কুরআনের আয়াত পড়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে ‘না’ বলা কি ঈমান নষ্ট করে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ঈমান নষ্ট হওয়া সংক্রান্ত বিধান
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তিটি কুরআনের আয়াত পড়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে ‘না’ শব্দ উচ্চারণ করেছেন এবং সে সময় তার মনে এমন কোনো ভাব বা অনুভূতি জাগ্রত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে ঈমানের অবস্থা নির্ভর করবে তার নিয়ত ও বিশ্বাসের ওপর। নিচে কুরআন, হাদীস এবং হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।
১. কুরআনের আয়াত অস্বীকারের পরিণতি
কুরআনের কোনো আয়াতকে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলা বা অস্বীকার করা স্পষ্ট কুফরি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَمَن يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ﴾ (সূরা মায়িদা: ৫) “আর যে কেউ ঈমান অস্বীকার করে, তার সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যায়।”
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে:
﴿إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ﴾ (সূরা নিসা: ১৫০) “নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের সাথে কুফরি করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় এবং বলে ‘আমরা কতকের ওপর ঈমান আনি আর কতকের ওপর কুফরি করি’ ...”
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مَا يَتَبَيَّنُ فِيهَا يَزِلُّ بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ” (বুখারী: ৬৪৭৭; মুসলিম: ২৯৮৮) “নিশ্চয় বান্দা এমন একটি কথা বলে যা সে গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু তার কারণে সে জাহান্নামে চলে যায় পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যবধানের চেয়েও দূরে।”
সুতরাং কুরআনের আয়াতের প্রতি অনাস্থা, বিদ্রুপ বা অস্বীকৃতিসূচক কথা ইচ্ছাকৃতভাবে বলা ঈমান নষ্ট করে দেয়।
২. হানাফি ফিকহের আলোকে ‘না’ শব্দের বিধান
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে:
ক. ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের আয়াত অস্বীকার করা:
- রদ্দুল মুহতার (رد المحتار) এর কিতাবুদ দাওয়ায়ে ওয়াল মুহাকামাহ ও অন্যান্য স্থানে বলা হয়েছে: “مَنْ أَنْكَرَ آيَةً مِنَ الْقُرْآنِ كَفَرَ” (যে ব্যক্তি কুরআনের কোনো আয়াত অস্বীকার করে, সে কাফির হয়ে যায়) – (রদ্দুল মুহতার: ৪/২৩৬, দারুল কুতুব ইলমিয়্যা)।
- ফতোয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) তে আছে: “لَوْ قَالَ لَا بَعْدَ قِرَاءَةِ آيَةٍ يَنْوِي بِهِ الْإِنْكَارَ كَفَرَ” (যদি কেউ কুরআনের আয়াত পাঠের পর ‘না’ বলে এবং তার উদ্দেশ্য অস্বীকার করা হয়, তবে সে কাফির হয়ে যাবে) – (ফতোয়া হিন্দিয়া: ২/২৭৭, বিবরণ: باب الكفر و ما يكفر به المسلم)।
খ. মনের ওয়াসওয়াসা ও অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণ:
- ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী রহ.) তে উল্লেখ আছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা শুধু মনের ওয়াসওয়াসার কারণে কুফরি শব্দ মুখে ফেলে, কিন্তু তার অন্তর তা বিশ্বাস করে না, তাহলে সে কাফির হবে না, তবে তাকে তওবা ও ঈমান পুনরায় দৃঢ় করতে বলা হয়েছে। (ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/৩০১-৩০২)।
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.) এর ঈমান সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে বলা হয়েছে: “কেউ যদি কুরআনের কোনো আয়াত শুনে বা পড়ে মনে মনে অস্বীকার করে বা মুখে ‘না’ বলে ফেলে, আর তা যদি ইচ্ছাকৃত ও জেনে-শুনে হয় এবং সেই আয়াতকে মিথ্যা মনে করে, তবে তার ঈমান চলে যায়। কিন্তু যদি শুধু মনের উদাসীনতা বা অনিচ্ছাকৃত চিন্তা আসে, আর তার অন্তর তাতে সায় দেয় না, তবে ঈমান নষ্ট হয় না।” (বেহেশতী জেওর: ঈমান অধ্যায়, কুফরি শব্দের আলোচনা)।
গ. ‘না’ শব্দ বলার সময় তার ‘এমন মনে হয়েছে’: প্রশ্নে উল্লেখিত ‘এমন মনে হয়েছে’ বলতে যদি সেই ব্যক্তি আয়াতটির সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ করে বা মিথ্যা মনে করে, তবে তা স্পষ্ট কুফরি। কিন্তু যদি এটি শুধুমাত্র মনের একটি সংক্ষিপ্ত অনিচ্ছাকৃত উদয় হয় এবং সে বিশ্বাস করে যে এটি ভুল, তবে ঈমান নষ্ট হয় না, তবে তার জন্য তওবা এবং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়ে ঈমান আপডেট করা কর্তব্য।
৩. কোনো সন্দেহ থাকলে করণীয়
হানাফি ফিকহের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ রহ.) এ ব্যাপারে একমত যে, যেকোনো কুফরি উচ্চারণের পর অন্তরে যদি বিশ্বাস না থাকে, তবুও উক্ত উচ্চারণের কারণে ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না তা নির্ভর করে নিয়ত ও অন্তরের অবস্থার ওপর। তবে সর্বোত্তম পন্থা হলো:
- অবিলম্বে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ ও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করা।
- যদি কোনো প্রকার অস্বীকৃতি বা সন্দেহ থাকে, তবে নতুন করে ঈমান আনা এবং তওবা করা।
- বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে, ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণে নিকাহও ভঙ্গ হয়ে গেছে বলে ধরে নিয়ে নতুন করে নিকাহ করতে হবে (রদ্দুল মুহতার: ৩/১০৮)।
৪. গুরুত্বপূর্ণ টিকা
- প্রশ্নে বলা হয়েছে ‘ইচ্ছা করে না শব্দ উচ্চারণ করা’। এখানে ‘ইচ্ছা করে’ বলতে যদি উদ্দেশ্য হয় আয়াতটিকে অস্বীকার করা, তাহলে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু যদি ‘ইচ্ছা করে’ বলতে শুধু মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা, কিন্তু অন্তর তা বিশ্বাস না করে এবং তার মধ্যে কোনো সন্দেহ না থাকে, তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, এমন উচ্চারণে কুফরি না হলেও এটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ; তওবা ও ইসতিহফার করা আবশ্যক।
- মনে চিন্তা আসা বা ওয়াসওয়াসা (যেমন: “এ আয়াত সত্যি না মিথ্যা?”) কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত না হলে, তাকে দায়ী করা হবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ” (বুখারী: ৬২৬৯) – “নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে বলে।”
উপসংহার
উক্ত ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘না’ বলে থাকেন এবং সে সময় তার অন্তরে কুরআনের আয়াতের প্রতি অস্বীকৃতি বা সন্দেহ জাগ্রত হয়ে থাকে, তাহলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে। তাকে অবশ্যই নতুন করে ঈমান আনার জন্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে হবে এবং বিবাহিত হলে নিকাহ পুনরায় করতে হবে। কিন্তু যদি এটি কেবল একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল বা ওয়াসওয়াসার কারণে হয়ে থাকে এবং তার অন্তর ঈমানের ওপর অটল থাকে, তাহলে ঈমান নষ্ট হয়নি, তবে এ ধরনের কথা বলা খুবই বিপজ্জনক; তাই তওবা করে রক্ষা পাওয়া জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের হেফাজত করুন এবং কুফরি থেকে দূরে রাখুন। আমীন।