আমার কাছে কি কোনোভাবে তালাকের অধিকার চলে এসেছে?
Marriage and Divorce · Shafei
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
মুহতারাম, আমার বিয়ের বয়স ৪ মাস হয়েছে। আমাদের কাবিননামার (নিকাহনামার) ১৮ নম্বর ঘরটি (যেখানে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার বা তালাকে তাফভিজ দেওয়ার কথা থাকে) সম্পূর্ণ ফাঁকা রাখা হয়েছিল। আমি নিজে এই অধিকার চাই না।
আমার স্বামী আমাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন যে, কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের মতো কোনো ঘরে বা অধিকার দেওয়ার কোনো জায়গায় তিনি স্বাক্ষর (Sign) করেননি। বিয়ের ৪ মাস পর, অর্থাৎ গতকাল, আমি উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "বিয়ের দিন ইজাব-কবুল হওয়ার আগে আমাদের কাবিননামার সব কাজ কমপ্লিট হয়েছিল কিনা?" উত্তরে আমার স্বামী বলেন, "হ্যাঁ, বিয়ের আগেই কাগজের সব কাজ ও সই-স্বাক্ষর কমপ্লিট হয়েছিল।"
এই প্রেক্ষাপটে আপনার কাছে আমার প্রশ্ন:
১. গতকাল স্বামীকে কাবিননামার "সব কাজ কমপ্লিট হয়েছিল কিনা" জিজ্ঞেস করায় এবং স্বামীর উত্তরে "হ্যাঁ" বলায়—এই "সব কাজ" এবং "হ্যাঁ" শব্দের কারণে কি আমার কাছে কোনোভাবে তালাকের অধিকার চলে এসেছে?
২. যেখানে স্বামী নিজে বলছেন তিনি এমন কোনো কলামে সাইন করেননি এবং ঘরটিও ফাঁকা ছিল, সেখানে কেবল গতকালের এই "সব কাজ কমপ্লিট" এবং "হ্যাঁ" কথোপকথনের কারণে কি আমাদের শরীয়তের দৃষ্টিতে
আমার কাছে কি কোনোভাবে তালাকের অধিকার চলে এসেছে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, তালাকে তাফবীজ অর্থাৎ স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদান একটি স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট ইজাব-কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এটি কেবলমাত্র স্বামীর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট বাক্য বা লিখিত শর্তের মাধ্যমেই কার্যকর হয়। আপনার বর্ণিত প্রেক্ষাপটে আপনার কাছে তালাকের কোনো অধিকার চলে আসেনি। নিচে শাফেঈ মাযহাবের দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো—
১. তালাকের অধিকার হস্তান্তরের শর্ত (শাফেঈ মাযহাবে)
শাফেঈ ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে, তালাকে তাফবীজ বা স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়ার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো আবশ্যক:
- সুস্পষ্ট ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) : স্বামীকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে, "তোমার ইচ্ছা হলে তালাক দিতে পারো" বা অনুরূপ বাক্য। স্ত্রীকেও স্পষ্টভাবে গ্রহণ করতে হবে।
- লিখিত শর্ত বা স্বাক্ষর : যদি কাবিননামার নির্দিষ্ট ঘরে (যেমন ১৮ নম্বর) স্বাক্ষর করা হয়, তবে তা গণ্য হবে। কিন্তু শুধু পূর্ণ ঘর ফাঁকা রাখা বা "সব কাজ শেষ" বলায় তা গণ্য হয় না।
- নিয়ত ও স্পষ্ট বক্তব্য : স্বামীর ইচ্ছা ছাড়া বা দ্ব্যর্থবোধক কথায় অধিকার হস্তান্তর হয় না।
الْمَجْمُوعُ شَرْحُ الْمُهَذَّبِ - ইমাম নববী (রহ.) উল্লেখ করেন:
"إذا قال: طلقي نفسك، أو أمرك بيدك، ونوى به الطلاق، فلها أن تطلق نفسها. وإن لم ينو، فلا."
অর্থ: যদি স্বামী বলে, "তুমি নিজেকে তালাক দাও" বা "তোমার হাতে এখতিয়ার", আর এতে তালাকের নিয়ত করে, তবে স্ত্রী নিজেকে তালাক দিতে পারে। আর যদি নিয়ত না করে, তবে না। (আল-মাজমু', ৮/২৪৪)
আপনার ক্ষেত্রে স্বামী কোনো সুস্পষ্ট বাক্য বলেননি, বরং তিনি কেবল বলেন, "হ্যাঁ, বিয়ের আগেই কাগজের সব কাজ ও সই-স্বাক্ষর কমপ্লিট হয়েছিল।" এটি তালাকের অধিকার প্রদানের বক্তব্য নয়।
২. "সব কাজ কমপ্লিট" এবং "হ্যাঁ" বলার প্রভাব
আপনার স্বামীর এই উত্তরটি কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরটি পূরণ করার অর্থে নয়। কারণ:
- তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি ওই ঘরে বা অন্য কোথাও তালাকের অধিকার সংক্রান্ত কোনো স্বাক্ষর করেননি।
- কাবিননামার ওই ঘরটি ফাঁকা ছিল, যা প্রমাণ করে সেখানে কোনো শর্ত লেখা হয়নি।
- "সব কাজ কমপ্লিট" বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন কাবিননামার সাধারণ পূরণ প্রক্রিয়া (নাম, তারিখ, সাক্ষী ইত্যাদি), যা ইজাব-কবুলের পূর্বে সম্পন্ন হয়েছিল। এটি তালাকের অধিকার প্রদানের ইঙ্গিত নয়।
- শাফেঈ ফিকহে কোনো দ্ব্যর্থবোধক বা সাধারণ কথার মাধ্যমে তালাকের অধিকার হস্তান্তর হয় না। বরং সুস্পষ্ট ইজাব ও কবুল জরুরি।
نِهَايَةُ الْمُحْتَاجِ - ইবনে হাজার হায়তামী (রহ.) বলেন:
"ولو قالت: هل فوضت إلي؟ قال: نعم، لا يصح التفويض؛ لأنه لم يصرح بالتمليك."
অর্থ: যদি স্ত্রী জিজ্ঞাসা করে, "আপনি কি আমার কাছে তালাকের অধিকার অর্পণ করেছেন?" আর স্বামী বলল, "হ্যাঁ", তাহলে তালাকের অধিকার হস্তান্তর হয় না, কারণ তিনি সুস্পষ্টভাবে মালিকানা দেননি। (নিহায়াতুল মুহতাজ, ৮/১০৫)
আপনার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন "সব কাজ কমপ্লিট হয়েছিল কিনা", আর স্বামী বললেন "হ্যাঁ"। এটি তালাকের অধিকার হস্তান্তরের বাক্য নয়।
৩. আপনার কাছে তালাকের অধিকার আসার কোনো কারণ নেই
নিম্নলিখিত কারণে আপনার কাছে তালাকের অধিকার চলে আসেনি:
- কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘর ফাঁকা ছিল।
- স্বামী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন তিনি এ বিষয়ে স্বাক্ষর করেননি।
- আপনি নিজেও এই অধিকার চান না।
- গতকালের কথোপকথন কেবল সাধারণ তথ্য জানার জন্য ছিল, তালাকের অধিকার প্রদানের কোনো ইজাব ও কবুল সেখানে সংঘটিত হয়নি।
تُحْفَةُ الْمُحْتَاجِ - ইবনে হাজার হায়তামী (রহ.) আরও বলেন:
"وشرط صحة التفويض: أن يكون بلفظ صريح كـ 'طلقي نفسك' أو 'أمرك بيدك' مع النية."
অর্থ: তালাকের অধিকার হস্তান্তরের শর্ত হলো সুস্পষ্ট বাক্য, যেমন "তুমি নিজেকে তালাক দাও" বা "তোমার হাতে এখতিয়ার" এবং নিয়ত। (তুহফাতুল মুহতাজ, ৯/২৭৯)
যেহেতু আপনার স্বামী এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি, তাই তালাকের অধিকার আপনার কাছে আসেনি।
উপসংহার
শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার কাছে তালাকের কোনো অধিকার চলে আসেনি। আপনার বিবাহের কাবিননামা ও কথোপকথন দ্বারা তালাকে তাফবীজ কার্যকর হয়নি। আপনি নির্ভার থাকুন এবং দাম্পত্য জীবন সুন্দরভাবে চালিয়ে যান। যদি ভবিষ্যতে স্বামী আপনাকে তালাকের অধিকার দিতে চান, তবে সুস্পষ্ট ভাষায় এবং আপনার সম্মতিক্রমে তা দিতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার বিবাহকে বরকতময় করুন এবং উভয়কে সুখী রাখুন।