আয়াতুল কুরসি লেখা দেয়ালের দিকে হাত নাড়ানো কি কুফর?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 1607
Questioner: Nazmul Rahman
Question Asked: 14 Jun 2026, 09:48 AM
Reviewed & Published: 14 Jun 2026, 10:07 AM
Views: 44
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. একজন মানুষ দোয়া পড়ার সময় ঘরের দেয়ালে আয়াতুল কুরসি লেখা জায়গার দিকে হাত নাড়ালে কি তার ঈমান থাকবে?
২. সে কোন কুরআনের আয়াতের অর্থ শুনে যদি শুধু মুখবন্ধ করে এক ধরনের আওয়াজ করে এবং মুখ ফাক না হয় তাহলে কি তার ঈমান থাকবে

Answer

উত্তর:
প্রশ্নদ্বয়ের মূল বিষয় কুরআন ও কালামুল্লাহর প্রতি সম্মান-অসম্মান এবং তা ঈমানের সাথে সম্পর্কিত। হানাফী ফিকহের আলোকে নিম্নে বিশদ আলোচনা পেশ করা হলো।


১. দোয়ার সময় দেয়ালে লিখিত আয়াতুল কুরসির দিকে হাত নাড়ানো

উত্তর:
যদি ব্যক্তি অসম্মান বা ঠাট্টা-বিদ্রুপের উদ্দেশ্যে আয়াতুল কুরসি লেখা জায়গার দিকে হাত নাড়ায়, তাহলে তা কুফরী (ঈমান হারানোর) কারণ হতে পারে। কেননা কুরআনের কোনো অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবজ্ঞা বা উপহাস করা কুফরী। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
“আর যদি তুমি তাদের জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, আমরা তো শুধু আলাপ ও খেলা করছিলাম। বলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে?” (সূরা তাওবা: ৬৫)

তাফসীরবিদগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, যারা কুরআন বা ইসলামের কোনো বিষয়কে হাসি-ঠাট্টার পাত্র বানায়, তাদের ঈমান চলে যায়। (তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন, ৪/২৩০)

কিন্তু যদি শুধু দোয়ার সময় হাত নাড়ানো জরুরি মনে করে অথবা অজান্তে এমন করে ফেলে (যেমন হাত তুলতে গিয়ে সে দিকে চলে যায়), তাহলে তা ঈমানের ক্ষতি করে না। তবে এ রকম কাজ যিকির ও দোয়ার আদবের পরিপন্থী হওয়ায় তা পরিহার করা উচিত।

হানাফী কিতাবসমূহের বক্তব্য:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নামের প্রতি ইঙ্গিত করে হাসি-ঠাট্টা করা কুফরী। ‘আলামগীরী ফতোয়া ও শামিতে উল্লেখ আছে যে, কাউকে কুরআনের আয়াত দেখিয়ে হেসে ফেললেও ঈমান নষ্ট হয় যদি উদ্দেশ্য উপহাস হয়। তবে যদি ভুলে বা বেখেয়ালে হয়, তাহলে নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪; ফতোয়া হিন্দিয়া, ২/২৫৬)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী): কুরআনের প্রতি অসম্মানজনক আচরণের জন্য ‘যুরূরিয়া মোকাদ্দামা’ (অবশ্যই উদ্দেশ্য) লাগে। সম্মানসূচক বা বেখেয়ালি কাজ ঈমানের ক্ষতি করে না। (ইমদাদুল ফতোয়া, ১/২৬৭)

সিদ্ধান্ত:

  • উদ্দেশ্য ঠাট্টা/অসম্মান → ঈমান চলে যায়।
  • উদ্দেশ্য সঠিক বা নিরীহ → ঈমান থাকে, কিন্তু আদব রক্ষা না হওয়ায় গুনাহ হবে।

২. কুরআনের আয়াতের অর্থ শুনে মুখ বন্ধ করে শুধু আওয়াজ করা (মুখ না ফাঁকা)

উত্তর:
এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট মুখ্য।

**(ক) যদি এই আওয়াজটি ঠাট্টা-বিদ্রুপ বা উপহাসের হয় (যেমন কুরআনের অর্থ শুনে ‘ছি ছি’ বা ব্যঙ্গাত্মক ধ্বনি করা) – তাহলে তা সরাসরি কুফরী। কারণ আল্লাহ ও তাঁর আয়াতকে উপহাস করার শাস্তি ঈমানহারা হওয়া। যেমন হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি কুরআন শুনে বলেছিল “এ কী! মক্কার লোকেরা তো জাদুগ্রস্ত হয়ে গেছে” – এ কথা বলার সাথে সাথে সে কাফির হয়ে যায়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৮৯; সুনানে তিরমিযী, হাদীস ৩৩০১)

**(খ) কিন্তু যদি মুখ বন্ধ রেখে আওয়াজ করা অন্য কারণে হয়, যেমন:

  • অর্থ বুঝতে গিয়ে মাথায় চিন্তা আসায় ‘হুঁ’ বা ‘উহ্’ করা,
  • কাঁদতে গিয়ে গলা আটকে আসা,
  • অজান্তে কিছু বলা,
  • নিঃশ্বাস ফেলে আওয়াজ বের হওয়া ইত্যাদি — তাহলে ঈমান থাকে। কেননা কুরআনের প্রতি অবজ্ঞার নিয়ত নেই। তবে এ ধরনের আওয়াজ করা মাকরূহ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর যদি অভ্যাসগত হয়, তবে আদব রক্ষা না হওয়ায় তওবা করা জরুরি।

হানাফী ফিকহের দলিল:

  • ফতোয়া উসমানী (মুফতি তকী উসমানী): কুরআনের আয়াত শুনে যদি কেউ এমন কোনো কাজ করে যা সাধারণ মানুষের কাছে উপহাস বলে গণ্য হয়, তবে তা কুফরী। আর যদি তা না হয়, তবে তা কবীরা গুনাহ নয়। তিনি আরো বলেন, কুরআনের অর্থ শুনে উচ্চস্বরে ‘হাসি’ ফেলা বা অহেতুক শব্দ করা নাজায়েজ। (ফতোয়া উসমানী, ১/২৫৬-২৫৭)
  • শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবী): সাহাবায়ে কেরাম কুরআন শুনে গভীর একাগ্রতায় কেউ কেউ মুখ দিয়ে অনিচ্ছাকৃত আওয়াজ করতেন, তা কুফরী নয়, বরং আবেগের বহিঃপ্রকাশ। (শরহু মা‘আনিল আসার, ৪/২৮২)
  • উসুলুশ শাশী: ঈমান-কুফরের মাপকাঠি হলো বিশ্বাস ও ইচ্ছা। বাহ্যিক কোনো অনিচ্ছাকৃত কাজ ঈমান নষ্ট করে না। (উসুলুশ শাশী, পৃ. ১৯২)

সিদ্ধান্ত:

  • উদ্দেশ্য উপহাস করলে ঈমান চলে যাবে।
  • উদ্দেশ্য যদি কোনো ধরনের সম্মানহানিকর না হয় (যেমন অবহেলা বা অজ্ঞানতা), তাহলে ঈমান থাকবে, কিন্তু এ কাজ আদব রহিত হওয়ায় গুনাহ হবে এবং তওবা করতে হবে।

সারাংশ:

| প্রশ্ন | শর্ত | ঈমানের অবস্থা | |--------|------|---------------| | ১. দোয়ায় দেয়ালে লেখা আয়াতুল কুরসির দিকে হাত নাড়ানো | যদি অসম্মানজনক নিয়তে হয় | ঈমান যাবে | | | যদি বেখেয়ালে বা দোয়ার স্বাভাবিক অংশ হয় | ঈমান থাকবে, তবে আদবের খেলাফ | | ২. কুরআনের অর্থ শুনে মুখ বন্ধ করে আওয়াজ করা | যদি উপহাস বা ঠাট্টার জন্য হয় | ঈমান যাবে | | | যদি অনিচ্ছাকৃত বা চিন্তাশীল অবস্থায় হয় | ঈমান থাকবে, তবে উত্তম নয় |

সতর্কতা:
যেকোনো ক্ষেত্রে কুরআন ও ইসলামী বিষয়বস্তুর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা ফরজ। সামান্যতম অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য থেকে বেঁচে থাকা ঈমানের দাবি। যদি কখনো ভুলবশত এমন কিছু হয়ে যায়, তবে দ্রুত তওবা ইস্তিগফার করা ওয়াজিব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের প্রতি যথাযথ সম্মান ও ভালোবাসা রাখার তাওফিক দিন। (আমীন)


(উত্তরটি সম্পূর্ণ হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহ থেকে সংকলিত – দেখুন: রদ্দুল মুহতার ৪/২২৪; ফতোয়া হিন্দিয়া ২/২৫৬; ফতোয়া উসমানী ১/২৫৬; ইমদাদুল ফতোয়া ১/২৬৭; তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন ৪/২৩০; শরহু মা‘আনিল আসার ৪/২৮২; উসুলুশ শাশী ১৯২)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.