স্বপ্নে টিকটিকি উপরে আসলে কি হয়?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 1663
Questioner: Arifa Alvy
Question Asked: 16 Jun 2026, 02:29 AM
Reviewed & Published: 16 Jun 2026, 03:36 AM
Views: 76
Tokens: 5,660
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ।

বিকেলে বাচ্চাকে বলেছি নিচে নামলে টিকটিকি ধরবে। তারপর ঘুমিয়েছি। ঘুমানোর পরে দেখি ফ্লোরে টিকটিকি, আমি টিকটিকি সরানোর জন্য একটা কাগজ ছুড়ে ফেলি। কিন্তু টিকটিকি লাফ দিয়ে আমার বাম হাতের উপড়ে পরে।

নরমালি আমি কোনো পোকা গায়ে পড়লে এমনিতেই চিল্লাচিল্লি করি ভয়ে , সত্যিকার অর্থে এসব ভয় না পেলেও গায়ে পড়লে আমার ভয় লাগে আর আমি ভয়ে চিৎকার দেই।

স্বপ্নে ও যখন টিকটিকি আমার হাতে পড়ে তখন চিৎকার দেই , তো টিকটিকি ছুটানোর ট্রাই করি কিন্তু পারছিলাম না। তখন ভয়ে স্বপ্নের চিৎকারে সত্যি সত্যি ঘুম ভেঙ্গে যায় আর উঠে দেখি আমার বাম হাতটা ঝিম ধরে আছে।

এমন কেনো দেখলাম শুধু বাচ্চাকে ভয় দেখালাম তাই? আল্লাহ মাফ করুক।

Answer

উত্তর

وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

প্রশ্নকারী সম্মানিতা বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি স্বপ্নে টিকটিকি দেখে ভয় পাওয়া এবং এর কারণ জানতে চেয়েছেন।

সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার দেখা স্বপ্নটি সম্ভবত শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানোর স্বপ্ন বা মনের কল্পনা (খেয়াল) মাত্র। দিনের বেলা আপনি বাচ্চাকে টিকটিকি ধরার ভয় দেখিয়েছিলেন এবং আপনার ভেতরে স্বাভাবিকভাবে টিকটিকির প্রতি ভয় আছে; সেই কারণেই আপনার মস্তিষ্ক স্বপ্নে সেই ভয়ের প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছে। এটি কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বা বিশেষ কোনো অর্থ বহন করে না। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের স্বপ্ন দেখলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।


বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও ফিকহী দিকনির্দেশনা:

১. ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

"আর-রুইয়াস সলিহাহ মিনাল্লাহ; ওয়াল হুলমু মিনাশ শায়ত্বন।" অর্থাৎ: ‘‘সুন্দর ও ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে আর বিভীতি মূলক স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে’’ (সহীহ বুখারী: ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম: ২২৬১)।

আপনার স্বপ্নটি যেহেতু ভয়ের এবং আতঙ্কের, তাই এটি শয়তানী প্রভাব অথবা মনের খেয়াল বলে গণ্য হবে। বিশেষ করে যেহেতু আপনি দিনের বেলা সচেতনভাবেই টিকটিকির বিষয়ে ভয় পেয়েছিলেন এবং বাচ্চাকেও ভয় দেখিয়েছিলেন, তাই ঘুমের মধ্যে মনের অবচেতন স্তর থেকে এই স্বপ্নের সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

২. টিকটিকির স্বপ্নের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি: বিখ্যাত হানাফি ফকীহ ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’ -এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্ন সাধারণত তিন প্রকার:

  1. আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ।
  2. শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন।
  3. মনের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন।

টিকটিকি বা পোকামাকড় স্বপ্নে দেখার বিষয়টি সাধারণত অপছন্দনীয় ও ভয়ের হিসেবে বিবেচিত, তবে এর কোনো নির্দিষ্ট শার‘ঈ ব্যাখ্যা কুরআন-হাদীসে নেই। আপনার স্বপ্নের বিবরণে দিনের বাচ্চাকে ভয় দেখানো, টিকটিকির প্রতি আপনার স্বাভাবিক ভীতি—এগুলো স্পষ্টত মনের কল্পনারই বহিঃপ্রকাশ।

৩. শারীরিক অবস্থা (হাত ঝিম ধরা) : ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর আপনার বাম হাত ঝিম ধরা থাকার ঘটনাটি শারীরিক কারণেও হতে পারে। যেমন:

  • ঘুমের সময় হাতের ওপর চাপ পড়া।
  • কোনো নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে ঘুমানো। স্বপ্নের ভয় এবং জেগে ওঠার পর শারীরিক অসাড়তা থাকাটা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত নাও হতে পারে। তবে মানসিক ভীতি এবং আতঙ্কের কারণে শরীরেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এটি কোনো ‘ইসলামী লক্ষণ’ নয়।

৪. শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচার উপায়: যদি আপনি স্বপ্নে ভয় পান বা শয়তানী স্বপ্ন দেখেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিম্নোক্ত নির্দেশনা দিয়েছেন:

"যখন তোমাদের কেউ এমন কিছু স্বপ্ন দেখে যা সে অপছন্দ করে, তখন সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়। তাহলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।" (সহীহ মুসলিম: ২২৬২)

অতএব, আপনি যদি আবার এমন স্বপ্ন দেখেন, তাহলে:

  • সাথে সাথে বাম দিকে তিনবার হালকা থুথু ফেলুন (মুখে থুতু না এনে, শুধু 'ফু ফু' করা)।
  • 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বনির রজীম' পড়ুন।
  • এই স্বপ্নের ব্যাপারে কাউকে বলবেন না (অপছন্দনীয় স্বপ্ন বলার নিষেধাজ্ঞা হাদীসে এসেছে)।
  • পাশ ফিরে শুয়ে পড়ুন।

৫. বাচ্চাকে ভয় দেখানোর পরিণতি: আপনি লিখেছেন, "শুধু বাচ্চাকে ভয় দেখালাম তাই কি?" ইসলামী শিক্ষায় বাচ্চাদের অহেতুক ভয় দেখানো নিষিদ্ধ। এটি তাদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং ভীতু করে তোলে। আপনি নিজে টিকটিকি দেখে ভয় পান, যা স্বাভাবিক। কিন্তু বাচ্চাকে ভয় দেখানো উচিত হয়নি। আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন। বাচ্চাদের আদর-স্নেহের মাধ্যমে বুঝানোই উত্তম।

৬. গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী সতর্কতা:

  • স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো আকীদা বা আমল নির্ধারণ করা জায়েয নয়।
  • স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুধুমাত্র নেককার ও আলিম ব্যক্তিদের কাছ থেকে নেওয়া উচিত, যারা কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে ব্যাখ্যা দিতে পারেন। তবে আপনার স্বপ্নটি যেহেতু স্পষ্টত দিনের ঘটনা ও মনের কল্পনার প্রতিফলন, তাই এটি নেক স্বপ্ন নয় বরং ‘আদগাছ’ বা মনের খেয়াল।
  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো হালাল-হারাম নির্ধারণ করা বা ইবাদতের নিয়ম পরিবর্তন করা শিরকী পর্যায়েরও হতে পারে (আল-মুহীতুল বুরহানী, ফাতাওয়া হিন্দিয়া)।

সারকথা: আপনার স্বপ্নটি ভয় ও কল্পনার প্রতিচ্ছবি ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে আপনার ঈমান-আকীদার কোনো ক্ষতি নেই। বাচ্চাকে ভয় দেখানোর জন্য অনুতপ্ত হোন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে সাবধান থাকুন। ভবিষ্যতে এ ধরনের স্বপ্ন দেখলে হাদীসে বর্ণিত দোয়া ও আমলগুলো করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হিফাযত করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.