স্বপ্নে স্বামী মারা যাওয়া দেখলে এর ব্যাখ্যা কি?
Family Life · Hanafi
Question
আমি আজ ফজরের নামাজের টাইমে ৫ টার দিকে হবে আমি উঠেছি যখন তখন দেখি ৫:১৫ বাজে, তাড়াতাড়ি নামাজ পড়েছি।অনেক কষ্ট হচ্ছিলো স্বপ্নটা দেখে বুকের ভেতরে। স্বপ্নে দেখি যে আমার হাজবেন্আড মারা গেছে, আমি বাবার বাড়ি থাকি এবং তারা আমার জন্য পাত্র এনেছে আমি একজন পাত্রের সামনে বসা, পাত্রের অনেক বয়স,আমি বিয়ে করতে চাচ্ছিনা, কিন্তু পরিবারের জন্য সামনে বসছি,তখন আমি অনেক কান্না করতেছি আর ভাবতেছি আমার বাবা বেঁচে থাকলে কেউ আমার সাথে জোড় করতে পারতোনা, আমার হাজবেন্ড কেন মারা গেল এত তাড়াতাড়ি এসব ভেবে কাঁদছি।
উল্লেখ্য আমার লাভ ম্যারেজ আমি আমার হাজবেন্ড কে অনেক ভালোবাসি আর আমার পরিবারও এমনটা চায়না, তাহলে আমি বিয়ের আর হাজবেন্ডের মৃত্যুর স্বপ্ন কেন দেখলাম, এর ব্যাখ্যা কি?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী স্বপ্ন তিন প্রকার:
১. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সুসংবাদ – যা ভালো স্বপ্ন।
২. শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি বা খারাপ স্বপ্ন – যা মানুষকে উদ্বিগ্ন করে।
৩. মনের কল্পনা ও দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন – যা দিনের ব্যস্ততার কারণে আসে।
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৭০১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬২)
আপনি যে স্বপ্ন দেখেছেন—তাতে আপনার হাজবেন্ডের মৃত্যু ও নিজের জোরপূর্বক বিয়ের দৃশ্য এসেছে—এটি স্পষ্টতই একটি খারাপ স্বপ্ন। এটি শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে, যা আপনার অন্তরে দুঃখ ও ভীতি সৃষ্টি করার জন্যই এসেছে। আপনার বাস্তব জীবনে স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও পরিবারের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও স্বপ্নে বিপরীত দেখা শয়তানের কুমন্ত্রণার অংশ হতে পারে।
খারাপ স্বপ্ন দেখলে করণীয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যদি কেউ এমন কিছু দেখে যা তার অপছন্দনীয়, তবে সে যেন তার বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করে, এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় তিনবার, এবং সে যে পাশে শুয়েছিল তা পরিবর্তন করে নেয়। আর সে যেন এ স্বপ্ন কাউকে না বলে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬২)
অতএব, আপনি যখনই এমন খারাপ স্বপ্ন দেখবেন, নিম্নোক্ত কাজগুলো করুন:
- বাম দিকে তিনবার থুথু নিক্ষেপ করুন (শুধু মুখের লালা, থুথু নয়)।
- আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম (আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চান) তিনবার বলুন।
- শোয়ার পাশ পরিবর্তন করুন (ডান থেকে বাম বা বাম থেকে ডান)।
- এই স্বপ্ন কাউকে বলবেন না।
- এ স্বপ্নের কোনো অর্থ বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবেন না; বরং এটাকে শয়তানের প্ররোচনা মনে করে উপেক্ষা করুন।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও সতর্কতা
স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তাবীর) একটি বিশেষ জ্ঞান, যা শুধুমাত্র ইমামদের মত পণ্ডিত ব্যক্তিরা দিতে পারেন। সাধারণ মানুষের জন্য খারাপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা খোঁজা বা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়। কেননা, হাদীসে এসেছে:
“স্বপ্নের ব্যাখ্যা এমন বিষয় যা প্রকাশ করা ঠিক নয়, যতক্ষণ না তা কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তির নিকট বলা হয়।”
(আবু দাউদ, হাদীস: ৫০২০)
হানাফী ফিকহের বিশিষ্ট গ্রন্থ “রদ্দুল মুহতার” -এ এসেছে যে, খারাপ স্বপ্নের দিকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং এর অনিষ্ট থেকে বাঁচতে সূরা ফালাক ও নাস পড়া এবং আউযু বিল্লাহ বলা উচিত। (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৩)
তবে সাধারণ অর্থে, অনেক ইসলামী স্কলার বলেন:
- স্বপ্নে কোনো জীবিত ব্যক্তির মৃত্যু দেখা তার দীর্ঘায়ু বা সুস্থতার ইঙ্গিত হতে পারে (ইবনে সিরিনের তাবীর)।
- নিজের বিয়ের স্বপ্ন প্রায়শই মনের চিন্তার প্রতিফলন। আপনার মনে হয় পরিবারের ইচ্ছা ও আপনার ভালোবাসার মধ্যে সংঘাত রয়েছে, তাই এই স্বপ্ন এসেছে।
তবে আপনার ক্ষেত্রে তাবীর না করাই উত্তম। বরং নিচের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ
- দুশ্চিন্তা করবেন না – এ স্বপ্ন বাস্তবের কোনো লক্ষণ নয়। শয়তান আপনাকে উদ্বিগ্ন করতে চায়।
- সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করুন – উপরে বর্ণিত করণীয়গুলো পালন করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
- বেশি বেশি ইবাদত করুন – ফজরের নামাজের ব্যাপারে সতর্ক হোন। সময়মতো ফজর আদায়ের জন্য চেষ্টা করুন। হাদীসে ফজরের সময় ঘুমানো অপছন্দনীয়।
- দুআ করুন – আপনার স্বামীর ভালোবাসা ও সুস্থতার জন্য, এবং পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক মধুর রাখতে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করুন।
- মনকে শান্ত রাখুন – “লা তাহজান” (দুশ্চিন্তা কোরো না) – আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখুন।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে দিকনির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“স্বপ্ন তিন প্রকার: সুসংবাদ যা আল্লাহর পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে দুঃখ দান, এবং মানুষের নিজের মনের চিন্তা।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৭০১৮)
শেষ কথা
আপনার স্বপ্ন বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর ব্যাখ্যা খুঁজে না পেয়ে বরং আল্লাহর ওপর নির্ভর করে ভালো কাজে মনোযোগ দিন। আপনার স্বামীকে নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও সদ্ভাব রাখুন। শয়তানের এই কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)