়ই ঝামেলা হয়,ভাইয়েরাও সহ্য করতে পারেনা। বড় মেয়েকে খোঁজ না নিয়ে বিয়ে দেয়, এখন ডিভোর্স হয়ে ৫ বছর যাবত বাড়িতে। ২য় মেয়েকেও না খোঁজ নিয়ে বিয়ে দেয়,এখন মানসিক অশান্তিতে দিন কাটে। ৩য় ভাই কিছুই করে না। ৩য় মেয়ে পাবলিকে পড়ে,বয়স ২৭, এখন পর্যন্ত বিয়ের কোনো কথা হয় না।বাবা-ভাই যে যার ফেমিলি নিয়ে ব্যস্ত। ভাবে সে পড়াশোনা করে,চাকরি করে নিজেই দেখে বিয়ে করবে।
এখন ফেমিলির এসব ইতিহাস,জব না হওয়া, বিয়ের কোনো কথাবার্তা না হওয়া সব মিলিয়ে উল্টাপাল্টা চিন্তা ভাবনা করে, ভাবে বয়স তো হলোই, বিয়ে এমনিতেও হচ্ছে না,আর হলেও ভালো কিছু হয় না(বড় বোনদের দেখে), বিয়েই করবো না,কষ্ট করে একটা চাকরি পেলে,মা আর বড় বোনদের দায়িত্ব নিবে।
মানে তাদের জীবনটাই কেমন জানি, সুস্থ বাবা-মা পায়নি,ভাইয়েরাও একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর কেমন হয়ে যায়...দিনশেষে ব্যাকগ্রাউন্ড যেমনই হোক মেয়েরাই সাফার করে।
সব মিলিয়ে মেয়েটা খুব ডিপ্রেসড।

অনেক অগোছালো হয়ে গেসে লিখাগুলো, তাও অনুরোধ থাকবে
শায়খদের কাছে তার জন্য উত্তম পরামর্শ দেয়ার। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

Answer

উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ বর্ণনা পড়ে আপনার পরিবারের জটিলতা ও আপনার মানসিক কষ্ট বোঝা গেল। আপনি একা নন, অনেক মেয়েই অনুরূপ পারিবারিক টানাপোড়েনের শিকার হন। আসুন আমরা ইসলামের আলোকে বিষয়টি বুঝি এবং কিছু কার্যকর পরামর্শ গ্রহণ করি।


১. আপনার অবস্থার প্রতি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

আপনার জীবনে যে সমস্ত বিপত্তি ও কষ্ট এসেছে—মায়ের অসুস্থতা, বাবার দ্বিতীয় বিয়ে ও দায়িত্বহীনতা, বড় বোনদের বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হওয়া, নিজের বিয়েতে অনিশ্চয়তা—এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আর আমরা অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা বাকারা: ১৫৫)

ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা করাই এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় ইবাদত। হাদিসে এসেছে:
“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় বান্দা সে, যে বিপদে ধৈর্যশীল হয়।” (সহিহ ইবনে হিব্বান)

আপনার মায়ের উপর ‘সিহর’ (যাদু) হওয়া—এটাও একটি বাস্তবতা। তবে সিহর করাও আল্লাহর অনুমতিক্রমে ঘটে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপরও সিহর করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলাই সর্বশক্তিমান। আপনি আপনার মায়ের জন্য নিয়মিত সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ফুঁ দিতে পারেন এবং কোনো আলেমের মাধ্যমে রুকইয়াহ করাতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু যাদুকারী বা কবিরাজের কাছে গেলে চলবে না, বরং একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।


২. আপনার ভরণপোষণ ও দায়িত্ব সম্পর্কিত ফিকহি বিধান

  • পিতার দায়িত্ব: ইসলামী আইন অনুযায়ী, পিতা তার অবিবাহিত কন্যা ও অসুস্থ স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪৭) আপনি যদি বাবার বাড়িতে থাকেন তবে আপনার খরচ (খাওয়া, পোশাক, চিকিৎসা) আপনার পিতার ওপর ফরজ। আপনার বাবা যদি আর্থিকভাবে অক্ষম হন, তাহলে আপনার ভাইদের (প্রথম পক্ষের) উপর এই দায়িত্ব আসে। আপনি নিজে চাকরি করেন—এটা আপনার ইচ্ছামত বাড়তি কাজ, তবে এটা আপনার ওপর ফরজ নয়। আপনি চাইলে নিজের প্রয়োজনে বা ভবিষ্যতের জন্য চাকরি করতে পারেন, কিন্তু মা ও বড় বোনদের দায়িত্ব আপনার একার কাঁধে নেওয়া জরুরি নয়। বরং আপনার ভাইদেরও তাদের দায়িত্ব পালন করা উচিত।

  • মা ও বোনদের ব্যাপারে: আপনার মা অসুস্থ, তার সেবা করা সন্তানদের নৈতিক দায়িত্ব। তবে শারীরিক ও মানসিকভাবে আপনার যদি একা কষ্ট হয়, তবে অন্য ভাই-বোনদের সাহায্য চান। আপনি যদি নিজে কষ্ট করে চাকরি করে তাদের দায়িত্ব নেন, তবে সেটি আপনার জন্য একটি সাওয়াবের কাজ হবে, কিন্তু এতে নিজের বিবাহ ও জীবনের প্রতি অবহেলা করা ঠিক হবে না। মনে রাখবেন, ইসলামে সবার অধিকার রক্ষা করা জরুরি, কিন্তু কেউ যেন নিজের জীবনকে সম্পূর্ণ বিসর্জন না দেয়।

  • বিয়ের ফিকহি অবস্থান: একবিংশ শতাব্দীর একজন সুস্থ মেয়ের বিয়ে করা সুন্নত ও জরুরি। আপনার বয়স ২৭ বছর। বিলম্ব হয়ে গেলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ইসলামে বিবাহের জন্য বয়সের কোনো কঠিন শর্ত নেই, বরং সামর্থ্য ও উপযুক্ত পাত্র পাওয়াই মুখ্য। আপনার বড় বোনদের বিবাহ ব্যর্থ হওয়া দেখে আপনি ভয় পাচ্ছেন—এটা স্বাভাবিক, তবে প্রতিটি মানুষের ভাগ্য ও পরীক্ষা আলাদা। তাদের জীবনের ঘটনা দেখে আপনি হতাশ হয়ে বিয়ে একেবারে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং আপনি সতর্কতার সাথে, শারীরিক ও মানসিক সামঞ্জস্য, দ্বীনদারি ও চরিত্র দেখে বিয়ে করার চেষ্টা করুন।


৩. আপনি এখন কী করতে পারেন—ব্যবহারিক পরামর্শ

ক. মানসিক প্রশান্তি অর্জন

  • নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ ও দোয়া করুন। দোয়া কখনো ফেরত দেওয়া হয় না।
  • কুরআন তিলাওয়াত করুন। বিশেষ করে সূরা বাকারা, সূরা ইউসুফ (যা একান্ত নিরাশাকে বিশ্বাসে পরিণত করার শিক্ষা দেয়), এবং সূরা দুহা (যেখানে বলা হয়েছে ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে’)।
  • মনে রাখবেন, আপনার জীবনের সব ঘটনা আল্লাহর জ্ঞানের অধীনে। তিনি আপনার জন্য যা কিছু রেখেছেন তা কল্যাণকর।

খ. বিবাহের পথে অগ্রসর হোন

  • আপনার পিতা ও ভাইদের সাথে বসে বিয়ের বিষয়ে কথা বলুন। তারা ব্যস্ত থাকলেও আপনার হক তাদের জানিয়ে দিন। আপনি নিজেও একজন যোগ্য পাত্র খোঁজার চেষ্টা করুন—মসজিদের ইমাম, আত্মীয়স্বজন, বা বিশ্বস্ত বিবাহ সাইটের (শরিয়াহ সম্মত) মাধ্যমে।
  • বিয়ের আগে অবশ্যই ইস্তিখারা পড়ুন। নাবী (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের ইচ্ছা করে, তখন সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে এবং তারপর এই দোয়া পড়ে: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্তাখিরুকা বিইলমিকা...’” (সহিহ বুখারি)

গ. হতাশা ও ডিপ্রেশন মোকাবিলা

  • হতাশা (ডিপ্রেশন) একটি মানসিক রোগ। এটাকে ‘খারাপ চিন্তা’ বলে অবহেলা না করে একজন ইসলামি মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন। ইসলামে চিকিৎসা গ্রহণ করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
  • আপনি চাকরি করে আয় করছেন—এটা খুব ভালো। এ টাকা দিয়ে আপনি নিজের কিছু খরচ চালাতে পারেন এবং ভবিষ্যতের জন্যও সঞ্চয় করতে পারেন। তবে নিজেকে পুরোপুরি ‘পরিবারের কর্তা’ ভেবে ক্লান্ত হবেন না। দায়িত্ব ভাগ করুন।

ঘ. পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে সম্পর্ক

  • আপনার ভাইদের সাথে কথা বলুন। তাদের বোঝান যে মায়ের অসুস্থতা এবং বোনদের দায়িত্ব শুধু আপনার নয়, তাদেরও। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষরা পরিবারের দায়িত্বশীল। (সূরা নিসা: ৩৪)
  • বড় বোনদের প্রতি সহানুভূতি দেখান, কিন্তু তাদের ব্যর্থতা আপনার নিজের জীবনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে দেবেন না। তাদের জন্য দোয়া করুন এবং তাদেরও চিকিৎসা বা পুনর্বিবাহের জন্য উৎসাহ দিন।

৪. আপনার জন্য কিছু দোয়া ও আমল

  • সকাল-সন্ধ্যার দোয়া পড়ুন: “বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়া দুররু মা‘আসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা’ই, ওয়া হুওয়াস সামি‘উল ‘আলীম।” (আবু দাউদ)
  • প্রতিদিন সূরা ইয়াসিন পড়ার অভ্যাস করুন। এটি কষ্ট দূর করে ও মনের প্রশান্তি আনে।
  • দোয়া ইউনুস (لا إله إلا أنت سبحانك إني كنت من الظالمين) যেকোনো বিপদে ২১ বার পড়ুন।

উপসংহার

আপনার পরিবার একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আপনি একা নন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, নিজের জীবনের লক্ষ্য ঠিক রাখুন, এবং দ্বীনের আলোকে পথ চলুন। বিয়ে করা আপনার সুন্নত ও অধিকার—তা ছেড়ে দেবেন না। আপনার বাবা-ভাইদের দায়িত্ব তাদের বুঝিয়ে বলুন। মা ও বোনদের জন্য দোয়া করুন এবং যথাসাধ্য সাহায্য করুন, কিন্তু নিজের জীবনকে বিসর্জন দেবেন না।

আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্য ও ইবাদতের বিনিময়ে আপনার জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দিন, আপনার মানসিক শান্তি দান করুন এবং একটি উত্তম পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে আপনি যেন সুখী হন——এই দোয়া করছি।

আল্লাহু আলাম*
(آمين)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.