হঠাৎ কুফরি বা শিরকি লেখায় চোখ পড়লে কি ঈমান ভঙ্গ হয়?

Waswasa-OCD · Hanafi

Question No: 1494
Questioner: MHMA
Question Asked: 11 Jun 2026, 12:40 PM
Reviewed & Published: 11 Jun 2026, 12:45 PM
Views: 6
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

অনেক সময় facebook এ বা অনেক বই তে বা বিভিন্ন জায়গায় অনেক লেখা জানার জন্য পড়তে গিয়ে হঠাত কুফরি ধরনের লেখা সামনে আসে।সেই লেখায় চোখ পড়লে বা চোখ বুলালে কি ইমান ভঙ্গ হবে?
কেউ কি দেখে দেখে জানার জন্য বা বর্ণনার জন্য লেখা পড়লে কি ইমান ভঙ্গ হবে?

Answer

উত্তর:
প্রশ্নকারী ভাই/বোনের উদ্বেগটি খুবই স্বাভাবিক। বর্তমান সময়ে ফেসবুক, বই-পত্রিকা বা অন্য মাধ্যমে পড়তে গিয়ে হঠাৎ কুফরি বা শিরকি লেখা চোখে পড়া একটি সাধারণ ব্যাপার। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।


১. আকস্মিকভাবে (অনিচ্ছাকৃত) চোখ পড়া বা চোখ বুলানো

যদি কোনো ব্যক্তি কোনো পোস্ট বা বই পড়তে পড়তে হঠাৎ করে কুফরি বা শিরকি লেখায় চোখ পড়ে যায়, অথবা সেটা আঁচল ফেলে (অর্থাৎ না বুঝে শুধু চোখ বুলিয়ে দেয়), তাহলে তার ঈমান ভঙ্গ হবে না। কারণ ঈমান ভঙ্গের জন্য অন্তর দিয়ে সম্মতি, পছন্দ বা স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। আকস্মিক ও অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টি পড়া বা চোখ বুলানো কোনো গুনাহও নয়।

হানাফি ফিকহের উসুল:

  • ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "যদি কেউ কুফরি শব্দ শুনে বা দেখে, তবে তা যদি তার অন্তরে কোনো প্রভাব না ফেলে এবং সে তা অপছন্দ করে, তাহলে তার ঈমান অক্ষুণ্ণ থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৭)
  • ফতোয়ায়ে উসমানি: "অনিচ্ছাকৃতভাবে কুফরি বাক্য দেখা বা শোনা ঈমানের ক্ষতি করে না, যতক্ষণ না অন্তর তা পছন্দ করে বা সন্তুষ্ট হয়।"
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি: "কুফরি শব্দ যদি কেউ অনিচ্ছায় শুনে বা পড়ে, তাহলে তার ঈমানের কোনো ক্ষতি নেই।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ২/২৬৩)

এক্ষেত্রে করণীয়:
সাথে সাথে অন্তর থেকে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা এবং 'আউজুবিল্লাহ' বা 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' পড়া উত্তম। আর চোখ সরিয়ে নেওয়া আবশ্যক নয়, তবে সরিয়ে নিলে ভালো।


২. ইচ্ছাকৃতভাবে জানার জন্য বা বর্ণনার জন্য পড়া

এক্ষেত্রে নিয়তের ওপর নির্ভর করবে। নিচে বিভিন্ন অবস্থা উল্লেখ করা হলো:

ক. শুধু জানার জন্য বা বর্ণনা করার জন্য পড়া (নিছক কৌতূহল বা যাচাই):
যদি কেউ কুফরি লেখা ইচ্ছাকৃতভাবে পড়ে শুধু জানার জন্য বা অন্যদের বর্ণনা করার জন্য, কিন্তু অন্তরে তা বিশ্বাস করে না, বরং ঘৃণা রাখে, তবে তাহলে তার ঈমান ভঙ্গ হবে না। তবে এটি মাকরুহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) বা কখনো কখনো হারাম হতে পারে, কারণ কুফরি লেখায় মনোযোগ দেওয়া নিজেকে বিপদে ফেলার শামিল।

সাহাবায়ে কেরাম কাফিরদের কুফরি বক্তব্য জানার জন্য কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে শুনতেন না, বরং শুনলে প্রতিবাদ করতেন। তবে ইসলামি জ্ঞানের জন্য বা খণ্ডনের উদ্দেশ্যে পড়া ভিন্ন।

খ. খণ্ডনের উদ্দেশ্যে পড়া (দাওয়াহ বা উত্তর দেওয়ার জন্য):
যদি কোনো আলেম বা ছাত্র কুফরি মতবাদ ভালোভাবে বুঝে তার জবাব দেওয়ার জন্য বা অন্যদের সতর্ক করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে পড়ে, তাহলে তা জায়েজ বরং প্রশংসনীয় হতে পারে। তবে শর্ত হলো:

  • অন্তর কুফরি থেকে দৃঢ়ভাবে বিদ্বেষী থাকবে।
  • পড়ার সময় ঈমানি চেতনা বজায় থাকবে।
  • পড়ার পরপরই তা খণ্ডন করা বা খণ্ডন করার প্রস্তুতি নেওয়া।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ইমামগণ বিদআত ও কুফরি ফিরকা নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং তাদের বক্তব্য জানার পরই খণ্ডন করেছেন। (আল-আদাব আল-মুফরাদ, বায়হাকি)

গ. আনন্দ বা প্রশংসার সঙ্গে পড়া:
যদি কেউ কুফরি লেখা পড়ে অন্তরে তা পছন্দ করে বা সমর্থন করে, অথবা পড়ার সময় মজা পায় এবং কুফরি বক্তব্যকে সত্য মনে করে, তাহলে সেটি ঈমান ভঙ্গের কারণ হবে। ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন: "যে ব্যক্তি কুফরি বাক্য উচ্চারণ বা লিখনকে পছন্দ করে, সে কাফির হয়ে যায়।" (শারহু আক্বিদাতিল তাহাবিয়্যা)


সারসংক্ষেপ (হানাফি ফিকহের আলোকে)

| অবস্থা | ঈমান ভঙ্গ? | বিধান | |--------|------------|-------| | আকস্মিকভাবে চোখ পড়া (অনিচ্ছায়) | না | কোনো গুনাহ নেই; অপছন্দ করাই যথেষ্ট | | অনিচ্ছায় চোখ বুলানো (আঁচল ফেলা) | না | গুনাহ নয় | | জানার জন্য (নিছক কৌতূহলে) পড়া, কিন্তু অন্তরে ঘৃণা | না | মাকরুহে তাহরিমি; পরিত্রাণ করা কর্তব্য | | খণ্ডন বা দাওয়ার জন্য পড়া | না | জায়েজ, বরং প্রশংসনীয় (শর্তসাপেক্ষে) | | পছন্দ, সমর্থন বা বিশ্বাস সহকারে পড়া | হ্যাঁ | ঈমান ভঙ্গ; তওবা ও ঈমান পুনরায় সতেজ করা জরুরি |


ওয়াসওয়াসা (OCD) সম্পর্কে বিশেষ নির্দেশনা

আপনার প্রশ্নের ক্যাটাগরি 'ওয়াসওয়াসা-ওসিডি'। তাই মনে রাখবেন: শয়তান মানুষকে কুফরি ও শিরকি বিষয় ভুলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয় দেখিয়ে অস্থির করে তোলে। ইসলামে এ ধরনের ওয়াসওয়াসাকে ক্ষমা করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতের অন্তরে উদিত ওয়াসওয়াসাকে (মনের খেয়াল) ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তা কথায় বা কাজে পরিণত হয়।" (বুখারি, মুসলিম)

তাই আকস্মিকভাবে চোখে পড়লে ভয় না পেয়ে 'আউজুবিল্লাহ' পড়ে চোখ সরিয়ে নিন। এতে আপনার ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না, ইনশাআল্লাহ।


প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের রেফারেন্স

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন, ৪/২৩৭, ৬/৩৮৮)
  • ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি, ২/৪৫০-৪৫২)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী, ৪/২৭৫)
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি (২/২৬৩)
  • বেহেশতি যেওর (আশরাফ আলী থানভী, ঈমান সংক্রান্ত অধ্যায়)
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি, সূরা আনআমের তাফসির)

সর্বোত্তম উপদেশ: আকস্মিকভাবে কুফরি লেখা চোখে পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে 'আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' পড়ুন এবং মনে মনে বলুন: "আমি এ কথায় বিশ্বাস করি না, আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।" আলহামদুলিল্লাহ, এতেই আপনার ঈমান অক্ষুণ্ণ থাকবে।

আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.