এক তালাক দেওয়ার পর স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা কি জায়েজ?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার প্রশ্নটি হলো: স্ত্রীকে এক তালাক দেওয়ার পর সহবাস করা যায় কি? হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এর উত্তর নিম্নরূপ।
সংক্ষিপ্ত জবাব
এটি যদি স্পষ্ট বাক্যে তালাক দেয়া হয়,সেক্ষেত্রে বিধানঃ
হ্যাঁ, প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক (যাকে ‘তালাকে রজয়ী’ বলা হয়) দেওয়ার পর স্ত্রী যদি ইদ্দতের মধ্যে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করা যায়। তবে এই সহবাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক প্রত্যাহার (رجوع) গণ্য হবে, অর্থাৎ এর মাধ্যমে স্ত্রী পুনরায় বৈধ স্ত্রী হয়ে যান এবং তালাক বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু অস্পষ্ট বাক্যে তালাক দিলে তালাকে বায়িন হয়, এর ক্ষেত্রে সহবাস করা জায়েজ নয় এক্ষেত্রে পুনরায় বিবাহ পড়িয়ে নিতে হবে।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. তালাকের প্রকারভেদ
হানাফি ফিকহে তালাক প্রধানত দুই প্রকার:
- তালাকে রজয়ী (رجعی): এটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক, যা ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ রাখে।
- তালাকে বায়িন (بائن): এটি তৃতীয় তালাক বা অন্যান্য বায়িন তালাক (যেমন খুলা, তালাকে মুগাল্লাযা, অমুক শর্তে তালাক ইত্যাদি), যা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
২. তালাকে রজয়ী (প্রথম তালাক)
আপনি যদি স্ত্রীকে একটি তালাক দেন এবং তা যদি তালাকে রজয়ী হয় (যা সাধারণত ‘এক তালাক’ বলেই বুঝায়), তাহলে স্ত্রী ইদ্দতের (তিন হায়েজ বা তিন মাস) মধ্যে থাকবেন। এই সময় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয় না; বরং স্বামীর ‘রজয়ত’ (رجوع) করার অধিকার থাকে।
রজয়তের পদ্ধতি: মৌখিকভাবে বলা, লিখিতভাবে বা এমন কোনো কাজ করা যা দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুনরুদ্ধার বোঝায়—যেমন সহবাস করা। হানাফি মাজহাবে সহবাসকে রজয়তের একটি স্পষ্ট মাধ্যম গণ্য করা হয়।
৩. সহবাসের হুকুম ও পরিণতি
- সহবাস করা জায়েজ: ইদ্দতের মধ্যে স্বামী যদি স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে, তাহলে তা বৈধ (হালাল) এবং এর দ্বারা তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরিয়ে নেওয়া (রজয়ত) হয়ে যায়। ফলে স্ত্রী পুনরায় স্বামীর বৈধ স্ত্রী হন এবং তালাকের কোনো প্রভাব থাকে না।
- শর্ত: সহবাসটি অবশ্যই স্বেচ্ছায় ও ইদ্দতের ভিতরে হতে হবে। যদি সহবাস না করে শুধু কথা বলে বা ইশারায় রজয়ত করা হয়, তাও জায়েজ।
৪. তালাকে বায়িনের ক্ষেত্রে
যদি এটি তৃতীয় তালাক হয়, অথবা প্রথম তালাক হলেও কোনো শর্তে বায়িন হয়ে যায় (যেমন স্ত্রীর বিনিময়ে তালাক), তাহলে ইদ্দতের মধ্যে সহবাস করা হারাম এবং তা বিবাহ পুনরুদ্ধার করে না। বরং ইদ্দত শেষে স্ত্রী পৃথক হয়ে যান এবং পুনরায় বিয়ে করতে হলে নতুন করে বিবাহ ও মোহরানা প্রয়োজন।
দলিল ও হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
কুরআন ও হাদিসের আলোকে: সূরা বাকারা (২:২২৮)-এ আল্লাহ বলেন:
وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَٰلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا “আর তাদের স্বামীরা এই ইদ্দতের মধ্যে তাদের (স্ত্রীদের) ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকতর হকদার, যদি তারা সদ্ভাব রাখতে চায়।”
এই আয়াতে ‘রজয়ত’ (ফিরিয়ে নেওয়া) সাধারণ অর্থে এসেছে, যার মধ্যে সহবাসও অন্তর্ভুক্ত।
হানাফি ফিকহের গ্রন্থসমূহ:
১. আল-হিদায়া (মারগীনানী রহ.)-এ বলা হয়েছে:
“إذا راجعها بوطئها في العدة سقط الطلاق”
“যদি স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে সহবাসের মাধ্যমে ফিরিয়ে নেয়, তবে তালাক বাতিল হয়ে যায়।”
২. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে:
“الرجعي يملك رجعتها بالقول والفعل، والوطء فعل يثبت به الرجعة” “রজয়ী তালাকে স্বামী কথা বা কাজের মাধ্যমে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার মালিক; সহবাস এমন একটি কাজ যার দ্বারা রজয়ত সাব্যস্ত হয়।”
৩. ফাতাওয়া আলমগীরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া)-তে বলা হয়েছে:
“إذا وطئها وهو معتد بها في الرجعي... رجعت إليه” “যদি স্বামী রজয়ী তালাকের ইদ্দতপালনকারিণী স্ত্রীকে সহবাস করে, তাহলে স্ত্রী তার কাছে ফিরে আসে (রজয়ত হয়ে যায়)।”
৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ.)-এ বলা হয়েছে:
“প্রথম ও দ্বিতীয় তালাকের ইদ্দতের মধ্যে যদি স্বামী সহবাস করে, তাহলে তালাক বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ বহাল থাকে।”
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- তালাক দেওয়ার পর সহবাসের মাধ্যমে রজয়ত করতে চাইলে নিয়ত ঠিক রাখা জরুরি। উদ্দেশ্য যদি শুধু কামনা চরিতার্থ করা হয়, তবুও রজয়ত হয়ে যায়।
- তবে যদি তালাক দেওয়ার সময় ‘বায়িন’ হওয়ার নিয়ত থাকে (যেমন: ‘আমি তালাক দিলাম, কিন্তু ফিরিয়ে নেব না’) তবুও প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক সাধারণত রজয়ীই হয়, যতক্ষণ না স্পষ্টভাবে বায়িনের শর্ত থাকে।
- সহবাসের পর আবার তালাক দিতে চাইলে নতুন করে তালাক দিতে হবে; আগের তালাকের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না।
উপসংহার
এটি যদি স্পষ্ট বাক্যে তালাক দেয়া হয়,সেক্ষেত্রে বিধানঃ
হ্যাঁ, প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক (যাকে ‘তালাকে রজয়ী’ বলা হয়) দেওয়ার পর স্ত্রী যদি ইদ্দতের মধ্যে থাকে, তাহলে তার সঙ্গে সহবাস করা যায়। তবে এই সহবাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক প্রত্যাহার (رجوع) গণ্য হবে, অর্থাৎ এর মাধ্যমে স্ত্রী পুনরায় বৈধ স্ত্রী হয়ে যান এবং তালাক বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু অস্পষ্ট বাক্যে তালাক দিলে তালাকে বায়িন হয়, এর ক্ষেত্রে সহবাস করা জায়েজ নয় এক্ষেত্রে পুনরায় বিবাহ পড়িয়ে নিতে হবে।